মিন্নিকে ঘিরে আরও প্রশ্ন

465

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের যতই দিন গড়াচ্ছে ততই নতুন নতুন বিষয় সামনে আসছে। সোমবার হত্যাকাণ্ডের ১৩তম অতিবাহিত হয়েছে। এরই মধ্যে মূল অভিযুক্ত নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া রিফাত ফরাজীকে দ্বিতীয় দফা রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। মিলেছে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রামদাটি।

এর মাঝে, রিফাত হত্যার দ্বিতীয় একটি ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ পেয়েছে। এ ভিডিওর বিশ্লেষণে নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির ভূমিকা নিয়ে আরও প্রশ্ন উঠেছে। ভিডিওতে সকাল ১০টা ১২ মিনিটে দেখা যায় গেটের পাশে রাখা একটি বাইকে করে রিফাত তার স্ত্রী মিন্নিকে নিয়ে চলে যেতে চান। কিন্তু মিন্নি রিফাতের বাইকে চড়তে অস্বীকৃতি জানান। মিন্নি দ্রুত কলেজের দিকে ফিরে যেতে থাকেন। রিফাত তখন মিন্নিকে ফেরানোর চেষ্টা করেন এবং পুনরায় তাকে বাইকে ওঠার জন্য অনুরোধ জানান। কিন্তু মিন্নি গেটের কাছে দাঁড়িয়ে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। এভাবে কেটে যায় দুই মিনিট। ১০টা ১৩ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে একদল যুবক রিফাতকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকে। যুবকদের মধ্যে রিশান ফরাজী রিফাতকে শক্ত করে ধরে থাকতে দেখা যায়। আর এ সময় মিন্নিকে নির্বিকারচিত্তে তাদের পেছনে পেছনে ধীরলয়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়।

যুবকরা রিফাতকে কেলিফ একাডেমির সামনে নিয়ে যায়, সেখানে যোগ দেয় নয়ন বন্ড। এলোপাতাড়ি কিল ঘুষি মারতে শুরু করে রিফাতকে। সেখানে তারা প্রায় ১ মিনিট ধরে নয়নকে মারতে থাকে। এ সময় কালো শার্ট পরিহিত রিফাত ফরায়েজী কোথা থেকে দুটি রামদা নিয়ে আসে। একটি নিজের কাছে রেখে দেয় এবং অপরটি নয়নকে দেয়। ১১টা ১৪ মিনিট ২০ সেকেন্ড থেকে ১১টা ১৪ মিনিট ৫০ সেকেন্ড পর্যন্ত মোট ৩০ সেকেন্ড উপর্যুপরি কোপায় নয়ন বন্ড ও তার বাহিনী। এক পর্যায়ে মিন্নি নয়ন বন্ডকে পেছন থেকে বাধা দিতে থাকেন। কিন্তু অন্য কাউকে বাধা দিতে দেখা যায়নি। হত্যাকাণ্ডের পর নয়নরা পালিয়ে গেলে একজন মিন্নিকে তার পার্সটি মাটি থেকে হাতে তুলে দেন। এ সময় মিন্নি ঘটনাস্থলে ছিল।

১১টা ১৫ মিনিট ১০ সেকেন্ডে রিফাত পাশে থাকা মিন্নির কাছে না গিয়ে একটি রিকশায় উঠে একা চলে যান। রিফাত তখন মিন্নির কাছে যাওয়ার কোনো চেষ্টা করেননি এমনকি মিন্নিকে রিকশায় নেওয়ার কোনো ইচ্ছাও পোষণ করতে দেখা যায়নি।

নতুন ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশের পর থেকে রিফাত হত্যাকাণ্ডে তার স্ত্রী মিন্নির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আরও ডালপালা ছড়াতে থাকে। অনেকের মনে প্রশ্ন কেন মিন্নি প্রথম দফায় রিফাতের সঙ্গে মোটরসাইকেলে করে নিরাপদে চলে যেতে অস্বীকৃতি জানালেন। কেনই বা কলেজের দিকে গিয়ে সময়ক্ষেপণ করলেন। আর তার পর পর খুনিরা এসে নিরাপদে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলে গেল। মিন্নির মোটরসাইকেলে না চড়া এবং কালক্ষেপণের কারণে রিফাতকে হত্যাকারীরা ধরে নিয়ে যাওয়াকে অনেকেই কাকতালীয় হিসেবে দেখছেন না। আবার যখন রিফাতকে খুনিরা ধরে নিয়ে যায় তখন মিন্নির নির্লিপ্ততা এবং কারও কাছে সাহায্য না চাওয়া কিংবা নিজে কোনো প্রতিরোধ না গড়ে তোলাকে অনেকেই সহজভাবে নিচ্ছে না।

এর আগে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও সম্পর্কে মিন্নি আত্মপক্ষ সমর্থন করে খোলা কাগজকে বলেন, রিফাতকে হত্যার শুরুর দিকে আমি ভাবতেই পারিনি কী ঘটতে যাচ্ছে। তাই স্বাভাবিক ছিলাম। কিন্তু যখন রিফাতকে দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করল, আমি তাকে বাঁচাতে ছুটে যাই। খুনিদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা করি। যদিও আমার কথা কেউ শোনেনি।

মিন্নি আরও বলেন, নয়ন বন্ড ক্রসফায়ারে মারা গেছে। এতে আমি খুশি। তবে তাকে জীবিত রাখা গেলে জড়িত অন্য আসামিদের তথ্যও জানা যেত। এ মামলায় সুবিচার পাবেন বলে খোলা কাগজের কাছে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

রিফাত ফরাজী বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা ৭ দিনের রিমান্ডে
বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যার মামলার দ্বিতীয় আসামি রিফাত ফরাজীকে একটি অস্ত্র মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার বরগুনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হুমায়ূন কবির এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, পুলিশের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করে বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজী গত সোমবার বিকালে এ আদেশ দেন।

তিনি বলেন, এই অস্ত্র মামলায় রিফাত ফরাজীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। এর আগে শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফ হত্যা মামলায়ও পুলিশ তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

পরিদর্শক হুমায়ূন কবির জানান, রিফাত শরীফ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত পাঁচজন এবং সন্দেহভাজন হিসেবে ছয়জনকে এ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মোট ছয়জন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ২৫ জুন বরগুনা জেলা শহরের কলেজ রোডে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে আহত করে একদল যুবক। বরগুনা সদর হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। পরে রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ ১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে সদর থানায় মামলা করেন।

এর মধ্যে মামলার ১ নম্বর আসামি সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড গত মঙ্গলবার ভোরে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি গুলি, দুটি গুলির খোসা ও তিনটি রামদা উদ্ধার করে। এ ঘটনায় ওই দিনই পুলিশ বাদী হয়ে একটি অস্ত্র মামলা করে। এ মামলায় রিফাত ফরাজীকেও আসামি করা হয়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments