মিরসরাই ট্র্যাজেডির ৮ বছর

287

আলোকিত সকাল ডেস্ক

মিরসরাই ট্র্যাজেডি। যে শব্দটি শুনলে আঁতকে উঠে এই জনপদের মানুষসহ দেশ ও বিশ্ববাসী। শব্দটির সঙ্গে যারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত তারা ভেঙে পড়েন কান্নায়। এই জনপদের বিভীষিকাময়, বিষাদময় একটি অধ্যায়ের নাম মিরসরাই ট্র্যাজেডি।

২০১১ সালের ১১ জুলাই। এ দিনটি মিরসরাইবাসীর জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সারাজীবন এ দিনটির কথা ভুলতে পারবেন না তারা। কারণ স্মরণকালের অন্যতম আলোচিত ঘটনা এই মিরসরাই ট্র্যাজেডি। শুধু মিরসরাইয়ের আলোচিত ঘটনা নয়, এটি দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বেরও একটি আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়।

সেদিন এক সঙ্গে অকালেই ঝরে যায় ৪৫ টি তাজা গোলাপ। যারা এক সময় গন্ধ বিলাতো দেশ ছাড়িয়ে হয়তো বিশ্বেরও কোন প্রান্তে। কিন্তু গন্ধ বিলানোর আগেই না ফেরার দেশে চলে যায়। পিতার কাঁধে ছিল পুত্রের লাশ, যা একজন পিতার জন্য সবচেয়ে ভারী বস্তু। ছিল মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর গগনবিদারী আর্তনাদ। কেঁদেছে সবাই।

গ্রামের পর গ্রাম পরিণত হয়েছে কবরের নগরীতে। একে অপরকে সান্ত্বনা দেয়ার মত লোকও ছিলনা সে সময়। একটা সময় স্বজন হারাদের সান্ত্বনা দিতে ছুটে এসেছেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রীসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। স্বজন হারা পরিবারগুলোর সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে দলমত, জাতি-গোত্র নির্বিশেষে ছুটে এসেছেন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ।

মিরসরাই ট্র্যাজেডির ৮ বছর পেরিয়ে গেলেও অতীতের সব প্রতিশ্রুতি এখনও বাস্তবায়নের মুখ দেখে নি। হতাশার সুর প্রিয়জন হারানো স্বজনদের কণ্ঠে। বিশেষ করে নিহতদের স্বজন ও সহপাঠীরা শতবর্ষী বিদ্যাপীঠ আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ এবং ১১ জুলাইকে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছিলো।

উপেক্ষিত একাধিক প্রতিশ্রুতি : দুর্ঘটনার পর অনেক মন্ত্রী-এমপি, বহু সংস্থা-সংগঠন শোকে শামিল হতে আবুতোরাব যান। তখন তাঁরা নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে সেসব প্রতিশ্রুতির অধিকাংশই অপূর্ণ রয়ে গেছে।

তৎকালীন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার বলেছিলেন, এ ট্র্যাজেডির স্মরণে মিরসরাই স্টেডিয়াম মাঠকে বাস্তবের স্টেডিয়ামে পরিণত করবেন। কিন্তু সেটা আশ্বাসেই আটকে আছে।

তৎকালীন শিক্ষা সচিব বলেছিলেন, ৩৪ জন ছাত্র হারানো আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শূণ্যতা অপূরণীয়। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিদ্যালয়টিকে সরকারি ঘোষণা করবেন। কিন্তু সেটিও লাল ফিতার প্যাঁচে আটকে আছে।

সেদিন যা ঘটেছিল : ২০১১ সালের ১১ জুলাই। দুপুরে মিরসরাই সদরের স্টেডিয়াম থেকে বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের খেলা দেখে বাড়ি ফেরার পথে বড়তাকিয়া- আবুতোরাব সড়কের পশ্চিম সৈদালী এলাকায় তেতুলতলা নামক স্থানে সড়কের পাশের ডোবায় শিক্ষার্থী বহনকারী মিনি ট্রাক উল্টে পড়লে ৪২ শিক্ষার্থীসহ ৪৫ জন মারা যায়। মুহূর্তেই সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। ঘোষণা করা হয় তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক।

ট্র্যাজেডিতে নিহতরা : ১১ জুলাই ঘটনাস্থলে নিহতরা হলো- তাকিব উল্ল্যাহ মাহমুদ সাকিব, আনন্দ চন্দ্র দাশ, নুর মোহাম্মদ রাহাত, জাহেদুল ইসলাম, তোফাজ্জল ইসলাম, লিটন চন্দ্র দাশ, আরিফুল ইসলাম, উজ্জ্বল চন্দ্র নাথ, তারেক হোসেন, মোহাম্মদ সামছুদ্দিন, মেজবাহ উদ্দিন, ইমরান হোসেন ইমন, কাজল চন্দ্র নাথ, সূর্য চন্দ্র নাথ, ধ্রুব নাথ, সাজু কুমার দাশ, আবু সুফিয়ান সুজন, রুপন চন্দ্র নাথ, সামছুদ্দিন, আল মোবারক জুয়েল, ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদ, আমিন শরীফ, শরীফ উদ্দিন, সাখাওয়াত হোসেন, রাকিবুল ইসলাম চৌধুরী, কামরুল ইসলাম, সাখাওয়াত হোসেন, তারেক হোসেন, নয়ন শীল, জুয়েল বড়ুয়া, রায়হান উদ্দিন, এসএম রিয়াজ উদ্দিন, টিটু জল দাশ, রাজিব হোসেন, আশরাফ উদ্দিন, জিল্লুর রহমান, জাহেদুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, সাইদুল ইসলাম, আশরাফ উদ্দিন পনির, রায়হান উদ্দিন শুভ, মঞ্জুর মোর্শেদ, সাখাওয়াত হোসেন নয়ন, আনোয়ার হোসেন, হরনাথ দাশ।

কাটেনি শোকের মাতম : উপজেলার স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের আবাসভূমি খৈয়াছরা, মায়ানী, মঘাদিয়া, সাহেরখালী ইউনিয়নের ১১টি গ্রামে এখনও শোকের মাতম কাটেনি। চারটি ইউনিয়নের ১১টি গ্রাম হলো- মধ্যম মায়ানী, পূর্ব মায়ানী, পশ্চিম মায়ানী, সরকার টোলা, মাষ্টার পাড়া, শেখের তালুক, কচুয়া, দরগাহ পাড়া, মঘাদিয়া ঘোনা, মঘাদিয়া, পশ্চিম খৈয়াছরা।

মিরসরাই ট্র্যাজেডিতে মধ্যম মায়ানী গ্রামের সর্বোচ্চ স্কুল ছাত্র নিহত হয়। এ গ্রামের নিহত হয়েছে ১৬ জন স্কুল ছাত্র। এছাড়া আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩৪ জন, আবুতোরাব ফাজিল মাদ্রাসার ৩ জন, প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের ২ জন, আবুতোরাব এসএম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩ জন, ২ জন অভিভাবক ও ১ কিশোর নিহত হয়। স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত হয় ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’।

মিরসরাই ট্র্যাজেডিতে মহাকালের তিমিরে হারিয়ে গেছে ওরা ৪৫ জন। ঘটনার প্রথম বর্ষপূর্তিতে নিহতদের স্মরণে ২০১২ সালে আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’। ২০১২ সালের ১৯ মে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া ও মিরসরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. গিয়াস উদ্দিন। আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয় চত্বরে নির্মিত স্তম্ভে ব্যয় হয় প্রায় ১০ লাখ টাকা।

এদিকে দুর্ঘটনাস্থলে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ ‘অন্তিম’-এর উদ্বোধন করা হয় ২০১৬ সালের ১৪ মে। স্মৃতিস্তম্ভ ‘অন্তিম’ ও ‘আবেগ’-এর নকশা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল কবির। ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।

সেই দিনের অদম্য অভিভাবক আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিন : সেদিনের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় যারা বেঁচে ছিলো তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামের উন্নত হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে প্রেরণের গুরু দায়িত্বটি পালন করেছিলেন তৎকালীন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. গিয়াস উদ্দিন। নিহত শিক্ষার্থীদের লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর দায়িত্বও পালন করেন। প্রাথমিকভাবে দাফন-কাফনের জন্য আর্থিক সহায়তাও দিয়েছিলেন। সন্তানহারা বাবা-মা, ভাই হারা বোন, স্বজন হারাদের পাশে থেকে সান্ত্বনা দিয়ে গিয়েছিলেন। কখনো তাদের বুকে জড়িয়ে নিয়ে নিজের অন্তরের জমানো দুঃখ-কষ্ট একটু কেঁদে হালকা করে নিয়েছিলেন। উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে শোকসভার আয়োজন করেছিলেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিহতদের স্বজনদের পাশে থেকেছেন। বিভিন্ন দলমতের আগন্তুকদের সঙ্গে থেকে পথ পরিদর্শকের ভূমিকা পালন করতে ভুলেননি সেইদিনের সেই উপজেলা চেয়ারম্যান। নিহত শিক্ষার্থীদের কল্যাণে গড়ে তোলা হয়েছে সহায়তা তহবিল তাতেও অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে তাঁর।

ট্র্যাজেডির ৮ম বার্ষিকীর পূর্বে গত ৯ ও ১০ জুলাই নিহতদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিহতদের স্বজনদের খোঁজ খবর নেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন- মায়ানী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম গোলাম সরওয়ার, মায়ানী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুর উদ্দিন ভূঁইয়া, মিরসরাই পৌরসভার কাউন্সিলর রহিম উল্ল্যাহ, চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর সাবেক পরিচালক দেলোয়ার হোসেন, মিরসরাই ইয়ং অ্যাসোসিয়েশন কাতারের সভাপতি শিপন চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা নাছির উদ্দিন, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শেখ আব্দুল আউয়াল তুহিন।

মিরসরাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘১১ জুলাইয়ের মিরসরাই ট্র্যাজেডি শুধু মিরসরাইয়ের ইতিহাসে নয় সারা দেশ ও বিশ্ব কাঁপানো একটি দিন। এই দিনটিকে আমরা আমাদের মাঝে লালন করে ভবিষ্যৎ জীবনে পথ চলায় সতর্কতা অবলম্বন করবো। এই দিবসটি যেন যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় সেজন্য যা যা করার দরকার আমি তা করে আসছি, ভবিষ্যতেও করবো।’

৮ম বার্ষিকীতে বিভিন্ন কর্মসূচি : ট্রাজেডিতে নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের উদ্যোগে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- কালো ব্যাজ ধারণ ও শোক পতাকা উত্তোলন, খতমে কুরআন/প্রার্থনানুষ্ঠান, শোক র‌্যালি, স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’ এ পুষ্পমাল্য অর্পণ, নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে আলোচনা সভা, নিহতদের আত্মার মাগফেরাত/সদগতি কামনা করে মোনাজাত/প্রার্থনা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি।

মিরসরাই ট্র্যাজেডিতে নিহতদের গ্রামগুলোতে এখনো শোক কাটেনি। মিরসরাই ট্র্যাজেডিতে মধ্যম মায়ানী গ্রামের সর্বোচ্চ স্কুল ছাত্র নিহত হয়। এ গ্রামের নিহত হয়েছে ১৬ জন স্কুল ছাত্র। উপজেলার ১৩ নম্বর মায়ানী ইউনিয়নের পূর্ব মায়ানী গ্রামের মনু ভূঁইয়া পাড়ার আনোয়ার পাশা ও হাসিনা বেগমের একমাত্র পুত্র আবুতোরাব এসএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিল রাজীব হোসেন।

রাজীব হোসেনের মা হাসিনা বেগম কান্না ভারাক্রান্ত কণ্ঠে জানান, ‘সরকার খেলা দিয়ে আমার ছেলেকে কেড়ে নিয়েছে। ৭ টি বছর কেটে গেলো তবুও আমি আমার ছেলের কথা ভুলতে পারছি না, রাতে দিনে বারবার মনে পড়ে এইতো আমার ছেলে আমার দিকে ছুটে আসছে আমাকে মা বলে ডাকছে। আমার মা-বাবা সবাইকে হারিয়ে সম্বল ছিল, আমার ভরসাও অনেক আশা ছিল ওই একমাত্র পুত্র সন্তানকে নিয়ে। সবসময় আমার চোখের সামনে আমার ছেলের ছবি ভেসে উঠে। আজো ছেলের জন্য কোন কাজ করতে চাইলেও তাতে মন বসাতে পারিনা। আমার ছেলে বড় হলে আমাকে দেখভাল করতো, টাকাপয়সা দিয়ে কি হবে? তোমরা আমাকে টাকা দিও না আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও।’

মায়ানী ইউনিয়নের মধ্যম মায়ানী গ্রামের মৃত হারাধন শীল ও নীলিমা শীলের একমাত্র পুত্র ছিল আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র নয়ন চন্দ্র শীল। গত ৯ জুলাই নয়ন শীলের বাড়িতে মিরসরাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. গিয়াস উদ্দিন খোঁজখবর নেওয়ার জন্য বাড়ির আঙ্গিনায় পা রাখলে নয়ন শীলের মা নীলিমা শীল অঝোর কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর নয়ন শীল সাড়ে ৫ মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যায়। নয়ন শীলের মা নীলিমা শীল কেঁদে কেঁদে বলেন, ‘আমার ছেলে মারা যাওয়ার পর আমার শেষ অবলম্বন আর কিছু নেই। নয়নের পিতার মৃত্যুর পর নয়নকে ঘিরে আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম। পড়ালেখা করে সে সংসারের হাল ধরবে। নয়ন আমাকে বলতো মা তোমাকে আমি পড়ালেখা করে বড় হয়ে সুখী করে তুলবো। আমি যদি আমার ছেলেকে লেখাপড়া করতে না পাঠাতাম আজ আমার বুকের মানিক ধন আমাকে ছেড়ে চলে যেতো না। আমার ছেলেকে নিয়ে সুন্দর সংসার গড়ে তোলা হলো না। আমারতো খোঁজখবর নেওয়ার কেউ নেই, দুর্ঘটনার সময় থেকে প্রতিবছর গিয়াস সাহেব আমাদের সবসময় খোঁজখবর নেন।’

মায়ানী ইউনিয়নের মায়ানী বড়ুয়া পাড়ার ভদ্র সেন বড়ুয়া ও রঞ্জু বড়ুয়ার চার ছেলে মেয়ের মধ্যে তৃতীয় এবং আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল জুয়েল বড়ুয়া। জুয়েল বড়ুয়ার মা রঞ্জু বড়ুয়া বলেন, ‘আমার ছেলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখতো। খবরের কাগজ পড়ে পড়ে বলতো আমি ওদের মতো একদিন বড় হবো। কিন্তু আমার সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলো।’

মায়ানী ইউনিয়নের মধ্যম মায়ানী গ্রামের হামিদ ভূঁইয়া বাড়ির সামছুল হক ও জাহানারা বেগমের চার পুত্রের মধ্যে সবার ছোট এবং আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মনজুর মোর্শেদ। মনজুর মোর্শেদের মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘দুর্ঘটনার দিন মোর্শেদ আমার কাছে ১০ টাকা চায় কিন্তু টাকা না থাকায় আমি তার হাতে কোনো টাকা দিতে পারেনি। সে খেলাধুলা পছন্দ করতো, পড়ালেখায় ছিল বেশ মনোযোগী এবং নামাজ কালেমা পড়তো। বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে বড় ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। অভাবের সংসারে আমার অন্য ছেলেদের পড়াশোনা করাতে পারিনি তাই তাকে নিয়ে তার ভাইদের ও আমার স্বপ্ন ছিল তাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবো। ছেলেকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলে থাকতে পারি না, সে আমাকে ছেড়ে এভাবে চলে যাবে তা আমি ভাবতেও পারছি না।’

উপজেলার ১১ নম্বর মঘাদিয়া ইউনিয়নের মাষ্টার পাড়ার মাতু ভূঁইয়া বাড়ির কবির আহম্মদ সোহাগ ও পারুল আক্তারের দুই ছেলের মধ্যে আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী নুর মোহাম্মদ রাহাত ছিল বড়। ছেলের খেলার সরঞ্জাম নিয়ে এখনো বসে বসে কাঁদেন মা পারুল। পারুল আক্তার কেঁদে কেঁদে বলছেন, ‘সেইদিন রাহাত প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমানো টাকা থেকে ৫ টাকা নিয়ে যায়। আমাকে তাড়াতাড়ি ভাত রান্না করার কথা বলেছিল একসাথে খাওয়ার কথাও বলেছিল। কিন্তু তার আর ভাত খাওয়া হলো না।’

মিরসরাই ট্র্যাজেডির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকা তৎকালীন মিরসরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আলহাজ্ব মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘নিহতদের এই শোক ভুলার নয়। ৭ টি বছর হয়ে গেছে; শোক অনেকটা ম্লান হয়ে গেছে। আমি ট্র্যাজেডির দিন থেকে আজকের দিন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে রয়েছি ভবিষ্যতেও থাকবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি ট্রাফিক আইন সংশোধন করার দাবি জানাচ্ছি। আমাদের দেশে অনেক আইন আছে কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই, চালকদের সচেতনতার মাধ্যমেই দুর্ঘটনা কমে আসতে পারে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনার শিকার যারা তারা যেন অকালেই ঝরে না যায় তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে মিরসরাইয়ে একটি ট্রমা সেন্টার গড়ে তোলার দাবি জানাচ্ছি।’

আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মর্জিনা আক্তার বলেন, ‘স্মরণকালের মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা গোটা বিশ্বকে মর্মাহত করেছিল । জুলাই মাস এলে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। আইনের যথাযোগ্য প্রয়োগ না হওয়ায় চালকদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি।’

আস/এসআইসু

Facebook Comments