ভারতে যাচ্ছে সোনা আসছে গরু

279

আলোকিত সকাল ডেস্ক

থামছেই না সোনা চোরাচালান। প্রায় প্রতিদিনই ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরে পাচার হয়ে আসা সোনা ধরা পড়ছে।

যত সোনা ধরা পড়ছে, তার কয়েকগুণ বেশি সোনা পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে কাস্টমস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে। তবে পাচার আগের চেয়ে কমলেও তা পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

জানা গেছে, চোরাচালানে জড়িত ২৬টি চক্র। এই চক্রের মধ্যে আ.লীগের একাধিক নেতা, সাবেক সাংসদ, মানি এক্সচেঞ্জ ও হুন্ডি ব্যবসায়ীরাও জড়িত রয়েছে। এদের সবাই বাংলাদেশের নাগরিক।

এদের সঙ্গে দুবাই ও ভারতের স্বর্ণ ব্যবসায়ীরাও জড়িত রয়েছে। আর সোনার চালান দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে আসে। চক্রের সদস্যরা মূলত চোরাই সোনা প্রাপকের হাতে পৌঁছে দেন আবার কেউ কেউ সোনা চোরাচালানে বিনিয়োগও করেন।

সূত্র জানায়, সোনা পাচারকারীরা গরুর পরিবর্তে এখন ভারতে সোনা পাচারে লিপ্ত হচ্ছেন। চোরাচালানিরা দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে সোনা পাচার করেন।

এরপর তারা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে ভারতে পাচার করছেন। ভারতে স্বর্ণ আমদানির শুল্ক বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ থেকে পাচার করা হচ্ছে।

হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গতকাল বেলা ১১টার দিকে ২৮টি স্বর্ণের বারসহ এক চীনা নাগরিককে আটক করেছেন শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। আটক ওই ব্যক্তির নাম শি আনঝু। তিনি এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে দুবাই থেকে ঢাকা আসেন।

শুল্ক গোয়েন্দারা জানায়, এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ইকে-৫৮২ ফ্লাইটে আসা চীনা যাত্রীর মাধ্যমে স্বর্ণ চোরাচালান হবে জানতে পেরে নজর রাখা হয়। একপর্যায়ে ওই যাত্রীকে শনাক্ত করা হয় এবং নজরদারিতে রাখা হয়। তিনি গ্রিন চ্যানেল অতিক্রম করার সময় তার কাছে স্বর্ণ আছে কিনা জানতে চাওয়া হয়।

তিনি স্বর্ণ থাকার কথা অস্বীকার করলে তার দেহ তল্লাশি করা হয়। কোনো কিছু না পেয়ে তার লাগেজ স্ক্যানিং করে ধাতব বস্তুর সংকেত পাওয়া যায়।

পরে তার লাগেজ থেকে তিনটি চার্জার লাইটের ব্যাটারির মধ্যে ২৮টি স্বর্ণের বার পাওয়া যায়, যার ওজন ৩ হাজার ২৫০ গ্রাম। জব্দকৃত এসব স্বর্ণের দাম প্রায় ১ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

এছাড়া গত ২ জুলাই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজের টয়লেটের ভেতর থেকে পৌনে ১৩ কেজি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। এ

ঘটনার সঙ্গে জড়িত বিমানের এয়ারক্রাফট মেকানিক মোহাম্মাদ আফজাল হোসেন হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঢাকা কাস্টম হাউসের প্রিভেনটিভ দল তাকে আটক করে।

ঢাকা কাস্টম হাউসের উপ-পরিচালক অথেলো চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, গোপন তথ্য পেয়ে বিমানের উড়োজাহাজ ‘অরুণ আলো’র টয়লেটে তল্লাশি করা হয়।

বিমানটি ঘটনার দিন মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে ওমানের মাসকট থেকে চট্টগ্রাম হয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

বিমানের ২১এ নম্বর আসনের পেছনে টয়লেটে তল্লাশির পর ব্যবহূত টিস্যু ফেলার বক্সের নিচের একটি গোপন স্থান থেকে কালো স্কচটেপে মোড়ানো ৬টি বান্ডিল উদ্ধার করা হয়।

উদ্ধারকৃত বান্ডিলগুলোতে ১১০টি সোনার বার পাওয়া যায়। বারগুলোর ওজন ১২ কেজি ৭৬০ গ্রাম, যার আনুমানিক মূল্য ৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

এ ঘটনার দিন সন্ধ্যায় বাংলাদেশ বিমানের উপ-মহাব্যবস্থাপক তাহেরা খন্দকার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, স্বর্ণপাচারের ঘটনায় এর আগে কয়েকজন ভারতীয় নাগরিককে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।

তাদের মধ্যে কলকাতার বাহাদুর রোডের নাগরিক দীপক কুমার আচারিয়া, ভারতের মুম্বাইয়ের দিনেশ মঙ্গিলাল জেন, মুম্বাইয়ের খাদাক রোডের জিগনেস কুমার ওরফে সুরেশ কুমার, নেপালের কাঠমান্ডুর গাওয়াপুরের গৌরাঙ্গ রোসান ও ভারতের জেমস প্রিন্স উল্লেখযোগ্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২০১২ সালের আগস্ট থেকে ২০১৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৫ বছরে দুই টন চোরাই সোনা জব্দ করা হয়।

যার তৎকালীন বাজারমূল্য প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। আর এসব ঘটনায় প্রায় ২০০ জন দেশি-বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়।

শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তাসহ ৩৫ জন কর্মী গ্রেপ্তার হয়।

এরা কেউ কেউ চাকরিতে বহাল হন, আবার কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে পুনরায় সোনা চোরাচালানে যুক্ত হয়েছেন।

এছাড়া, গত ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত শুল্ক গোয়েন্দারা সোনা জব্দের ঘটনায় ২৩৪টি মামলা দায়ের করেছেন।

আলোচিত মামলাগুলো ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।

স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, সোনার দোকানগুলোতে চোরাইপথে আসা সোনা দেখা যায়। বাংলাদেশের তুলনায় ভারতে সোনার বাজার অনেক বড়।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য বলছে, ভারতের বার্ষিক সোনার চাহিদা প্রায় দেড়শ টন। ভারতে সোনার চাহিদার একটি বড় অংশই বাংলাদেশ হয়ে চোরাইপথে যায়।

আগে ভারতে প্রতি এক ভরি (১১.৬৬ গ্রাম) সোনা আমদানির শুল্ক চার হাজার রুপি (৪ হাজার ৮০০) টাকা ছিল।

আর বাংলাদেশে শুল্ক ভরিতে তিন হাজার টাকা ছিল। এখন আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। আর এজন্যই এই শুল্ক কর ফাঁকি দিতেই সোনা চোরাচালান হয়।

একাধিক শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, বিমানবন্দরে কর্মরত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসাজশে সোনার বড় চালান নির্বিঘ্নে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যায়।

এ কাজে শুল্ক, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও বিমানের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সহযোগিতা করে থাকে।

১০ তোলা ওজনের একেকটি সোনার বার বিমানবন্দর থেকে বাইরে আনতে চোরাচালানিদের কাছ থেকে এক হাজার থেকে ১২শ টাকা পেয়ে থাকেন।

দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার সময় বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সোনা পরিবহনে সহায়তা করেন।

বাহকদের হাতে সোনা ধরিয়ে দেন দুবাইয়ে অবস্থানরত চক্রের প্রধানরা। বাহক সেই সোনা বিমানের আসনের নিচে, শৌচাগারে বা অন্য কোনো স্থানে লুকিয়ে রেখে বিমানবন্দর ত্যাগ করেন।

পরে বিমানবন্দরে কর্মরত লোকজন নিজ দায়িত্বে সেই সোনা বের করে বাইরে নিয়ে আসেন।

স্বর্ণপাচারকারীদের ব্যাপক ধরপাকড়ের পর কিছুদিন বন্ধ থাকলেও আবারো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণপাচার বেড়েছে।

বিমানের ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার, কেবিন ক্রু, পাইলট ও সিভিল এভিয়েশনের এক শ্রেণির নিরাপত্তা কর্মীদের যোগসাজশে চোরাকারবারিরা আনছে স্বর্ণের বড় বড় চালান।

৩০ ভাগ কমিশনে এক শ্রেণির কর্মকর্তারা চোরাকারবারিদের আনা এসব স্বর্ণের চালান বের করে দিচ্ছেন।

এ অবস্থায় সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা শাখার কিছু অসাধু কর্মকর্তা কাস্টমসের প্রিভেনটিভ দলকে তল্লাশি করতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে একটি চক্র উড়োজাহাজকে ব্যবহার করে স্বর্ণের চালান নিয়ে আসছে।

এক্ষেত্রে এটি ব্যয়বহুল হলেও নিরাপদ ভেবে এই কৌশলে পাচার করা হচ্ছে স্বর্ণের বড় বড় চালান। একজন বাহক শতকরা ৫ থেকে ১০ ভাগ টাকার বিনিময়ে পাচার করে থাকে।

কিন্তু উড়োজাহাজে করে স্বর্ণের চালান নিয়ে আসতে শতকরা ৩০ ভাগ দিতে হয় সংশ্লিষ্টদের অর্থাৎ পাইলট, কেবিন ক্রু, ইঞ্জিনিয়ার এবং সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা কর্মীদের।

কাস্টমস হাউসসহ একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যারা স্বর্ণপাচারসহ চোরাচালানিতে জড়িত তাদের একটি তালিকা রয়েছে। আর ওই তালিকার ভিত্তিতে তাদেরকে নজরদারি করা হচ্ছে।

কাস্টমস হাউসের ডেপুটি কমিশনার এথেলো চৌধুরী জানান, স্বর্ণ চোরাচালানের সাথে জড়িত থাকায় বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সিভিল এভিয়েশনের কর্মীরা মাঝেমধ্যে আটক হচ্ছেন।

তাদেরকে কালো তালিকাভুক্ত বা সন্দেহের বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়টি অতি গোপনীয়।

তাই এ বিষয়ে কিছু বলা যাবে না বলে জানান তিনি। আর ৫০ জনের নামের তালিকা রয়েছে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ১৯ নভেম্বর বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে বিমানের এক উপ-মহাব্যবস্থাপকসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।

তারা হলেন— বাংলাদেশ বিমানের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এমদাদ হোসেন, প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং প্রধান ক্যাপ্টেন আবু মোহাম্মদ আসলাম শহীদ, শিডিউল ম্যানেজার তোজাম্মেল হোসেন, উত্তরার ফারহান মানি এক্সচেঞ্জের মালিক হারুন অর রশিদ এবং বিমানের ঠিকাদার মাহমুদুল হক পলাশ।

চোরাচালান রোধে উদ্যোগ না নেয়ায় রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বাংলাদেশ বিমান চোরাকারবারিদের জন্য নিরাপদ ও অন্যতম পছন্দের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments