ব্যাংক খাতের দুর্দিনেও কৃষিঋণে রেকর্ড

138

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। দুর্দিনে খুঁড়িয়ে চলছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। অথচ এমন দুর্দিনেও আশানুরূপভাবে বেড়েছে কৃষিঋণ। সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে (২০১৮-১৯) কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছে ২৩ হাজার ৬১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ হাজার ২২২ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা ৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেশি। আগের অর্থবছরের একই সময়ে (জুলাই-জুন) মোট কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছিল ২১ হাজার ৩৯৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে এমন তথ্য।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে জানা যায়, দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিতরণ করা কৃষিঋণের পরিসংখ্যানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮ শতাংশ বেশি ঋণ বিতরণ করেছে। অর্থাৎ এই সময়ে কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১০৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। সদ্য শেষ হওয়া এই অর্থবছরে কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, যদিও ব্যাংক খাতের অবস্থা নাজুক। তারল্য সংকটে নিমজ্জিত অধিকাংশ ব্যাংক। তারপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় শেষ পর্যায়ে কৃষিঋণ বিতরণ তুলনামূলকভাবে বেড়েছে।

তারা আরও বলছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব বাণিজ্যিক ব্যাংককেই তাদের বেঁধে দেয়া লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছে। কৃষিঋণের জন্য বরাদ্দ অর্থ অন্য কোনো খাতে ব্যবহার করা যাবে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের এক মাসের ব্যবধানে কৃষিঋণ বিতরণ বেড়েছে ১৫.০৫ শতাংশ। অর্থাৎ ৩ হাজার ২৮০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। গত মে মাস পর্যন্ত কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছিল ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা, জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৬১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য হালনাগাদে দেখা যায়, আলোচিত বছরে সবচেয়ে বেশি কৃষিঋণ বিতরণ করেছে সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। এই ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৬ হাজার ১৩৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, যা তাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২২ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেশি। গেল অর্থবছরে ব্যাংকটির কৃষিঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ হাজার কোটি টাকা। আর উলেস্নখযোগ্য সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে রাজাশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ১ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংকের ১ হাজার ২৫৮ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ৪১০ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ৬৮৩ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকের ৭৫৩ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত এই তথ্য বলছে, সরকারি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট কৃষিঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ২৯২ কোটি ৬১ লাখ টাকা, যা তাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। এ বছর তাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১২ হাজার ৩২৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছিল ১১ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এ ঋণ বিতরণ ছিল খুবই ধীরগতিতে। শেষদিকে এসে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য কৃষিঋণ বিতরণের গতি বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে (২০১৮-১৯) ব্যাংকগুলোর তেমন কোনো তারল্য সংকট ছিল না। সেজন্য এ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ছাড়িয়েছে কৃষিঋণ বিতরণ। এর আগের বছর কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অথচ ওই বছর কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছিল ২১ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উপাত্ত বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রম্নয়ারি পর্যন্ত সময়ে কৃষিঋণ বিতরণ গত অর্থবছরের তুলনায় কম হয়েছিল ২ দশমিক ৮১ শতাংশ বা ৪০৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। ব্যাংক খাতের তারল্য সংকটের কারণেই এ সময়ে কৃষিঋণ বিতরণ কম হয়েছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এ খাতে ঋণ বিতরণের এমন ধীরগতির কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে নীতিমালায় পরিবর্তন আনে। নীতিমালা অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদি ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই ঋণ বিতরণ করা যাবে। এই নীতি করা হয়েছিল মূলত কৃষকদের সুবিধা বাড়িয়ে দেয়ার জন্য। ২০১৫ সাল থেকে কৃষকদের ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা দেয়া হচ্ছে।

এবার বোরো মৌসুমে আরেকটি বিষয় সবার নজরে এসেছে, কৃষি শ্রমিকের সংকট। চাহিদামতো শ্রমিক না পেয়ে বা পেলেও শ্রমিকের উচ্চমজুরির অর্থ জোগাড় করতে না পেরে সময়মতো ধান কেটে ঘরে তুলতে পারেননি অনেক কৃষক। এ অবস্থায় কৃষির বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজন যান্ত্রিকীকরণ। প্রায় ৯২ শতাংশ জমি তৈরিতে যন্ত্রের ব্যবহার হলেও অন্যান্য ধাপে যন্ত্রের ব্যবহারে বেশ পিছিয়ে আছে বাংলাদেশের কৃষি। মাত্র ৩ শতাংশ জমিতে যন্ত্রের মাধ্যমে সার প্রয়োগ করা হচ্ছে, ট্রান্সপস্নান্টিং, হারভেস্টিংয়ের ক্ষেত্রে তা এখনো ১ শতাংশের নিচে রয়ে গেছে। শুকানো কিংবা স্টোরিংয়ের ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার এখনো ৩-৪ শতাংশের মধ্যে। ফলে শ্রমিক সংকটে এসব কাজ করা কৃষকের পক্ষে দুরূহ হয়ে পড়ে। তাই এসব ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার আরও বাড়াতে হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষকের খরচ কমিয়ে আনা এবং উৎপাদন বাড়াতে প্রতি বছরই বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। কৃষি উপকরণ বিশেষ করে সার, ডিজেল, বিদু্যতে আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানো হয়েছে। আবার কয়েক বছর ধরে বাজেটে কৃষিতে ভর্তুকির জন্য ৯ হাজার কোটি টাকা করে বরাদ্দ রাখছে সরকার। কিন্তু বরাদ্দকৃত ভর্তুকির অর্থ কোনো বছরই পুরোটা খরচ করতে পারে না সংশ্লিষ্ট বিভাগ। এছাড়া সরকারের ভর্তুকির অর্থের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে সারে। তাই কৃষির অন্যান্য উপখাত এবং যান্ত্রিকীকরণেও ভর্তুকির ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments