মিন্নি ভিলেন না ভিক্টিম: যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি আজো!

405

আনিসুর রহমান

বরগুনার রিফাত হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী মিন্নির গ্রেফতার নিয়ে আলোচনা এখন সবখানে। আলোচনা যতটা রিফাতের খুনিদের নিয়ে, তার চেয়ে অনেক বেশি রিফাতের স্ত্রী মিন্নিকে নিয়ে। পুলিশ গতকাল মঙ্গলবার সকালে একটি আসামিকে শনাক্তের কথা বলে মিন্নিকে তার নিজ বাসা থেকে পুলিশ লাইনে নিয়ে যায়। দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাতে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। রাত সাড়ে ৯টায় পুলিশ সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, আয়শা আক্তার মিন্নি তার স্বামী রিফাত হত্যায় জড়িত। অন্যদিকে পুলিশের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে মিন্নির বাবা বলেছেন, আমার মেয়েকে সারাদিন জিজ্ঞাসাবাদের নামে মানসিক নির্যাতন করে বিপর্যস্ত করা হয়েছে, এই অবস্থায় তার কোনো কথার সূত্র ধরে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়।

এ অবস্থায় মানুষ কোনটা বিশ্বাস করবে? কোন দিকে যাবে? এখন সবার একটাই জিজ্ঞাসা- রিফাত হত্যার ঘটনায় মিন্নি কি ভিক্টিম না ভিলেন, তিনি কি স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ষড়যন্ত্রের শিকার নাকি সত্যিই তিনি রিফাত হত্যার পরিকল্পনাকারীদের একজন। সেটি নিয়েই আজকের এই মতামতধর্মী লেখা। আমার সাথে আপনার দ্বিমত হতে পারে। আপনার দ্বিমতকেও আমি শ্রদ্ধা জানাই।

শুরুতেই বলি, নয়নের সাথে মিন্নির বিয়ের দাবি প্রসংগে, মিন্নির দাবি, নয়ন তাকে অস্ত্রের মুখে একটি ঘরে নিয়ে বিয়ের কাবিনের বইয়ে স্বাক্ষর নিয়েছিল। তিনি নয়নকে বিয়ে করেননি। অপরদিকে এই বিয়ে যদি সত্যও হয়ে থাকে, তাহলে কী করে মিন্নি নয়নকে ডিভোর্স না দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করলেন? রিফাত যে মিন্নির স্বামী, এটা পরিবার-সমাজ সবাই জানে। নয়নও যে মিন্নির স্বামী, এটা কি সবাই আগে থেকে জানত? হত্যাকাণ্ড ঘটার পর এসব প্রকাশ করা হলো কেন? নিশ্চয়ই কারো স্বার্থ রক্ষার জন্য! একটা মেয়ে কিভাবে নয়নের মতো এমন একটা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর স্ত্রী হয়ে কোনো দেনদরবার ছা্ড়াই রিফাতকে বিয়ে করে!!! তখন এ নিয়ে কেন সমাজে কোনো আলোচনা ছিল না। তখন নয়ন, তার মা ও প্রভাবশালীরা কোথায় ছিলেন! এসব প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক কারণেই সামনে চলে আসেছে।

এখন মিন্নির শ্বশুর দুলাল শরীফ নতুন করে নয়নের সাথে মিন্নির বিয়ের কাহিনি নিয়ে কথা তুললেন ! বলছেন, এ কথা তিনি আগে জানতেন না। তাহলে তিনি কবে জেনেছেন এই কথা? নয়নের স্ত্রীর বিয়ে হয়ে যায়, আর নয়নও এটা গোপন রাখলো? নয়নের মাও কারো কাছে এর একটা বিহিত চাননি? এটা কি প্রশ্ন জাগার মতো নয়?

রিফাতের সাথে যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে মিন্নির বিয়ে হয়, সেদিন নয়ন কি দেশে ছিল না? যদি দেশে থেকে থাকে তাহলে কেন সে তার ০০৭ বাহিনি নিয়ে রিফাতের বাড়িতে গিয়ে বলে না যে মিন্নি তার স্ত্রী! এই দুনিয়ায় প্রেমিকার বিয়েতে বাধা দেয়ার ঘটনা শোনা যায়, কিন্তু নিজের স্ত্রীর বিয়ে হয়ে যায় সেই বিয়েতে কোনো বাধা নাই! রিফাতের বাবাকে তো নয়ন ফোন করেও বলতে পারতো- মিন্নি তার স্ত্রী! আর নয়নের মা এখন বলছে, মিন্নি দুই স্বামীর ! এই দাবি যদি সত্য হয় তাহলে এই অন্যায় চলাকালে এর বিরুদ্ধে কী প্রতিবাদ করেছেন নয়নে মা? কার কাছে নালিশ করেছেন? এই প্রশ্ন কি ওঠে না?

নয়নের মা রিফাত হত্যার পর থেকে ঘরে তালা মেরে অন্য কোথাও ছিলেন। এতদিন পর পুলিশ নয়নের মাকে নিয়ে তার ঘরে ঠুকলেন, নয়নের সাথে মিন্নির সম্পর্ক নিয়ে আলাপ করলেন, আর এর পরই তিনি মিন্নির বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে সব দোষ মিন্নিকে দিলেন, যারা খুন করলো তাদের বিরুদ্ধে একটি শব্দও বললেন না!

অন্যাদিকে, নয়নের মার বক্তব্য মিডিয়ায় আসার পরই রিফাতের বাবা সংবাদ সম্মেলন করার জন্য হাজির হয়ে গেলেন প্রেসক্লাবে! এত সহজেই? যিনি আপনার পুত্রবধূ, যার বিরুদ্ধে আপনার কোনো অভিযোগই ছিল না, ১২ জনকে আসামি করলেন আর মিন্নিকে মানলেন প্রত্যক্ষ এবং বিশ্বস্ত সাক্ষী! এখন খুনি নয়নের মার বক্তব্য শুনেই সব পাল্টে গেল! তা যাচাই করার জন্য সময় নেওয়ার সরকার মনে করলেন না, তাকে গ্রেফতারের দাবি জানাতে সংবাদ সম্মেলন করতে প্রেসক্লাবে চলে এলেন! আবার সেই সংবাদ সম্মেলনের সময় স্থানীয় এমপি শম্ভুর ছেলে সুনাম দেবনাথ প্রেসক্লাবে আসা যাওয়া করছিলেন! তবে কী উদ্দেশ্যে তিনি তখন প্রেসক্লাবে উপস্থিত ছিলেন, মামলার তদন্তের সার্থে তা জানা জরুরি নয় কি? এরই মধ্যে মিন্নিকে গ্রেফতারের দাবিতে এলাকায় দীর্ঘ মানববন্ধন হয়ে গেল! স্লোগান দেওয়া হলো ‘মিন্নির ফাঁসি চাই’। আবার সেই মানববন্ধনে উপস্থিত থাকলেন শম্ভুর ছেলে সুনাম দেবনাথ! যার বিরুদ্ধে নয়নের সাথে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ আগে থেকেই। এসব কেন হচ্ছে, কারা করছে, মামলার তদন্তের সার্থে এটা কি জানা প্রয়োজন নেই?

আমার প্রশ্ন, মিন্নিকে গ্রেফতারের জন্য এলাকায় মানববন্ধন হয়, কিন্তু রিফাত হত্যার খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও বাকি ৫ জন্য খুনিকে গ্রেফতারের দাবিতে কেন মানববন্ধন হয় না? এখন প্রশ্ন হলো, এলাকায় প্রভাবশালীরা কার পাশে, মিন্নির না খুনিদের? কী মনে হয় আপনাদের কাছে? প্রশ্ন জাগে না? নয়ন এত এত মামলার আসামি হয়ে কিভাবে, কার শক্তিতে এলাকায় দাপিয়ে বেড়াত? কার ইশারায় অস্ত্র মামলায়ও সে জামিন পেয়ে যেত? এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি আজও। আমার ধারণা, এসব প্রশ্নের উত্তর পেলে এই ঘটনার তদন্ত সঠিক পথে মোড় নেবে।

গ্রেফতার হওয়ার আগে মিন্নি সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেছে, রিফাত হত্যার বিচার ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য প্রভাবশালীরা তার শ্বশুরকে কাজে লাগাচ্ছে! তার এই দাবিও পুলিশ গুরুত্বের সংগে দেখবে, আমরা সেটিও আশা করি। আমরা চাই প্রকৃত দোষীদের বিচার হোক। কেউ যেন পার না পায়। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারা, কারা মদদদাতা, তাদের নাম যেন প্রকাশ পায়, তাদেরও যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়। এমন বিচার চাই যেন রিফাত হত্যার মতো ঘটনা আর না ঘটে।

আনিসুর রহমান যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, পূর্বপশ্চিমবিডি

আস/এসআইসু

Facebook Comments