বৃষ্টি হলেই রাজধানীতে জলাবদ্ধতা কেন

183

আলোকিত সকাল ডেস্ক

চারশ বছর পেরিয়েছে অনেক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী রাজধানী শহর ঢাকা। তিলোত্তমা রাজধানী গড়ে তুলতে কখনই চেষ্টার কমতি দেখা যায় না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। বছরজুড়েই চলে উন্নয়নযজ্ঞ। তবু সর্বত্র বিশৃঙ্খলা, অপরিকল্পিত নগর ভাবনার ছাপ।

প্রায় দুই কোটি মানুষের এ শহর অনেক ক্ষেত্রেই বসবাসের অযোগ্য। বিশেষ করে বর্ষার বৃষ্টি এ নগরের বাসিন্দাদের জন্য যতটা না আশীর্বাদ, তার চেয়ে বেশি অভিশাপ হয়ে দেখা দেয়। সামান্য একটু বৃষ্টিতেই জলাশয়ে রূপ নেয় রাজধানীর মহাসড়কগুলো। তৈরি হয় তীব্র যানজট। আর দুর্ঘটনা তো নৈমিত্তিক ঘটনা। পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকায় একটু বৃষ্টি হলেই উৎকণ্ঠা আর দুর্ভাবনায় পড়তে হয় রাজধানীর বাসিন্দাদের। ব্যতিক্রম হয়নি এবারও।

বৃষ্টির মৌসুমে চিরচেনা জলাবদ্ধতার আশঙ্কায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রাজধানীবাসী। বৃষ্টি মানেই কাটাছেঁড়া, খানাখন্দে ভরা সড়কে জলাবদ্ধতা; বাইরে বেরোলেই সীমাহীন দুর্ভোগ। কয়েক বছর ধরেই রাজধানীর বেশিরভাগ সড়কে অল্প বৃষ্টিতেই কোমর সমান পানি জমে। ঢাকা শহরের চারদিক বেষ্টন করে আছে তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী। শহরের ভেতরে শিরা-উপশিরার মতো ছড়িয়ে আছে ৬৫টি খাল।

কিন্তু বেপরোয়া দখলদারিত্বে ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী ও খালের বুকে উঠছে দালান। রাজধানীর আশপাশে কয়েকটি খাল মৃতপ্রায় অবস্থায় থাকলেও অধিকাংশ খালের অস্তিত্বই আর নেই। এক সময় বেশ কয়েকটি জলাশয় থাকলেও এগুলোর অস্তিত্ব হারিয়েছে অনেক আগেই।

রাজধানীর এমন ভয়াবহ জলাবদ্ধতার পেছনে রয়েছে অসংখ্য কারণ। নগরবিদরা বলছেন, নদী ভরাট রোধ, দখল হওয়া খাল উদ্ধার, পলিথিনের অবাধ ব্যবহার বন্ধ, অপরিকল্পিত বক্স কালভার্ট ও কার্যকর ড্রেনেজ সিস্টেম চালু করতে পারলে বহুলাংশে এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এ জন্য সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাও জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকায় ময়লা ফেলার জন্য বেছে নেওয়া হয় রাস্তাঘাট।

এ ছাড়া বিভিন্ন উন্নয়নকাজে ব্যবহারের পর ফেলে রাখা জিনিসপত্র বৃষ্টি বা বিভিন্নভাবে গিয়ে ঠাঁই নেয় ড্রেনে। এতে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় পানিপ্রবাহ। ঢাকাসহ সারাদেশেই পলিথিনের অবাধ ব্যবহার। এ ব্যবসার পেছনে রয়েছেন কয়েকজন প্রভাবশালী। ফলে নিষিদ্ধ এ পলিথিন অনেকটাই সহজলভ্য।

এগুলো মাটির পানি শোষণক্ষমতা নষ্টের পাশাপাশি নিষ্কাশনের পথও বন্ধ করে দেয়। এ ছাড়া রাজধানীতে কমে গেছে উন্মুক্ত মাটি। ভবন বা রাস্তা দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছে অধিকাংশ জায়গা। তাই অল্প বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাটে জমে যায় পানি। অথচ সামান্য এ পানিকে মাটিরই শুষে নেওয়ার কথা। এদিকে রাজধানীর উন্নয়নে বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও সেবা সংস্থা কাজ করে। সমস্যাটা এখানেইÑ অতি সন্ন্যাসীতে যে গাঁজন নষ্ট।

ঢাকার ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। কোনো সমন্বয় ছাড়াই যে যার মতো উন্নয়নকাজ করে যায়। বিভিন্ন প্রয়োজনে সারাবছরই চলতে থাকে খোঁড়াখুঁড়ি। আর বর্ষাকাল এলে যেন এর হিড়িক পড়ে। এক সংস্থা তাদের কাজ শেষ করে চলে যাওয়ার কদিন পর আরেক সংস্থা এসে সেই একই রাস্তা কাটতে শুরু করে। এ ছাড়া সরকারের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের যেন কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমাই নেই। বছরের পর বছর চলতে থাকে এসব কাজ।

কয়েক বছর ধরে চলছে মেট্রোরেল নির্মাণকাজ। বৃষ্টির সময় পাথর ও মাটিতে বন্ধ হয়ে যায় পানিপ্রবাহের ড্রেনগুলো। রাজধানীর গ্রিন রোড, তেজকুনিপাড়া, তেজতুরী বাজার, খিলগাঁও, গোড়ান, বাড্ডা, সবুজবাগ, বাসাবো, বনশ্রী, নয়াপল্টন, কাকরাইল, শান্তিনগর, মৌচাক, মগবাজারের ভেতরের দিকে গলি; ফার্মগেট থেকে কারওয়ানবাজার এলাকার অধিকাংশ সড়কই পানিতে তলিয়ে যায় অল্প বৃষ্টিতে। ধানম-ি, বনানী ও উত্তরার বিভিন্ন এলাকাও জলমগ্ন হয়ে যায়। এ ছাড়া কারওয়ানবাজার থেকে এফডিসি রোড, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদসহ আশপাশের এলাকায় কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি জমে যায় স্বল্প সময়ের বৃষ্টিতেই। মিরপুর অঞ্চলের কালশী রোড, কাজীপাড়া, সেনপাড়া, ১৩ নম্বর সেকশন, মিরপুর ৬ নম্বরের একাংশ, ১০ নম্বর গোলচত্বরের সড়কের একাংশেও পানি জমে যায় হালকা বৃষ্টিতেই। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে নতুন অন্তর্ভুক্ত প্রায় সব এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। একই অবস্থা ডিএনডি অধিভুক্ত এলাকাগুলোরও। এসব এলাকায় মানুষের বাসাবাড়িতেও পানি ওঠে।

বৃষ্টিতে পানিমগ্ন হয়ে পড়ে রাজধানীর ব্যাংকপাড়াখ্যাত মতিঝিল এলাকাও। বিশেষ করে নটর ডেম কলেজের সামনের সড়ক, ফকিরের পুল, শাপলা চত্বরের অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। পুরান ঢাকার প্রায় সর্বত্রই অল্প বৃষ্টিতে পানি জমে যায়। যদিও ডিএসসিসি পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে জলাবদ্ধতা নিরসনে জেট অ্যান্ড সাকার মেশিন ব্যবহার করে সফলতা পেয়েছিল।

সূত্র জানায়, রাজধানীর সড়কগুলোতে দুই হাজারের মতো ক্যাচপিট রয়েছে। এর মধ্যে ময়লা আবর্জনা জমে এক হাজারের বেশি ক্যাচপিট বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়ার সুযোগ থাকছে না। নগরের জলাবদ্ধতা ও সার্বিক বিষয় নিয়ে ওয়াসার পরিচালক (কারিগরি) একেএম শহীদ উদ্দিন বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নও করা হয়েছে। ড্রেনগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ বছর জলাবদ্ধতা তুলনামূলক কম। অনেক জায়গায় ময়লা-আবর্জনা জমা হয়ে ক্যাচপিটগুলো বন্ধ হয়ে যায়, এতে পানি নামতে পারে না। আমাদের কর্মচারীরা সার্বক্ষণিক কাজ করছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments