ভয়ংকর প্রতিবেশী!

307

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজধানীর ওয়ারীর স্কুলছাত্রী সামিয়া আফরিন সায়মার হত্যাকারীর ফাঁসি দাবিতে গতকাল সিলভারডেল স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অভিভাবকসহ সায়মার সহপাঠীরা বিক্ষোভ করে-এম খোকন সিকদার
প্রতিবেশী চাচ্চুরাই যখন সায়মাদের মতো শিশুদের ধর্ষক ও ঘাতকে পরিণত হয় তখন সব কন্যাসন্তানের অভিভাবকই দুশ্চিন্তায় পড়ে যান নিরাপত্তাহীনতায়।

রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় সামিয়া আফরিন সায়মা (৭) নামের শিশুকে হত্যার পর শিশুসন্তান তথা কন্যাসন্তানের অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় পড়বেন এটাই স্বাভাবিক।

যে কারণে গতকাল সায়মার স্কুল সিলভারডেলের শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচিও পালন করেন।

সায়মার ধর্ষক ও ঘাতক হারুন অর রশিদ কুমিল্লার তিতাস উপজেলার ডাবরডাঙা এলাকার বাসিন্দা।

সায়মাদের বাড়ির ৮ তলা ফ্ল্যাটের মালিক পারভেজের খালাতো ভাই, সে সুবাদে হারুন সায়মাদের প্রতিবেশীও বটে।

গত দুই মাস আগে পারভেজের রঙের দোকানে কাজের জন্য ঢাকায় আসে সে। পারভেজের পরিবারের সঙ্গে একই বাড়িতেই থাকতো হারুন।

সায়মা পারভেজের মেয়ের সঙ্গে খেলাধুলা করার জন্য নিয়মিত ওই ফ্ল্যাটে যাওয়া-আসা করতো। কিন্তু কে জানতো- সায়মার প্রতি কুদৃষ্টি নিয়ে সুযোগের সন্ধানে ঘুরে বেরিয়েছে দুই মাস ধরে।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রতিদিনের মতো সায়মা পারভেজের ফ্ল্যাটে যায় সহপাঠীর (পারভেজের মেয়ে) সঙ্গে খেলা করতে।

অথচ ওত পেতে থাকা ধর্ষক-ঘাতক হারুন সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সায়মাকে একা পেয়ে। শিশু সায়মাকে বাড়ির ছাদ ঘুরে দেখানোর কথা বলে ছাদে নিয়ে যায় এবং ধর্ষণ করে।

ধর্ষণে নিস্তেজ হয়ে পড়ায় গলায় রশি পেঁচিয়ে টেনেহিঁচড়ে রান্না ঘরে নিয়ে যায়। রান্না ঘরের সিঙ্কের নিচে রেখে কুমিল্লার নিজ এলাকায় গিয়ে আত্মগোপন করে হারুন।

সিসিটিভি ও তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার পাঁচ ব্যক্তির জবানবন্দিসহ ঘটনার পর থেকেই হারুনের অনুপস্থিতি সবার সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়ালে হারুনের সন্ধানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান শুরু করে।

অভিযানে কুমিল্লার তিতাস থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। স্বীকারোক্তিতে হারুন পুরো ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনাও দেয়।

হারুনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে গতকাল দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দেন অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন।

ডিএমপির এ কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের অপরাধীরা সাধারণত ধর্ষণের পর যখন ভাবে এ অপকর্মের কারণে সে বাঁচতে পারবে না তখনই হত্যার মতো ঘটনা ঘটায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

হারুনের স্বীকারোক্তির বর্ণনা দিয়ে আব্দুল বাতেন বলেন, গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে সাড়ে ৬টার মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। ওইদিন মাকে বলে শিশু সায়মা ৮ তলায় যায়।

সেখানে ফ্ল্যাট মালিক পারভেজের একটি শিশুর সঙ্গে খেলা করতে যায় সায়মা। সেখানে গেলে পারভেজের স্ত্রী জানায় তার মেয়ে ঘুমাচ্ছে।

সেখান থেকে বাসায় ফেরার উদ্দেশে লিফটে ওঠে সায়মা। লিফটেই সায়মার সঙ্গে দেখা হয় পারভেজের খালাতো ভাই হারুনের।

হারুন সায়মাকে লিফট থেকে ছাদ ঘুরে দেখানোর কথা বলে ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে সায়মাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। সায়মা চিৎকার করলে মুখ চেপে ধর্ষণ করে।

সায়মাকে নিস্তেজ দেখে গলায় রশি লাগিয়ে টেনে নিয়ে যায় রান্নাঘরে। সেখানে সিঙ্কের নিচে রাখে।

এরপর পারভেজের বাসায় না ফিরে হারুন গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার তিতাস থানার ডাবরডাঙ্গা এলাকায় গিয়ে গা ঢাকা দেয়। আব্দুল বাতেন বলেন, হারুন পারভেজের খালাতো ভাই।

পারভেজের বাসায় গত দুই মাস ধরে থাকতো সে। কাজ করতো পুরান ঢাকায় পারভেজের রঙের দোকানে।

আব্দুল বাতেন আরও বলেন, হারুনকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আজই আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ড চাওয়া হবে। গ্রেপ্তার হারুনের বাড়ি কুমিল্লায়।

ওয়ারীর বনগ্রামের যে বহুতল ভবনে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি ঘটেছে, তার সপ্তম তলায় থাকতো সে।

আর শিশুটি পরিবারের সঙ্গে থাকতো ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাটে। শিশু সায়মার বাবা আব্দুস সালাম নবাবপুরের একজন ব্যবসায়ী।

গত ফেব্রুয়ারিতে ওই ভবনে ফ্ল্যাট কেনার পর তিনি পরিবার নিয়ে সেখানে ওঠেন। তার দুই ছেলে, দুই মেয়ের মধ্যে সবার ছোট সায়মা রাজধানীর সিলভারহেড স্কুলে নার্সারিতে পড়তো।

অন্য ফ্ল্যাটের শিশুদের সঙ্গে খেলতে যাওয়ার কথা বলে প্রতিদিনের মতই বাসা থেকে বের হয়েছিল সে। কিন্তু রাত হওয়ার পরও না ফেরায় তার পরিবার খোঁজাখুঁজি শুরু করে।

নবম তলায় খালি ফ্ল্যাটের ভেতরে তাকে পাওয়া যায় গলায় রশি পেঁচানো, মুখ বাঁধা ও রক্তাক্ত অবস্থায়।শিশু সায়মার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছেন ওয়ারী থানার এসআই হারুন অর রশিদ।

প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, শিশুটির মাথার বামপাশে সামান্য থেঁতলানোর জখম রয়েছে। মুখ দিয়ে রক্ত বের হওয়ার চিহ্ন রয়েছে। গোপনাঙ্গ রক্তাক্ত ও থেঁতলানো। নবম তলার উত্তর-পশ্চিম পাশের ফ্ল্যাটের রান্নাঘরে লাশ পাওয়া যায়।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, বাহ্যিকভাবে শিশুটির গলায় রশি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার আলামত পাওয়া গেছে।

এছাড়া তার ঠোঁটে কামড়ের চিহ্ন এবং যৌনাঙ্গে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে এবং হত্যার আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে, এ আলামত আমরা পেয়েছি।

তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আরও স্পষ্ট হতে হাই ভ্যাজাইনাল সোয়াবের জন্য ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সব নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে। এসব প্রতিবেদন পাওয়া গেলে শিশুটির মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এদিকে নৃশংসভাবে সায়মাকে হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে তার সহপাঠীরা। গতকাল সকালে সিলভারহেড স্কুলের সামনে মানববন্ধন করে তারা।

পরে সেখানে বিক্ষোভ করা হয়। শিক্ষার্থীরা ছাড়াও অভিভাবক ও শিক্ষকরাও বিক্ষোভে অংশ নেন। এসময় হত্যার সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তির দাবি জানানো হয়।

এ ধরনের ঘটনা আর যেন না ঘটে সে ব্যাপারে এখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান বিক্ষোভকারীরা।

সায়মার বাবা আব্দুস সালাম বলেন, ধর্ষণকারীর যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি হয় এবং সেটি যেন দ্রুত সময়ে, অন্তত ৬ মাসের মধ্যে কার্যকর হয়। হারুনুর রশীদকে গ্রেপ্তারের পর প্রতিক্রিয়ায় আব্দুস সালাম এসব কথা বলেন।

দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, যাদের এমন মেয়ে শিশু আছে তাদের এ ধরনের পশু নামক মানুষদের থেকে কিভাবে দূরে রাখা যায় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। শিশুদের রক্ষা করার চেষ্টা করবেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমি তো মেয়েকে রক্ষা করতে পারি নাই। সায়মার বাবা আরও বলেন, তার মাকে বলেছিলো, ১০ মিনিটের জন্য একটু ৮ম তলায় যাবে।

ওখানে আরেকটা বাচ্চা আছে তার সাথে খেলবে। পরে এসে তার মাকে পড়া দেবে। কিন্তু ১০ মিনিট শেষ হয়ে গেলেও মেয়ে ফিরে আসেনি। তিনি বলেন, আমি নামাজ পড়ে আসলাম।

তারপর খুঁজলাম, পাইলাম না। সাড়ে ৬টা থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যে আমার ফুটফুটে মেয়েটা আমাদের ছেড়ে চলে যায়। আমি কিভাবে ধৈর্য ধারণ করবো।

আজ পর্যন্ত আমার স্ত্রী পানি পর্যন্তও মুখে দেয়নি। এ ঘটনার পর আমার পুরো পরিবার বিধ্বস্ত। যার জীবনে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে সেই শুধু এটার জ্বালা-যন্ত্রণা বুঝতে পারবে।

আমি চাই, আজকের মতো এ ঘটনার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আপনারা সচেতন থাকবেন যাতে ঘটনা ধামাচাপা হয়ে না যায়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments