মহাযান বৌদ্ধধর্মে বোধিসত্ত্ব জীবন ও সাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য;

78

মহাযান ধর্মদর্শন বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বৌদ্ধধর্মের উৎকর্ষের কালপর্বে মহাযান বৌদ্ধধর্মের উদ্ভব। মহাযান অত্যন্ত বৃহৎ; দর্শনে তারা শূন্যবাদী ও আদর্শবাদী, নীতিতে করুণাবাদী ও উদারপন্থী। মহাযানীদের লক্ষে সর্বসাধারণের মুক্তি। মহাযান মতাদর্শ মতে, বোধিসত্ত্ব জীবন মুক্তির সোপান। বোধিসত্ত্বের মহত্বকে মহাযান ধর্মদর্শনে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। বোধিসত্ত্ব জীবন বুদ্ধের বুদ্ধত্ব লাভের পূর্ববর্তী বিভিন্ন ধাপ; বুদ্ধত্ব লাভই পরিপূর্ণতা। এ জীবন পরিগ্রহণের মধ্য দিয়ে বোধিজ্ঞান ও নির্বাণ লাভ করা যায়। মহাযানে বোধিসত্ত্ব অসংখ্য। যে কোন ব্যক্তি যদি বোধিচিত্ত উৎপাদন করেন, তিনি বোধিসত্ত্ব হতে পারেন। এ প্রবন্ধে মহাযান বৌদ্ধধর্মের আলোকে বোধিসত্ত্ব জীবন ও সাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করা হয়েছে।

ভূমিকা:-

বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ। বুদ্ধের প্রচারিত ধর্মবাণী ও জ্ঞানদর্শন নিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে বৌদ্ধধর্ম। বুদ্ধ মতবাদ ও বিনয় কর্মের বিধি বিধানকে ভিত্তি করে কালক্রমে হীনযান (থেরবাদ) ও মহাযান (মহাসাংঘিক) এ দুই সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে যায়। হীনযান মতাদর্শীরা হলো রশীল ও প্রাচীনপন্থী এবং মহাযানীরা সংস্কারবাদী ও উদারপন্থী। মহাযানীরা বুদ্ধের সর্বজনীন মৈত্রী ও জীবমুক্তির উপর গুরুত্ব দেন। মহাযানী মতে জগত দুঃখময় নয়; পরন্তু তারা আশাবাদী। বোধিসত্ত্ব নীতি অনুসরণ করে বুদ্ধত্ব লাভ করতে প্রয়াসী হন। তারা পুদ্গল নৈরাত্ম্য ছাড়াও ধর্মনৈরাত্ম্যে বিশ্বাসী। এর অন্য একটি বৈশিষ্ট্য হল কল্পনা অর্থাৎ বুদ্ধের তিন কায়রূপ ধারণা, যেমন- নির্মাণকায়, সম্ভোগকায় ও ধর্মকায়। মহাযানে বোধিসত্ত্ব জীবনে পরহিত ব্রতে আত্মনিয়োগ এবং দৃঢ় সংকল্প ও অনুশীলনে গুরুত্ব আরোপ করা। তাদের জীবনীশক্তি অধিক। এতে ষট্ পারমিতা একটি বীর্য (বীরত্ব বা উৎসাহ)। মহাযানে বোধিসত্ত্ব জীবন অন্যতম আদর্শ।

মহাযান ধর্মদর্শনের বিবর্তন:-

মহাযান ধর্মদর্শনের বিবর্তনের ইতিহাস অত্যন্ত বিস্তৃত। এ ধর্মদর্শন এক কালে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। সম্মতীয়বাদ, সর্বাস্তিবাদ, মহাসাংঘিকবাদ প্রভৃতি মতবাদকে নিয়ে মহাযান বৌদ্ধধর্মের প্রচার-প্রসার লাভ করেছিল। এ কথা সপ্তম শতকে বাংলায় পর্যটনকারী য়ুয়ান্-চোয়াঙ্, ইৎ সিঙ্ প্রভৃতি চীনা পরিব্রাজক ভিুগণ তাঁদের ভ্রমণ বিবরণে উল্লেখ করেছেন। অষ্টম হতে দ্বাদশ শতক এই চারশত বৎসরের বাংলার বৌদ্ধধর্মের প্রভাব পরিলতি হয়। এ সময় মহাযান বৌদ্ধধর্মে তান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা ও কল্পনার বিকাশ ঘটে এবং এর ফলে বৌদ্ধধর্মে গুহ্য সাধনতত্ত্ব, নীতিপদ্ধতি, বিভিন্ন দেবদেবী ও পূজাচারের প্রচলন হয়েছিল। এই গুহ্য সাধনার ধ্যান-কল্পনা কোথা হতে কী করে মহাযান দেহে প্রবেশ করে বৌদ্ধধর্মের রূপান্তর ঘটে এবং বিভিন্ন ধারার সৃষ্টি হল বলা কঠিন। মহাযানের মধ্যে তার বীজ সুপ্ত ছিল কিনা তাও নি:সংশয়ে বলা যায় না। বৌদ্ধ ঐতিহ্যে আচার্য অসঙ্গ সম্বন্ধে বলা হয়েছে, পর্বত-কান্তারবাসী সুবৃহৎ কৌম সমাজকে বৌদ্ধধর্মের সীমার মধ্যে আকর্ষণ করার জন্য ভূত, প্রেত, য, র, যোগিনী, ডাকিনী, পিশাচ ও মাতৃকাতন্ত্রের নানা দেবী প্রভৃতিকে অসঙ্গ মহাযান দেবায়তনে স্থান দান করেছিলেন। নানা গুহ্য, মন্ত্র, যন্ত্র, ধারণী প্রভৃতিও প্রবেশ করেছিল মহাযান ধ্যান-কল্পনায়, পূজাচারে, আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্মে এবং তাও অসঙ্গেরই অনুমোদনে। তবে এই সব গুহ্য, রহস্যময়, স্বার্থকযন্ত্র, মন্ত্র, ধারণী, বীজ, মণ্ডল প্রভৃতি সমস্তই আদিম কৌম সমাজের যাদুশক্তিতে বিশ্বাস হতেই উদ্ভুত। সহজ সমাজতান্ত্রিক যুক্তিতেই বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্যধর্ম উভয়েরই ভাব-কল্পনায় ও ধর্মগত আচারানুষ্ঠানে ইহাদের প্রবেশ লাভ কিছু অস্বাভাবিক নয়। উভয়কেই নিজ নিজ প্রভাবের সীমা বিস্তৃত করার নিম্নতর স্তরগুলিতে যে সুবৃহৎ মানবগোষ্ঠি ক্রমশ এসে ভিড় করতেছিল তাঁরা তো ক্রমহ্রাসমান আদিবাসী সমাজেরই জনসাধারণ। তাঁরা তো নিজ নিজ ধর্মবিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা, দেবদেবী নিয়েই বৌদ্ধ বা ব্রাহ্মণ্য ধর্মে এসে আশ্রয় নিতে ছিলেন। অন্যদিকে, বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মেরও চেষ্টা ছিল নিজ নিজ ধ্যান-ধারণা ও ভাব-কল্পনা অনুযায়ী, নিজ নিজ শক্তি ও প্রয়োজনানুযায়ী সদ্যোক্ত আদিম ধর্মবিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা, দেবদেবী ইত্যাদির রূপ ও মর্ম কিছু রেখে কিছু ছেড়ে, শোধিত ও রূপান্তরিত করেনিল। অসঙ্গের সময় হতেই হয়তো বৌদ্ধধর্মে এই রূপান্তরের সূচনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু সন্দেহ নেই যে, বাংলা বিহারে, এক কথায় পূর্ব-ভারতের বৌদ্ধধর্মে এই ধরণের রূপান্তরের একটি গতি অষ্টম-নবম শতকেই ধরা পড়েছিল। ইহার মূলে ঐতিহাসিক একটা কার্যকারণ সম্বন্ধ নিশ্বয়ই ছিল; সে কারণ এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবু এই পর্বের বাংলা বিহারে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য উভয় ধর্মেরই এই বিরাট বিবর্তনের (তান্ত্রিক বিবর্তন) কারণ সম্বন্ধে একটু অনুমান বোধ হয় করা চলে।

সপ্তম শতকের পূর্ব-বাংলার খড়গ রাজবংশ শাসনামলে তন্ত্রযান ও মন্ত্রযানের সৃষ্টি ও প্রসার এ কালপর্বের স্রোতেরই দান। ধর্মপাল ও দেবপালের কালে এই যোগাযোগ আরও বেড়ে গিয়েছিল। পরবর্র্তীকালে তান্ত্রিক ধর্ম তার একটা দিক তন্ত্রধর্মের প্রসার বাংলায় বহুলভাবে হয়েছিল তা ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায়।

মহাযান মতবাদ বিশ্লেষণ:-

বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে বুদ্ধোত্তর কালের অন্যতম ধারা হল মহাযান। ‘মহা’ অর্থ মহৎ বা উৎকৃষ্ট এবং ‘যান’ অর্থ মার্গ, উপায় বা শকট। বুদ্ধ নির্দেশিত নির্বাণে উপনীত হতে যে মহৎ মার্গ বা উপায় অবলম্বন করা হয় তারই নাম মহাযান। বুদ্ধের পরিনির্বাণের পরে বৌদ্ধ সংঘে সংঘাত শুরু হয়। তাঁরা থেরবাদ এবং মহাসাংঘিক এ দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েন। পরবর্তীকালে এ দুটি ধারা থেকে আবার মোট আঠারোটি ধারার উদ্ভব হয়, যার একটি মহাযানপন্থা। এটি মহাসাংঘিক ধারার অন্তর্ভুক্ত। মহাযানীরা বোধিসত্ত্ব মতবাদে বিশ্বাসী। বোধিসত্ত্ব হচ্ছেন তিনি, যিনি বারবার জন্মগ্রহণ করেন এবং অপরের পাপ ও দুঃখভার গ্রহণ করে তাদের আর্তি দূর করেন। তিনি একা নির্বাণ বা মুক্তি লাভ না করে বরং জগতের সকলের মুক্তির জন্য কাজ করেন এবং প্রত্যে জীবের মুক্তি অর্জনের পর তিনি পরিনির্বাপিত হন। মহাযানের প্রধান ল্যই হচ্ছে এই ধারার বোধিসত্ত্বের আদর্শ অর্জন করা।

মহাযান এবং হীনযান এ দু’টি প্রধান সম্প্রদায় ও দার্শনিক মতাদর্শ। মহাযানীরাই প্রাচীনদের অর্থাৎ গোঁড়া রণশীল বৌদ্ধদের হীনযান বলেন। হীনযানীরা নিজেদের কখনও হীনযান বলে মনে করেন। তাঁরা নিজেদের স্থবিরবাদী (থেরবাদী) বলে অভিহিত করেন। হীনযানকে কেন হীন বলা হয় তা খ্যাতনামা মহাযানী আচার্য অসঙ্গের সূত্রালঙ্কার গ্রন্থে আছে। নিম্নলিখিত বিষয়ে এ দুটি সম্প্রদায়ের প্রভেদগুলি উল্লেখযোগ্য ক. আশয় উপদেশের আকাক্সা, খ. উপদেশ, গ. প্রয়োগÑ উপদেশের প্রয়োগ, ঘ. আলম্বন সাধনার সামগ্রী, ঙ. সাধনার কার্যসিদ্ধির সময়।

মহাযানের উদার মনোভাবের জন্য সাধারণ মানুষের নিকট অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং ইহার ফলে স্থানীয় ধর্মমতগুলোর ন্যায় তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের অনুপ্রবেশ করে তান্ত্রিক মহাযানের সৃষ্টি। মহাযান বৌদ্ধধর্মে তন্ত্রের প্রবেশ করে মহাসাংঘিকদের ধারণী পিটকে মন্ত্রের বিধি প্রবর্তিত ছিল। শুধু মন্ত্র নয়, ধারণী, মণ্ডল ও মুদ্রা বিষয়ও ছিল। যোগাচার বিজ্ঞানবাদের প্রবক্তা অসঙ্গ সর্বপ্রথম বৌদ্ধধর্মে তন্ত্রের প্রবর্তন করেন। মূলত যোগদর্শন থেকে তন্ত্রে পরিণত হয়। মাধ্যমিক শূন্যবাদের প্রবক্তা নাগার্জুন গুহ্যতন্ত্রেরও প্রবর্তক। মহাযান বৌদ্ধধর্মে তান্ত্রিকতা প্রবেশ করার ফলে বৌদ্ধ ধ্যান ধারণায় পূঁজা পদ্ধতিতে গুহ্যতন্ত্রের রীতি নীতি প্রসার লাভ করে। মহাযান তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মে নানা বোধিসত্ত্ব ও নানা দেবদেবীর ছড়াছড়ি। সেই সাথে নিরীশ্বরবাদী বৌদ্ধধর্মে বিভিন্ন তন্ত্র মন্ত্র, আর অলৌকিকত্ব স্থান লাভ করে।

মহাসাংঘিকেরা সাতটি দলে বিভক্ত। এসব শাখাগুলি মহাযান মতবাদের ক্রমবিকাশে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। এরপর আবার ক্রমে ক্রমে অনেকগুলি মহাযান হয়ে দাঁড়ান। তাই মহাসাংঘিকেরা মহাযানের প্রথম পথপ্রদর্শক। পণ্ডিতপ্রবর রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে, মহাযান সম্প্রদায় মহাসাংঘিক বা অন্য কোন বিশেষ সম্প্রদায় হতে উদ্ভূত নহে, তিনি মনে এই রূপান্তরিত মহাযান হতে মন্ত্রযানের সৃষ্টি হয়। আবার বজ্রযান, সহজযান, কালচক্রযান এই তিনটি ভাবধারার উদ্ভব হয় এই মন্ত্রযান হতে। খ্রিষ্টীয় প্রথম শতক হতে অষ্টম শতক পর্যন্ত মহাযান এবং খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতক হতে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত তন্ত্রযান। ইতিহাসে দেখা যায় মহাযান হতে তন্ত্রযানে রূপান্তরিত হয়।

মহাযান বৌদ্ধধর্ম প্রধানত মাধ্যমিক শূন্যবাদ এবং যোগাচার বিজ্ঞানবাদ এ দুটি ভাগে বিভক্ত। মাধ্যমিক শূন্যবাদে বাহ্যিকভাবে যাকে জীবন বলা হয় তার কোন পারমার্থিক অস্তিত্ব নেই; প্রত্যে বস্তু এক নিঃসার ভ্রান্তিমাত্র। দার্শনিক নাগার্জুন এ মতের শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা। আর যোগাচার বিজ্ঞানবাদে বলা হয়েছে যে, সকল বাহ্যবস্তুই ভ্রান্তিমাত্র, অসৎকল্পিত; একমাত্র বিজ্ঞানই সৎ। এছাড়া মহাযানের মধ্যে বহু তান্ত্রিক শাখা বিদ্যমান। যেমন- মন্ত্রযান, তন্ত্রযান, বজ্রযান, কালচক্রযান, সহজযান ইত্যাদি। তত্ত্বগত দিক থেকে এগুলো মৌলিক কোন মতবাদ নয়। এগুলো মূলত বৌদ্ধধর্ম এবং হিন্দুধর্মের সংমিশ্রণে উদ্ভূত ধর্মদর্শনভিত্তিক কতগুলো গৌণ মতবাদ।

এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলা পিডিয়া’য় ড. রেবতপ্রিয় বড়–য়া বলেছেন, মহাযানীদের মতে বুদ্ধ হচ্ছেন ঈশ্বর এবং সিদ্ধার্থ গৌতম তাঁর প্রতিভূ। তাঁদের মতে, গৌতম বুদ্ধের আগে ২৬ জন বুদ্ধ অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সিদ্ধার্থ ২৭তম বুদ্ধ এবং ২৮তম বুদ্ধের আবির্ভাব ঘটবে। ধর্মরূপে তিনি বিশ্বের নিয়ন্তা এবং জীবের মুক্তির জন্য তিনি বারবার পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। তাই মহাযানে বোধিসত্ত্ব ধারণা এবং দর্শনের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রাধান্য লাভ করেছে।

মহাযানের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য:-

মহাযান ধর্মদর্শনের বৈশিষ্ট্যগুলি হল : ১. সর্বশূন্যতা ও সর্বনৈরাত্ম্যের উপদেশ। ২. একাধিক বুদ্ধের ধারণা বদ্ধমূল। ৩. মহাকারুণিক বোধিসত্ত্বের আদর্শ। ৪. পারমিতাসমূহের তাৎপর্য ও আব্যশকতা। ৫. বুদ্ধ, বোধিসত্ত্ব এবং অন্যান্য দেব-দেবীর পূজা-আরাধনা। ৬. মুক্তিলাভের জন্য ধারণী এবং মন্ত্রসমূহের ব্যবহার। ৭. গ্রন্থ রচনার জন্য সংস্কৃত ও মিশ্র সংস্কৃত ভাষার ব্যবহার। ৮. বোধিচিত্তের উন্নতি সাধনের েেত্র মঠবাসী এবং গৃহস্থের মধ্যে কোনও তফাৎ নেই। ৯. বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির প্রসারে গৃহস্থের অসাধারণ ভূমিকা। ১০. তথাগতের ত্রিকায় কল্পনা।

আবার স্যার চালর্স ইলিয়ট তাঁর ঐরহফঁরংস ধহফ ইঁফফযরংস গ্রন্থে মহাযানের সংজ্ঞা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এভাবে দিয়েছেন : ক. বহু বোধিসত্ত্বে বিশ্বাস এবং প্রত্যেক মানুষের মতা আছে বোধিসত্ত্ব হওয়ার। খ. মহাযান শিা দেয় যে প্রত্যেক মানুষের উচিত জগতের কল্যাণ জন্য কিছু ভাল কাজ করা এবং নিজের অর্জিত পুণ্যাংশ সকলের হিতের জন্য দান করা। গ. ধর্মীয় জীবন যাপনের মূল ল্য হচ্ছে বোধিসত্ত্ব হওয়া, অর্হৎ হওয়া নয়। ঘ. পালি ত্রিপিটকের পরে সংস্কৃত ত্রিপিটক রচিত হয়েছে এবং এই সংস্কৃত ত্রিপিটকই হচ্ছে মহাযানের প্রথম দিককার শাস্ত্র। ঙ. মূর্তিপূজা, তন্ত্র-মন্ত্র ও পূজা আচার মহাযানে স্বাভাবিকভাবেই চলে এসেছে। মন্ত্র-তন্ত্রে আস্থা বিপজ্জনক হলেও মহাযানে প্রচলিত আছে। চ. বুদ্ধের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন মুক্তি, বিশেষত অমিতাভ বুদ্ধের নামকীর্তনের ধারাই মুক্তি মহাযান ধর্ম শিা দেয়।

মহাযান ধর্মদর্শনে বোধি মার্গ বা যান:-

মহাযান বৌদ্ধধর্মে বোধিসত্ত্ব মার্গ বা যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৌদ্ধধর্ম মতে, ‘মার্গ; বা ‘যান’ শব্দের অর্থ পন্থা, পথ, মত, কৌশল কিংবা উপায় প্রভৃতি। বৌদ্ধ সাহিত্যে শ্রাবক বোধি, প্রত্যেক বোধি তথা অনুত্তর সম্যক সম্বোধি, অর্থাৎ শ্রাবক বুদ্ধ, প্রত্যেক বুদ্ধ এবং সম্যক সম্বুদ্ধ; পরস্তু উত্তরকালীন মহাযান বৌদ্ধ সংস্কৃত সাহিত্যে তৎস্থলে শ্রাবক যান, প্রত্যেক যান, বোধিসত্ত্বযান এবং মহাযান শব্দের উল্লেখ আছে। তেমন হীনযান, মন্ত্রযান, তন্ত্রযান, বজ্রযান, কালচক্রযান, সহজযান প্রভৃতির উদ্ভব হয়। এই ‘যান’ শব্দ অনেক অর্থবোধক; কিন্তু এখানে ‘যান’ শব্দের অর্থ মার্গ। গৌতম বুদ্ধ মানুষের মুক্তির যে উপায় বলেছিলেন, তা চারি আর্য সত্য তথা আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ। আদর্শ পথ বা সম্যক মত অনুসরণ। বলা হয়ে থাকে আর্যদের অনুসৃত পন্থা কিংবা উপায়। উক্ত হয়েছে ‘একায়ানো’য় ভিক্খবে মগ্গো, সত্তানং বিসুদ্ধিয়া (সতিপট্ঠান সুত্ত)। হে ভিুগণ! এটাই সত্ত্বগণের বিশুদ্ধির একটি মাত্র মার্গ। মগ্গানট্ঠাঙ্গিকো সেট্ঠো (ধর্মপদ)। সেই মার্গসমূহের মধ্যে অষ্টাঙ্গিক মার্গই শ্রেষ্ঠ। ‘উজুকো নাম সোমগ্গো।’ (সংযুক্ত নিকায়ে অচ্ছরাসুত্ত) সেই অষ্টাঙ্গিক মার্গই ঋজুমার্গ। এখানে ‘যান’ শব্দ মার্গ অর্থেই প্রযুক্ত হয়েছে। অতএব ‘যান’ শব্দের অর্থ নির্বাণ প্রাপ্তির মার্গ; সুতরাং বৌদ্ধ সাহিত্যের সর্বত্র মার্গ শব্দেরই প্রচলন দেখা যায়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মনীতিতেও পরিবর্তন শুরু হয়। বৌদ্ধধর্মের বিকাশক্রমে ‘যান’ শব্দের প্রয়োগ কখন থেকে শুরু হয় তা বিবেচনা করা যায়। বৌদ্ধ ইতিহাসে মহাসাংঘিক নিকায় হতেই মহাযানের উদ্ভব হয়। মহাযানের প্রাচীনতম গ্রন্থ প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র; যার রচনা কাল খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী ধরা হয়, তাতেও মার্গ শব্দেরই প্রচলন দেখা যায়। ‘যান’ শব্দের প্রথম ও ব্যাপক উল্লেখ পাওয়া যায় সদ্ধর্মপুণ্ডরীক সূত্রে, যার রচনা কাল ধরা হয় খ্রিস্টিয় প্রথম শতাব্দীর পূর্বাব্দ। গৌতম বুদ্ধ অনেক প্রকারে শ্রাবকদেরকে ধর্মের উপদেশ দিয়েছিলেন। তাঁর উপদেশের ক্রম ছিলÑ প্রথম দানকথা, শীলকথা, স্বর্গকথা, কামের আদীনব্ সংকেশ এবং নৈষ্ক্রম্যের আশংসা; এভাবে যখন জানতে পারতেন, শ্রোতাদের চিত্ত মৃধু, নীবরণ মুক্ত উদগ্র ও প্রসঙ্গ হয়েছে, তখন তিনি বৌদ্ধগণের সমুৎকৃষ্ট ধর্মদেশনা অভিব্যক্ত করতেন, যথা: দুঃখ, দুঃখ সমুদয়, দুঃখ নিরোধ ও দুঃখ নিরোধের উপায় ভূত আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ (বৌদ্ধ মতবাদের ভিত্তি)। সম্ভবত এই বিকাশ ক্রমের উপর ভিত্তি করেই মহাসাংঘিক নিকায়বাদীরা বলেছেন, গৌতম বুদ্ধের সাাৎ শিষ্যদিগকে অর্থাৎ সাধারণ যোগ্যতা সম্পন্ন শিষ্যদিগকে তিনি চার আর্যসত্য তথ্য নীতিবাদের উপদেশ দিতেন; স্বীয় গৃঢ়তম রহস্যময় তত্ত্বের উপদেশ দিতেন অতি অল্প সংখ্যক যোগ্যতম শিষ্যদেরকে যাঁদের বোধিসত্ত্ব বলা হয় এবং যাঁদের পরস্পরা প্রবর্তনের দাবী মহাযান করতেন।

পালি বৌদ্ধ শাস্ত্রে শ্রাবকযান ও প্রত্যে বুদ্ধযানের উল্লেখ আছে। শ্রাবক যানের সাধক বা শ্রাবকের অন্বিষ্ট অর্হত্ব। এরা নির্বাণ আকাক্সা করেন না। অন্যদিকে প্রত্যেক বুদ্ধযানের সাধক বা প্রত্যে বুদ্ধের ল্য ব্যক্তিগত নির্বাণ। এরাঁ প্রত্যেকে নিজে বোধি লাভ করেন কিন্তু শাস্ত্রা বা লোকসাধারণের মুক্তির পথপ্রদর্শক হন না। মহাবস্তু অবদান- এ মালিনী উপখ্যানে বলা হয়েছে- প্রত্যে বুদ্ধেরা মৌন অবলম্বনেই মোভন হন, তাঁরা মহান প্রবাববিশিষ্ট, তাঁরা গণ্ডারের মতো একাকী বিচরণ করেন, তাঁরা কেবল নিজেকেই দমিত করেন এবং পরিনির্বাণ লাভ করেন। মহাযান মতে, বুদ্ধকে প্রত্যেক বুদ্ধদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা হয়। কারণ তিনি বুদ্ধত্ব অর্জনের পরে লোকসাধারণের শাস্তা হয়েছিলেন।

বৌদ্ধধর্মের অনুসার যাঁরা গুরুর উপদেশ অর্থাৎ সম্যক সম্বুদ্ধের মুখনিঃসৃত দুঃখ নিরোধের বাণী শ্রবণ করে তাঁরা নির্দেশিত মার্গানুসরণ করে রাগ-দ্বেষ-মোহ আদি সর্বকেশ সমতিক্রম করে ‘বোধি’ বা ‘জ্ঞান’ লাভ করে অর্হত্ত্ব ফল লাভ করেন, তাঁদেরকে ‘শ্রাবকবুদ্ধ’ বা ‘শ্রুতবুদ্ধ’ বলা হয়। যাঁরা গুরুর উপদেশ ব্যতীত পূর্বজন্মের সংস্কার বশত আত্ম চেষ্টায় তৃষ্ণায় করে সয়ং ‘বোধি’ বা ‘জ্ঞান’ লাভের অধিকারী হন; তাঁদেরকে ‘প্রত্যেক বুদ্ধ’ বলা হয়। শ্রাবকবুদ্ধ যান পৃথকজন ধর্ম, অর্থ, কাম এই ত্রিবর্গের সিদ্ধিতে ব্যাপৃত থাকে। কিন্তু শ্রাবক ইহার অতীত। তাদের প্রতীত্যসমুৎপাদ ও ধর্মনৈরাত্ম্য জ্ঞান থাকে। এজন্য এদের শ্রেষ্ঠ নির্বাণ লাভ হয় না। তাঁদেরকে তত্ত্বজ্ঞান লাভের জন্য কোন প্রকার গুরুর পরতন্ত্রতা স্বীকার করতে হয়না। তাঁরা সদ্ধর্মের লোপ হলে স্বীয় উদ্দ্যেগ দ্বারা বোধি বা জ্ঞান লাভ করেন এবয় উপদেশ ব্যতীত প্রাতিহার্য দ্বারা অন্য মতাবলম্বিগণকে সদ্ধর্মে অনুপ্রাণিত করেন। আর যাঁরা সম্যক প্রকারে গুরুর উপদেশ ব্যতীত সকল বিষয় স্বরস-লণ-প্রতিবেধ বশে স্বরম্ভূজ্ঞানে বুঝে ছিলেন বলে, চতুবার্য সত্য সম্যকরূপে স্বয়ং অবগত হয়েছিলেন বলে, অবিদ্যাদি প্রতীত্যসমুৎপাদ ধর্ম স্বয়ং বুঝে ছিলেন বলে এবং অনিত্য, দুঃখ ও অনাত্ম এই ত্রিলণ সম্প্রযুক্ত ধর্ম স্বয়ং সম্যকরূপে বুঝেছিলেন বলে, তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ নামে পরিকীতিত। অর্থাৎ বুদ্ধ তথাগত ধর্মসমূহ স্বয়ং সম্পূর্ণরূপে বুঝেছিলেন বলে সম্যক সম্বুদ্ধ।

শীলাচার শাস্ত্রী পালি পিটক গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, বুদ্ধ তথাগত সম্যক সম্বোধি লাভ করে সর্ব প্রথম পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদিগকে ধর্মচক্রের উপদেশ করেছিলেন ইসিপতন মৃগদাবে। কিন্তু মহাযানীদের মতে বুদ্ধ প্রথম ধর্মচক্রের প্রবর্তন ইসিপতন মৃগদাবে করেননি; এতে তিনি শ্রাবকযান তথা প্রত্যেক বুদ্ধযানের উপদেশ করেছিলেন। দ্বিতীয় ধর্মচক্র প্রবর্তন করেছিলেন রাজগৃহের গৃধকূট পর্বতে, এতে তিনি বোধিসত্ত্বযানের উপদেশ করেছিলেন। এদের মধ্যে প্রথম প্রবতিত ধর্মের নাম ‘হীনযান’ এবং দ্বিতীয় প্রবতিত ধর্মের নাম ‘বোধিসত্ত্বযান’ বা ‘মহাযান’। তৃতীয় ধর্মচক্র প্রবর্তন করেছিলেন ধান্যকটরে; এত তিনি তন্ত্রের উপদেশ দিয়েছিলেন; এই তন্ত্রই পরে মন্ত্রযান, তন্ত্রযান, বজ্রযান, কালচক্রযান, সহজযান প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। হীনযান বা থেরবাদে শীল, সমাধি, প্রজ্ঞা এবং ধ্যানের অনুশীলনের মাধ্যমে নির্বাণ লাভ করা। আর মহাযানীদের মুখ্য উদ্দেশ্য হল জীবন মুক্তির আদর্শ বোধিসত্ত্ব চর্যাব্রত গ্রহণ করত; সর্বপ্রাণীর হিতে, সুখে এবং বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির উপায় অন্বেষণ করা। মহাযানের অষ্টাঙ্গিক মার্গের স্থলে উত্তরকালে বোধিসত্ত্ব চর্যার বিকাশ হয় এবং তাঁদের আদর্শ অর্হত্ব না হয়ে বোধিসত্ত্ব বা বুদ্ধাঙ্কুর নামে পরিচিত ছিলেন। অর্হতের আদর্শ বুদ্ধত্বের আদর্শ হতে হীন; তাই তাঁরা অর্হত্বের কামনা না করে বোধিসত্ত্বের আদর্শই স্বীকার করেন। বোধিসত্ত্ব একে বলা হয়, যিনি সম্যক সম্বোধি প্রাপ্তির আকাক্সা করেন, যাতে বোধি বীজ নিহিত এবং যাঁর চিত্তে প্রাণী জগতের প্রতি অসীম করুণা বিদ্যমান। এই নবীন ধর্মের নাম হয় মহাযান। এই মহাযানীরই প্রাচীন পন্থীদেরকে ‘হীনযান’ বলে আখ্যা দেন। তাঁদের অপর নাম শ্রাবকযান; এর প্রতিপ মহাযান বা বোধিসত্ত্বযান, একে অগ্রযানও বলা হয়।

সদ্ধর্মপূণ্ডরীক সূত্র মতে বস্তুত যান একই তা ছিল বুদ্ধযান; সদ্ধর্মপূণ্ডরীর আদি মহাযান সূত্রগ্রন্থ। গূঢ় ধর্মোপদেশ বুদ্ধ কতিপয় অত্যন্ত প্রতিভাশালী নির্বাচিত শিষ্যদের প্রতি দিয়েছিলেন যাঁদেরকে বোধিসত্ত্ব বলা হয়। এই বোধিসত্ত্বদের মার্গকেই মহাযান বা বোধিসত্ত্বযান বলা হয়। এই বোধিসত্ত্বযান বা মহাযান উভয়ই একার্থ বাচক। একে বুদ্ধযান অথবা তথাগতযানও বলা হয়। মহাযানের এই কল্পনাই পরবর্তী কালে বহুযানবাদী মার্গ প্রশস্ত করে, যেমনÑ পারমিতাযান, বোধিসত্ত্বযান, বুদ্ধযান, প্রজ্ঞাযান যা ভক্তিমার্গ প্রধান। পরবর্তী কালে তন্ত্রের প্রভাবে তন্ত্রযান, মন্ত্রযান, বজ্রযান, কালচক্রযান, সহজযান প্রভৃতি বিকাশ হয়, যা সাধনমার্গ প্রধান। প্রারম্ভিক বৌদ্ধধর্মে গূঢ় রহস্য বলে কোন কিছু ছিল না। বুদ্ধ স্বয়ং আনন্দকে বলেছিলেন, হে ‘আনন্দ, ভিতর বাহির কোন প্রকার ভেদ না করেই আমি ধর্মের উপদেশ করছি। ধর্ম বিষয়ে তথাগতের কোন প্রকার আচার্যমুষ্ট (রহস্য) নাই। ভগবান বুদ্ধের ধর্ম চন্দ্র-সূর্যের ন্যায় প্রকাশমান এবং সকলের সম অধিকার। তা সত্ত্বেও পরবর্তী মহাযানী আচার্যেরা বলেন, তাঁদের মহাযান বৈপুল্যসূত্র সমূহ ভগবান বুদ্ধের উৎকৃষ্টতম সংগ্রহ, যা কেবল মহাপ্রাণী বোধিসত্ত্বকেই উপদেশ দিয়েছিলেন। মহাযানীদের এই দাবীর পেছনে কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নাই; কেবল কল্পনা মাত্রই।
মহাযানে সাতটি বিশেষতা গুণধর্ম

আচার্য অসঙ্গের ‘মহাযানাভিধর্ম সঙ্গীতি শাস্ত্র’ নামক গ্রন্থে মহাযানের সাত প্রকার বিশেষতা দেখিয়েছিলেন। (১) মহাযান ব¯ু—ত: মহান ও বিশাল, যেহেতু ইহাতে জীব মাত্রেই মুক্তির (বিধান) আশ্বাস আছে। (২) মহাযানে প্রাণীমাত্রের জন্য ত্রাণের বিধান আছে। (৩) মহাযানের ল্য একমাত্র বোধিপ্রাপ্তি। (৪) মহাযানের আদর্শ বোধিসত্ত্ব, যাঁরা সকল প্রাণীর উদ্ধারার্থে সতত প্রযতœশীল থাকেন। (৫) মহাযানের মান্যসিদ্ধান্ত হল, বুদ্ধ স্বীয় উপায় কৌশল্যের দ্বারা নানা অধিমুক্তি অর্থাৎ সত্ত্বদের জন্য নানা প্রকারের ধর্মের উপদেশ দিয়েছেন, যা পরমার্থত এক। (৬) মহাযানে বোধিসত্ত্বের দশভূমির বিধান আছে এবং (৭) মহাযানের মতে বুদ্ধ সমস্ত মানবের আধ্যাত্মিক আবশ্যকতাসমূহ পূর্ণ করতে সমর্থ।

মহাযান ধর্মদর্শনে বোধিসত্ত্বের দশভূমি:-

মহাযান মতাদর্শে বোধিসত্ত্বের দশভূমি পর্যেষণা রয়েছে। মহাযান শাস্ত্রানুসারে বুদ্ধত্ব লাভ করতে হলে বোধিসত্ত্বকে ধ্যানের দশটি ভূমি অতিক্রম করতে হয়, যেমন- (প্র) মুদিতা, বিমলা, প্রভাকরী, অর্চিষ্মতী, (সু) দুর্জয়া, অভিমুখী, দূরংগমা, অচলা, সাধুমতী এবং ধর্মমেঘা। আবার হরপ্রসাদ শাস্ত্রী উল্লেখ করেছেন, ১. ‘ভূমি’ বা দশার নাম দুরারোহা, ২. বর্ধমানা, ৩. পুষ্পমন্তিতা, ৪. রুচিরা, ৫. চিত্তবিস্তরা, ৬. রূপবতী, ৭. দুর্জয়া, ৮. জন্মনিদেশ, ৯. যৌবরাজ্য, ১০. অভিষেক।

বোধিসত্ত্বদের ভূমিসমূহ অপরিমেয়, অনেক ও অনন্ত কল্প ব্যাপ্ত। সংপ্তি সংজ্ঞায় বোধিসত্ত্বদের সব সংসার বা প্রত্যেক জন্মকেই ভূমি বা পৃথিবীতুল্য বলে কল্পনা করা হয়। সেজন্য এর নাম ‘ভূমি’। প্রথম ভূমিতে স্থিত বোধিসত্ত্বের আচরণবিধি আটটি : ১. ত্যাগ বা দানশীলতা ২. করুণা ৩. অপরিখেদ, ৪. অমান বা অভিমানের অভাব, নম্রতা, ৫. সব শাস্ত্রের অধ্যয়ন, ৬. বিক্রম, ৭. লোকের অনুজ্ঞা বা অনুমতি গ্রহণ, ৮. ধৃতি অর্থাৎ ধৈর্য। ক্রমে নবম ভূমি অতিক্রম করে বোধিসত্ত্ব দশম ভূমিতে উত্তীর্ণ ও পূর্ণসম্পাদন করে মানব জন্ম আকাক্সা করেন এবং অপুনরাবর্তনের জন্য অর্থাৎ এই-ই শেষ জন্ম জেনে মাতৃগর্ভে অবতীর্ণ হন -(মহাবস্তু অবদান)।

নৈর্বাণিক মহাসত্ত্ব বোধিসত্ত্ব:-

বোধিসত্ত্ব, পালি বোধিসত্ত। বোধি বা জ্ঞান লাভে উন্মুখ সাধক, যিনি বুদ্ধত্ব অর্জনের আগের পর্যায়ে রয়েছেন। বুদ্ধের জীবন চরিত আশ্রয় করে বোধিসত্ত্ব তত্ত্বের বিকাশ ঘটেছে। বুদ্ধের ৫৫০ বার জন্মগ্রহণের কাহিনীর শিাদর্শ বোধিসত্ত্ব জীবনবোধ। বোধিসত্ত্ব আধ্যাত্মিক মুক্তিকামী ব্যক্তি। ‘বোধি’ অর্থ জ্ঞান এবং ‘সত্ত্ব’ অর্থ প্রাণী বা জীব। এখানে বোধি বলতে সেই জ্ঞানকে বোঝায় যার অনুশীলনে জীবের দুঃখনিবৃত্তি ঘটে। এ জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে বারবার জন্মগ্রহণ করতে হয় এবং প্রতি জন্মেই অপরের দুঃখনিবৃত্তির জন্য কাজ করতে হয়। কথিত হয় যে, সিদ্ধার্থ গৌতম ৫৫০ বার জন্মগ্রহণ করে জগতের সকল জীবের মুক্তি কামনা করেন। এ পূর্বজন্মসমূহে তাঁকে বোধিসত্ত্ব বিশেষণে ভূষিত করা হয়। এভাবে বোধিসত্ত্ব হিসেবে সাধনা করে পয়ঁত্রিশ বছর বয়সে তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেন। তাঁর বুদ্ধত্ব লাভের সময়টি বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। এ সময় তিনি ধ্যানমগ্ন হয়ে অতীত জীবনের সকল কথা স্মরণ করেন, যা জাতকের গল্প হিসেবে সংরতি হয়েছে। মহাযান বৌদ্ধধর্মে বোধিসত্ত্বের আদর্শকে সর্বোচ্চে স্থান দেয়া হয়েছে।

মহাযান বৌদ্ধদের মতাদর্শে বোধিসত্ত্ব কল্পনার মাধ্যমে বুদ্ধের জীবনে অলৌকিক মহিমা আরোপ করা হয়। বিভিন্ন জন্মে দশ পারমী পূরণের নৈপুণ্যের জন্য নাম হয় ‘দশভূমিশ্বর’। এসব সৎকর্ম ও সুকৃতির অধিকারী দেবকল্প পুরুষকে বৌদ্ধশাস্ত্রে বোধিসত্ত্ব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মহাযান মতে, অর্হৎ বা শ্রাবকের চেয়ে বোধিসত্ত্ব শ্রেষ্ঠ। অর্হৎরা কেবল নিজের মুক্তির উপায় খোঁজেন, সকল সত্তার মুক্তি তাঁদের কাম্য নয়। হীনযান মতে, বুদ্ধত্ব লাভের জন্য সিদ্ধার্থ রূপে জন্মগ্রহণের পূর্বপূর্ব জন্মে তিনি ছিলেন বোধিসত্ত্ব। মহাযানীরা বলেন, সিদ্ধার্থ পূর্বজন্মে সাধারণ মানুষের মতোই বোধিসত্ত্ব অর্জন করেন। সেজন্য অন্য সাধারণ মানুষও বোধিসত্ত্ব হতে পারেন এবং কালক্রমে বুদ্ধত্ব অর্জন করতে পারেন। মহাযান মতে সিদ্ধার্থ ছাড়াও আরো বহু বোধিসত্ত্বের অস্তিত্ব স্বীকৃত। এ বোধিসত্ত্বরা ব্যক্তিগত নির্বাণ মুক্তি আকাক্সা করেন না। শতসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’য় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি শ্রাবকত্ব অর্জনের পরামশ দেয় সে পাপমিত্র।

সদ্ধর্মপুণ্ডরিক, কারণ্ডব্যূহ এবং নিষ্পন্নযোগাবলি প্রভৃতি মহাযানশাস্ত্রে অগণিত বোধিসত্ত্বের মধ্যে সমন্তভদ্র, অক্ষয়মতি, তিগর্ভ, আকাশগর্ভ, রত্নপাণি, বজ্রগর্ভ, অবলোকিতেশ্বর, চন্দ্রপ্রভ, মৈত্রেয়, মঞ্জুশ্রী, ভদ্রপাল, বজ্রপাণি প্রভৃতি ২৫ জনকে নিয়ে বোধিসত্ত্বমণ্ডলের বিবরণ পাওয়া যায়। বোধিসত্ত্বদের বিশেষ বিশেষ মতা এবং মূর্তিরূপ কল্পনা করা হয়েছিল। বৈরোচন, রতœসম্ভব, অমিতাভ, অমোঘসিদ্ধি ও আেভ্য এই পাঁচজন ধ্যানী বুদ্ধ পঞ্চস্কন্ধের অধিষ্ঠাতা। ধ্যানীবুদ্ধ থেকে বুদ্ধশক্তি উৎপত্তি এবং বুদ্ধ শক্তি থেকে বোধিসত্ত্বদের উৎপত্তি। পাঁচ ধ্যানী বুদ্ধের শক্তি যথাক্রমে- লোচনা, বজ্রধাত্বীশ্বরী, পাশুরা, তারা ও মামকী। বোধিসত্ত্ব কোন না কোন ধ্যানী বুদ্ধকুলের অন্তর্গত।

মহাযানী বৌদ্ধরা নিজেদের বোধিসত্ত্ব বলে মনে করেন, তাই মহাযানকে বোধিসত্ত্বযানও বলা হয়। বোধিসত্ত্ব সকল জীবের জন্য অসীম করুণা ও মৈত্রী অনুভব করেন। তিনি দুঃখ জর্জরিত প্রাণীদের উদ্ধারে বিগলিতপ্রাণ। জগতের কল্যাণ সাধনেই বোধিসত্ত্বজীবনের সার্থকতা। বিশ্বের একটি প্রাণীও যদি দুঃখানুভব করে, অমুক্ত থাকে তবে তিনি নিজের মুক্তিকে তৃণবৎ ত্যাগ করেন। বোধিসত্ত্বের এ কল্যাণ চেতনাই বোধিচিত্ত। বোধিচিত্ত অর্জিত হলেই সর্বার্থ সিদ্ধ হয়, ভবসাগর থেকে উত্তীর্ণ হয়ে নির্বাণমার্গে উপনীত হওয়া যায়। জগতের সকল প্রাণীর জন্য বোধিসত্ত্ব এরূপ করুণা অনুভব করেন বলে তিনি পরমকরুণাময়। কাশ্মীর মহাকবি েেমন্দ্রে ‘বোধিসত্ত্বাবদানকল্পলতা’ গ্রন্থে এর বিস্তারিত বর্ণনা আছে। জন্মের ক্রমানুসারে বোধিসত্ত্বের বিভিন্ন রূপে কল্পনা করা হয়। তাঁর প্রথম রূপ হচ্ছে অবলোকিতেশ্বর। অবলোকিতেশ্বর করুণার আধার। তারপর মঞ্জুশ্রী বোধিসত্ত্ব। তিনি প্রজ্ঞার আধার। অতঃপর বজ্রপাণি, বজ্রগর্ভ, জ্ঞানগর্ভ, িিতগর্ভ, রত্নগর্ভ, আকাশগর্ভ, সূর্যগর্ভ, মৈত্রেয় প্রভৃতি বোধিসত্ত্বের কল্পনা করা হয়। বোধিসত্ত্বের এরূপ রূপকল্পনা মূলত গৌতম বুদ্ধের পূর্বজন্মসমূহের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। বোধিসত্ত্বের এ ধারণা ভারতবর্ষ থেকে এশিয়ার সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এ সকল অঞ্চলের মানুষ আজো বোধিসত্ত্বের আদর্শে উৎসর্গ করে চলেছেন।

আনুমানিক খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে রচিত ‘গুহ্যসমাজতন্ত্র’ কিংবা তারও পূর্বে রচিত ‘আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প’ গ্রন্থে প্রথম বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীর নাম পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে রচিত অনেক বৌদ্ধগ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্যের সন্ধান মেলে। ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাঙ, ইৎ সিঙ প্রমুখের ভ্রমণবৃত্তান্তে বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীর নামোল্লেখ আছে। ‘সদ্ধর্মপুণ্ডরিক’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, শাক্যমুণি বুদ্ধের সঙ্গে বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এছাড়াও ‘নামসঙ্গীতি’ গ্রন্থে বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীকে আদিবুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চীনা বৌদ্ধধর্মে প্রচলিত একটি কিংবদন্তি থেকে জানা যায় যে, চীনের সাধারণ মানুষের মুক্তি ও তাদের সদ্ধর্ম শিক্সা দেওয়ার জন্য গৌতম বুদ্ধ বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। স্বয়ম্ভূপুরাণও বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীকে একজন মহান সাধক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এছাড়া এখানে আরও অনেক মনোমুগ্ধকর কাহিনী আছে। সেসব কাহিনীর ভিত্তিতে বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীকে নেপালের সভ্যতা ও সংস্কৃতির স্রষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারো কারো ধারণা, বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রী একজন বৌদ্ধ ভিু হিসেবে নেপালে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন। মঞ্জুশ্রীকে কৃসির দেবতা, আধ্যাত্মিক জগতের স্থপতি এবং বিজ্ঞানের দেবতাও মনে করা হয়। বছরের প্রথম দিনটি মঞ্জুশ্রীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত বিধায় এদিন নেপালে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে তাঁর পূজা করা হয়।

বোধিসত্ত্ব জীবন এবং তাঁর আদর্শ ও উদ্দেশ্য:-

বুদ্ধত্ব লাভের জন্য যতœবান সত্ত্বকে বোধিসত্ত্ব বলা হয়। বোধিসত্ত্ব বুদ্ধজীবনের পূর্ববর্তী অবস্থার করণীয় পর্যায়। এ জীবন বুদ্ধিক জীবনের মহত্বপূর্ণ দিক; পূর্ণতার লণ। তাই ইহা মুক্তির অন্বেষণ এবং পারমী পরিক্রমার কালপর্ব। বোধি + সত্ত্ব = বোধিসত্ত্ব। বোধি অর্থ জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মনন; আর সত্ত্ব অর্থ জীভ (সার বা মূল উপাদান)। অতএব, বোধিসত্ত্ব শব্দের অর্থ দাঁড়ায় যে সত্ত্ব বোধি জ্ঞান লাভের জন্য সচেষ্ট। ড. বিনয়তোষ ভট্টাচার্য বলেছেন, বোধিসত্ত্ব জগৎ কারণ শূন্যের অশেষ গণের এক একটি গণের প্রতিমূর্তি স্বরূপ। বৌদ্ধ সাহিত্যে বুদ্ধাঙ্কুর জন্মকে অর্থাৎ বুদ্ধত্ব লাভের জন্য যতœবান ব্যক্তিকে বোধিসত্ত্ব বলা হয়। অনেক জন্মের সাধনার অন্তিম পরিণাম স্বরূপ বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি সম্ভব হয়। শাক্যমুনি গৌতম বুদ্ধ এক জন্মের সাধনায় বুদ্ধত্ব পদ লাভ করেন নাই, প্রত্যুত অনেক জন্মের (৫৫০ জন্ম ধারণ করে) সাধনায় বুদ্ধত্ব পদ লাভ করেছিলেন। প্রত্যেক জন্মে তাঁকে বোধিসত্ত্ব নামে অভিহিত করা হয়। মহাযান বৌদ্ধ ধর্মদর্শনে বোধিসত্ত্ব জীবনের গুরুত্ব অত্যধিক। মহাযানে বুদ্ধত্ব লাভের এক বিশিষ্ট সাধনার নিদের্শ হল বোধিচর্যা, বোধিচর্যার আরম্ভ বোধিচিত্ত গ্রহণ দ্বারা হয়ে থাকে।

মহাযানপন্থী সর্বজীবের মুক্তি এবং হীনযানপন্থী নিজের দুঃখ মুক্তিতে ব্যাপৃত। এ মতে, বোধিসত্ত্বের আদর্শ মহামৈত্রী ও মহাকরুণা। তিনি নিজের দেহ, নিজের জীবন, নিজের সকল কুশলের মূল পর্যন্ত জীব-জগতকে দান করেন। অথচ তার কোন প্রতিদান আকাক্সা করেন না। বৌদ্ধ সাহিত্যে বলা হয়েছে, ‘বুদ্ধো বোধেয্যুং, মুত্তো মোচেয্যুং, তিন্নো তরেয্যুং’। অর্থাৎ আমি নিজে বুদ্ধ হয়ে অন্যকেও বোধি লাভে সাহায্য করবো, নিজে মুক্ত হয়ে অন্যকেও মুক্ত করবো, নিজে সংসার সাগর উত্তীর্ণ হয়ে অন্যকেও উত্তীর্ণ করবো।

মহাযান গ্রন্থে বুদ্ধত্ব পদ প্রাপ্তির জন্য এক বিশিষ্ট সাধনার নির্দেশ মিলে, যার নাম বোধিচর্যা। বোধিচর্যার আরম্ভ বোধিচিত্ত গ্রহণ দ্বারা হয়। পালি পিটক গ্রন্থে বোধিসত্ত্ব শব্দ অনেক বার এসেছে, বুদ্ধ হওয়ার পূর্বে আমি যখন বোধিসত্ত্ব ছিলাম। এইখানে বোধিসত্ত্বের অর্থ, বোধি বা জ্ঞান লাভের জন্য প্রযতœশীল প্রাণী। বুদ্ধ পূর্বজন্মে যখন বুদ্ধত্ব লাভের সাধনা করতে ছিলেন, তখন তিনি বোধিসত্ত্ব ছিলেন। বোধিসত্ত্বই পরে বুদ্ধ হন। মহাযানে এসে বোধিসত্ত্বের স্বরূপেও পরিবর্তন হয়। তাঁদের মতে যেই পর্যন্ত বিশ্বের একজন মাত্র প্রাণীও অমুক্ত থাকবে সেই পর্যন্ত তিনি স্বীয় প্রযতœলব্ধ নির্বাণকে স্বীকার করবেন না। নির্বাণ লাভ তাঁদের মতে স্বার্থপরতা, সংকীর্ণতা ও হীন আদর্শ, পরন্ত পরিমুক্তির জন্য আত্মবিমুক্তি ত্যাগ করাই পরার্থতা, মহান আদর্শ, এই মহাযান। কারণ তাঁদের মতে নির্বাণ-মুক্তি অন্তিম অবস্থা নয়, এর পরেও তথাগত জ্ঞান দ্বারা সম্যক সম্বোধির অন্বেষণ করতে হয়। এই রূপে মহাযানে অনুত্তর সম্যক সম্বোধিকে নির্বাণ হতে পৃথক করা হয়েছে এবং ইহাকে এক উচ্চতর স্থিতি বলা হয়েছে। পালি নিকায় গ্রন্থে এই রূপ কোন বিভাগ করা হয়নি। অধিকন্তু মহাযান বৈপুল্যসূত্রাদিতে বুদ্ধকে চিরশাশ্বত করে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তাঁদের মতে নির্বাণের অর্থ বুদ্ধ অবস্থার শাশ্বতত্ব। সমাধিরাজসূত্রে বুদ্ধকে আদি-অন্তহীন চিরশাশ্বত বলা হয়েছে, নাম সঙ্গীত তন্ত্রে অনাদি অনন্ত বলা হয়েছে।

মহাযানীদের মতে বোধিসত্ত্বগণ নির্বাণের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ভূতদয়া দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বিশ্বপ্রাণীর উপকারার্থে নিজের স্বাধীকারকেও পরিত্যাগ করেন। এই জন্যই মহাযান গ্রন্থে বোধিসত্ত্বের সপ্তবিধ অনুত্তর পূজার এক অঙ্গ ‘বুদ্ধ যাচনা’ বলা হয়েছে। এতে নির্বাণাভিলাষী ব্যক্তি কর্তৃক কৃতকৃতের নিকট প্রার্থনা হয় যে, তিনি যেন অনন্ত কল্প পর্যন্ত নিবাস করেন, যাতে লোক অন্ধকারে আচ্ছন্ন না থাকে। বোধি সাধকের আদর্শ মহাযান বৌদ্ধধর্মের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বৌদ্ধধর্মে সাধকের ত্রিবিধ যান বা সাধনমার্গের কথা রয়েছে। যথা- ক. শ্রাবক যান, খ. প্রত্যেক বুদ্ধযান ও গ. বোধিসত্ত্বযান

শ্রাবকযানের সাধক স্বীয় দুঃখ বিমুক্তির জন্য গুরুর নিকট সাধনা করে অর্হত্ব লাভে সচেষ্ট। যে সাধক গুরুর উপদেশ ছাড়া নিজস্ব জ্ঞান বলেই সাধনা করে বোধি লাভে সমর্থ হন তিনি প্রত্যেক বুদ্ধ নামে অভিহিত হন। এর নামই প্রত্যেক বুদ্ধযান। তাঁরা কিন্তু মানবকে বোধিমার্গে অধিগায়ন গমনে প্রবৃত্ত হন না। বোধিসত্ত্ব যানের সাধক শুধু নিজের বিমুক্তি নয়, সর্বজীবের দুঃখ মুক্তির জন্য বুদ্ধত্ব লাভে ইচ্ছুক। শ্রাবক যান ও প্রত্যেক বুদ্ধযান দুটো ‘হীনযান’ নামে এবং বোধিসত্ত্বযান ‘মহাযান’ নামে আখ্যায়িত করা হয়।
বৌদ্ধধর্মে মানুষ মাত্রকেই দুই শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছ পৃথকজন ও আর্য। যারা সংসার প্রপঞ্চেলীন হয়ে অজ্ঞভাবে জীবন অতিবহিত করে তাদেরকে পৃথকজন বলা হয়। আর যাঁরা সংসার প্রপঞ্চের দৃঢ় বন্ধনকেও ছিন্ন করে নির্বাণগামী মার্গে আরূঢ় হন, তাঁদেরকেই আর্য বলা হয়। তাঁদের চরম ল্য অর্হৎ পদের প্রাপ্তি। এই পদে পৌঁছতে হলে চারটি সোপান অতিক্রম করতে হয়- স্রোতাপত্তি, সকৃদাগামী, অনাগামী ও অর্হৎ।

বোধিসত্ত্বের মহাকরুণা ও সাত্ত্বিক দর্শন:-

বোধিসত্ত্ব যানকেই মহাযান বলা হয়। মহাযানে বোধিসত্ত্বযানের কল্পনা এক অদ্বিতীয়, শক্তিশালী, উদার এবং উপাদেয় সিদ্ধান্তÑযার ফল স্বরূপ বৌদ্ধধর্ম এশিয়ার এক বিশাল ভূখণ্ডের উপর আধিপত্য বিস্তারে সমর্থ হয়েছিল। তারই সুদূর প্রসারী পরিণাম আজ মহাযান অধ্যুষিত চীন, জাপান, কোরিয়া, মাঞ্চুরিয়া, ভিয়েতনাম, তিব্বত, ভূটান প্রভৃতি দেশ এবং লাদাখ সিকিম, দাজিলিং প্রভৃতি ভারতের বিস্তৃত পার্বত্য প্রদেশ সমূহে কোটি কোটি মানুষ বুদ্ধের অনন্য ভক্ত। মহাযানের এই উদার মহত্বশালী এবং ক্রমবিকশিত ও সম্প্রসারণশীল নীতিই এই রূপ অসাধারণ সফলতা লাভে সমর্থ হয়েছিল। মহাযান ধর্ম যে শুধু বৌদ্ধধর্মের তত্ত্ব বিশ্লেষণে এই সকল দেশের অগণিত মানব হৃদয় জয় করেছিলেন তা নহে, সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনেক ধর্মবিশ্বাসকেও নিজের মধ্যে গ্রহণ করেছিল, ইতিহাসই তার স্যা দেয়।

বোধিসত্ত্বযানের শাব্দিক অর্থ বোধি বা জ্ঞান প্রাপ্তির মার্গ। এই মার্গ দিয়েই অগ্রসর হলেই সাধক এক বিশিষ্ট মার্গফলের অধিকারী হন। তা প্রাপ্তির জন্য অন্য এক বিশিষ্ট সাধনার প্রয়োজন, তা হল সপ্তত্রিংশৎ বোধিপীয় ধর্মের মাধ্যমে পারমিতা সমূহের পূর্ণতা প্রাপ্ত করা। স্থবিরবাদীদের মতে পারমিতা সিদ্ধান্ত দশ প্রকার : দান, শীল, নৈষ্ক্রম্য, প্রজ্ঞা, বীর্য, ান্তি, সত্য, অধিষ্ঠান, মৈত্রী ও উপো। পরন্তু মহাযানী গ্রন্থে পারমিতা ছয় প্রকার : দান, শীল, ান্তি, বীর্য, ধ্যান ও প্রজ্ঞা। পরবর্তীকালে উপায়কৌশল্য, প্রণিদান, বল ও জ্ঞান সহযোগে তার সংখ্যাও দশ করা হয়েছে; পরন্তু ষ্ট পারমিতাই অধিক প্রসিদ্ধ ও প্রামাণিক মানা হয়। এদের মধ্যেও আবার প্রজ্ঞার প্রাধান্যই সর্বাধিক। বোধিসত্ত্বযান বা মহাযানের অনুশীলন ঐ সকল ব্যক্তির পইে সম্ভব, যাঁদের প্রজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গে মহাকরুণাও বিদ্যমান। ‘আর্য গয়াশীর্ষ’ নামক তন্ত্র গ্রন্থে মঞ্জুশ্রী হতে জিজ্ঞাসা করছেন যে, বোধিসত্ত্বচর্যার আরম্ভ কি? আর ইহার অধিষ্ঠান বা আলম্বন কি?

উত্তরে মঞ্জুশ্রী বলেছেন, বোধিসত্ত্বচর্যা মহাকরুণা পর:সর আর মহাকরুণাই ইহার আরম্ভ এবং দুঃখিত প্রাণীই মহাকরুণার আলম্বন। এইজন্য ধর্মসঙ্গীতিতে বোধিকারক ধর্মসমূহে মহাকরুণাকে সর্বপ্রথম স্থান দেওয়া হয়েছে। এর মতে বোধিসত্ত্বদের কেবল একই ধর্ম স্বায়ত্ব করা দরকারÑ যার নাম মহাকরুণা। এই মহাকরুণা যেই মার্গানুসরণ করে, অপর বোধিকারক ধর্মসমূহও সেই মার্গরই অনুগমন করে, যেমন- জীবিতেন্দ্রিয় থাকলেই অন্য ইন্দ্রিয় সকল প্রবৃত্ত হয়।

জগতের কল্যাণ সাধনই বোধিসত্ত্বগণের জীবনের পরম উদ্দেশ্য। তাঁদের স্বার্থ এতই বিস্তৃত যে, স্ব এর পরিধির ভিতরই জাগতিক সমস্ত প্রাণী সমাহিত হয়। বিশ্বের একজন মাত্র প্রাণীও যদি দুঃখানুভাব করতে থাকে, তাহলে তাঁরা স্বীয় মুক্তিও তৃণবৎ ত্যাগ করেন। তাঁদের হৃদয় করুণা দ্বারা এতই দ্রবিভূত হয় যে, দুঃখীর দুঃখে সতিই বিগলিত হয়ে উঠে। তাই শান্তিদেব বোধিসত্ত্বের করুণা সম্বন্ধে নিম্নোক্ত শ্লোকে তা ব্যক্ত করেছেনÑ
এবং সর্বমিদং ক্বত্বা যন্মস্না সাধিতং শুভং,

তেন স্যাং সর্বসত্ত্বানাং সর্বদুঃখ প্রশান্তিকৃত। (বোধিচর্যাবতার, ৩। ৬)
সৌগতমার্গের অনুষ্ঠান দ্বারা আমি যেই পুণ্যসম্ভার অর্জন করেছি, তাদ্বারা আমার এই কামনা যে, সমস্ত প্রাণীর দুঃখ শান্ত হোক। মুক্ত পুরুষের হৃদয়ে যেই আনন্দ সমুদ্রের হিল্লোল উঠে, ইহাই আমার জীবনকে সুখী করতে পর্যপ্ত, রসহীন শু´ মো লাভে আমার কি প্রয়োজন? যথা-
‘মুচ্যমানেষু সত্ত্বেষু যে তে প্রমোদ্যসাগরা:,
তৈরেব নভু পর্যাপ্তং মেণোরসিকেন কিং।’ (বোধিচর্যাবতার, ৮। ১০৮)
অতএব বোধিসত্ত্বগণ নিজের পরার্থে স্থাপন করতে বিশ্বপ্রাণীও পরার্ধে স্থাপন করতে চান এবং নিজের পরিনির্বাণের অপো না করে বিশ্বপ্রাণীকেই নির্বাণে পৌঁছাতে চান, এটাই বোধিসত্ত্বচর্যার পরম পরার্থতা, চরম সার্থকতা।

সাত্ত্বিক জীবন বোধিসত্ত্ব কল্পনার তাৎপর্য:-

বোধিসত্ত্ব আদর্শের বিকাশ সম্বন্ধে আলোচনা করে দেখা গেল, সর্বপ্রথম যখন মহাযানে বোধিসত্ত্বের কল্পনা অঙ্কুরিত হয়, তখন অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্ত্বই প্রথম দেখা দেন। তাঁর পরই মঞ্জুশ্রী বোধিসত্ত্বের আবির্ভাব। তাঁদের মধ্যে অবলোকিতেশ্বর ছিলেন করুণার প্রতীক আর মঞ্জুশ্রী হলেন প্রজ্ঞার অধিকারী। বিকাশের প্রথম অবস্থাতে প্রজ্ঞার স্থান হল করুণা হতে অধিক মহত্ত্বশালী। এর তাৎপর্য এই যে, মঞ্জুশ্রী বোধিসত্ত্ব অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্ত্ব হতে অধিক মহত্বপূর্ণ পরে এই ক্রমের পরিবর্তন দেখা দেয় এবং প্রজ্ঞা হতে করুণা অধিক উচ্চস্থান প্রাপ্ত হয়। পরবর্তীকালে সামন্তভদ্র, বজ্রপাণি, বজ্রগর্ভ, জ্ঞানগর্ভ, িিতগর্ভ, রতœগর্ভ, আকাশগর্ভ, সূর্যগর্ভ, মৈত্রেয় প্রভৃতি অনেক বোধিসত্ত্বের কল্পনা অঙ্কুরিত হয়। এদের মধ্যেও আবার করুণার প্রতীক রূপে অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্ত্বের স্থানই সর্বোচ্চে নিশ্চিত হয়।

উপরি উক্ত বোধিসত্ত্বের যে কল্পনা বিকাশ লাভ করেছিল, তাতে নিশ্চিত কোন ঐতিহাসিক আধার নাই, তবে গৌতম বুদ্ধের পূর্ব জীবনচর্যার উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল বোধিসত্ত্বের কল্পনা। বুদ্ধ যেই করুণা দৃষ্টিতে বিশ্বসংসার জ্ঞানাবলোকন করেছিলেন, তারই প্রতীকরূপে অবলোকিতেশ্বরের কল্পনা অঙ্কুরিত হয়েছিল। এই রূপে বুদ্ধের মঞ্জুঘোষ মঞ্জুশ্রী বোধিসত্ত্বরূপে প্রতীকবদ্ধ হয়েছে। এভাবে অন্যান্য বোধিসত্ত্বেরাও বুদ্ধের বিভিন্ন জীবন ও ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন গুণব্যুহের প্রতীকরূপে কল্পিত হয়েছে। অবলোকিতেশ্বরের উপরি উক্ত গুণব্যুহতে এর সমর্থন মিলে। অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্ত্ব যে শুধু করুণার পারাবার ছিলেন তা নয়, তিনি সৃষ্টির স্রষ্টাও ছিলেন। কারণ্ডব্যূহ তথা অন্যান্য মহাযান সূত্র গ্রন্থে বলা হয়েছে, অবলোকিতেশ্বরের চু হতে চন্দ্র-সূর্য, ভ্রƒ হতে মহেশ্বর, বাহু হতে ব্রহ্মা আদি দেবগণ, হৃদয় হতে নারায়ণ, দন্ত হতে সরস্বতী, মুখ হতে মরুত, পদ হতে পৃথিবী আর উদর হতে বরুণের উৎপত্তি হয়। এইভাবে অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্ত্বকে সর্বোচ্চ সিংহাসনে বসান হয়েছিল।

তাঁদের কল্পনায় তিনি শুধু সৃষ্টিকর্তা ছিলেন না; মুক্তিদাতাও ছিলেন। তাই বোধিচর্যাবতার গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘আমি অনাথের নাথ, যাত্রীর স্বার্থবাহ পারে ইচ্ছুক তরণী, সেতু ও ধরণী ; দীপার্থীর দীপ, শর্য্যার্থীর শর্য্যা, দাসার্থীর দাস; এই ভাবে আমি সমস্ত প্রাণীর সেবক হব।

পালি সাহিত্যের জাতক নিদান গ্রন্থে মহাযানী বোধিসত্ত্বের আদর্শের মূলস্রোত খুঁজে পাওয়া যায়। গৌতম বুদ্ধ সুমেধ তাপস অবস্থার চিন্তা করেছিলেন যে, আমি যদি চেষ্টা করি তাহলে অবশ্যই সর্বপ্রকার চিত্তমালিন্য নিঃশেষ করে সংঘভুক্ত হয়ে নির্বাণ লাভ করতে পারি; কিন্তু বলবীর্য সম্পন্ন পুরুষের পে একাকী মুক্ত হওয়ার কি ই বা সার্থকতা আছে। আমিও দীপঙ্কর দশবলের ন্যায় সর্বজ্ঞতা জ্ঞান লাভ করে দেব-মানব সহ অসংখ্য প্রাণীকে মুক্ত করব। তাই জাতক নিদানে বলা হয়েছে,

‘কিং মে একেন তিন্নেন পুরিসেন থামদস্সিনা,
সব্বঞ্ঞূতং পাপূনিত্বা সন্তরেস্সং সদেবকং।’
কি উদাত্ত ভাবনা, বিশ্বপ্রাণীর সঙ্গে নিজকে একাকার করার কি বিহ্বলতা, পরার্থে আত্মার্থ বিলীন করে দেওয়ার কি অদম্য উদ্যোগ। এইত বোধিসত্ত্ব আদর্শের চরম বিকাশ, পরম পরাকাষ্ঠা। চীন, জাপান আদি বৌদ্ধ দেশে এর বিপুল প্রভাব, লোক সেবার ধার্মিক অভিব্যক্তি রূপে আজও বিদ্যমান। পরবর্তী কালে ইহাই প্রচারকদের মধ্যে এই উদাত্ত ভাবনার প্রতিফলন দেখা যায়। সাধনা ধর্মের সঙ্গে সঙ্গে সেবাধর্মের সমন্বয় বৌদ্ধ আচার্যদের জীবনের মহান আদর্শ মহাযানে এসে চরম বিকাশ লাভ করে, যার ক্রিয়াত্মক রূপ ভারত তথা বিশ্বের অনেক দেশে আজও ক্রিয়াশীল।

উপসংহার:-

মহাযান বৌদ্ধধর্ম দর্শন প্রাচীন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মহাযান মতাদর্শ বুদ্ধোত্তর কালে প্রচলিত হয়। এ মতবাদের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু বোধিসত্ত্ব। বোধিসত্ত্বের জীবন ও দর্শনকে ভিত্তি করে আবতির্ত হয়েছে। আলোচ্য এ প্রবন্ধে বোধিসত্ত্বের নানা দিক ও বৈশিষ্ট্যতা আলোচনার পাশাপাশি আদর্শ উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিভাত হয়েছে- প্রথমত : মহাযান ধর্মদর্শনের বিবর্তন, প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য, বোধি মার্গ বা যান। দ্বিতীয়ত : মহাসত্ত্ব বোধিসত্ত্বের জীবন ও দর্শন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যউপাত্ত। তৃতীয়ত : মহাযান ধর্মদর্শনে বোধিসত্ত্বের সাতটি বিষেশত্ব ও দশভূমি ভাবনা। চতুর্থত : বোধিসত্ত্বের আদর্শ ও উদ্দেশ্য এবং মহাকরুণা ও তাৎপর্য। এ পর্যালোচনার ফলে পালি সাহিত্য তথা বৌদ্ধ সাহিত্য ভাণ্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ হবে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরো অধিক গবেষণা, চর্চা ও প্রয়োগিক দর্শন প্রয়োজন।

মহাযান/রাউলী/লুরি বৌদ্ধ ধর্ম পদ
Facebook Comments