মুমূর্ষু এরশাদেও বিএনপিতে ক্ষোভের অঙ্ক!

379

আলোকিত সকাল ডেস্ক

দুঃসময়ে খুশি! রাজপ্রেক্ষাপটে। কখনো হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। কখনো খালেদা জিয়া। এরশাদের বন্দিজীবনে এক সময় খুশি হয়েছিলেন সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

আবার এই খালেদা জিয়াই যখন অসুস্থ অবস্থায় বন্দিজীবনে, তখন উল্লাস ধ্বনি ছেড়েছিলেন আজকের মুমূর্ষু এরশাদও।

কিন্তু রাজচরিত্রের এমন ক্ষোভ এখনো চরমভাবে বহমান। সবারই জানা, মৃত্যুক্ষণে সাবেক রাষ্ট্রপতি, সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার এই অসুস্থতায় সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতারা। শয্যাপাশে গিয়ে খোঁজখবরও নিয়ে এসেছেন।

আর যারা যেতে পারছেন না তারা সভা-সেমিনারে এরশাদকে স্মরণ করে সুস্থতা কামনা করছেন। কিন্তু এরশাদের অসুস্থতায় নীরব খালেদা জিয়ার দল বিএনপি! এই দলের শীর্ষ নেতারা মুমূর্ষু এরশাদের সুস্থতা কামনা করতে এখনো দেখা যায়নি।

গতকালও সারাদেশে এরশাদের রোগমুক্তি এবং সুস্থতা কামনা করে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, ‘এরশাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।’ তিনি এখনো শঙ্কামুক্ত নন। কারণ, তার যে কিছু সুস্থতা, তা কৃত্রিমভাবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুঃসময়ে সহমর্মিতা প্রকাশ না করে ক্ষোভের রাজনীতি এ দুদলের মধ্যে অনেক পুরনো। সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ যখন কারাগারে ছিলেন তখন আজকের বন্দি খালেদা জিয়াই বলেছিলেন, ‘এরশাদ জেলে গেছে এবং সেখানে আমৃত্যু থাকবে’ সেদিনের এমন কথা ভুলেননি এরশাদও! মনে রেখেছেন সব।

দুর্নীতি মামলায় যখন খালেদা জিয়া কারাগারে গেলেন তখন এরশাদের অনুসারীরা অতীতের আক্রোশের জবাব দিয়েই দিলেন। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ইয়াহইয়া চৌধুরী বলেন, কারাগারে থাকা অবস্থায় জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের লাগানো গাছের বরই খালেদা জিয়াকে খেতে দিতে কারা কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছেন জাতীয় পার্টি।

‘ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না’ মন্তব্য করে ইয়াহইয়া চৌধুরী বলেন, বেগম জিয়া একদিন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে বিনা অপরাধে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, সেই জেলখানায় এখন খালেদা জিয়া!

২৮ বছর আগে কারাগারে থাকা অবস্থায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একটি বরই গাছ লাগিয়েছিলেন। সেই গাছে এখন বরই ধরেছে। কারাবিধান অনুযায়ী, এই বরই খাওয়া যাবে কিনা, জানি না। সুযোগ থাকলে খালেদা জিয়াকে সেই বড়ই খেতে দেয়া হোক।

শুধু তাই না, এর আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জেলে প্রবেশের দৃশ্য এবং সেখান থেকে তিনি কিভাবে মুক্ত হবেন সেটা দেখার জন্য তিনি অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন।

খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বেশ কয়েক বছর আগে ময়মনসিংহের এক সভায় খালেদা বলেছিলেন, এরশাদ জেলে গেছে এবং সেখানে আমৃত্যু থাকবে।

তিনি বলেন, এখনো আমি জীবিত এবং দেখার অপেক্ষায় আছি মৃত্যুর পর কে জেল থেকে বের হয়। তিনি বলেন, তার ছোট ছেলে মারা গেছে, বড় ছেলে বিদেশে থাকে এবং দলের বেশিরভাগ নেতা জেলে অবস্থান করছে। খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তার দলের কফিনে শেষ পেরেক মারা হয়ে যাবে।

খালেদা জিয়া বন্দি হওয়ার পর এরশাদের রাজনৈতিক ভূমিকায় বিএনপি অতুষ্ট ছিলো। এখন এরশাদের জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণেও তার শারীরিক খোঁজখবর ও দোয়া কামনা থেকেও দূরে আছে দলটি।

এছাড়া জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার পর হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ তখন সেনা প্রধান হিসেবে ক্ষমতা দখল করেন। সে সময় খালেদা জিয়াসহ বিএনপির অনেকের অভিযোগ ছিলো জিয়াউর রহমান হত্যার পেছনে এরশাদের হাত থাকতে পারে। যদিও এটি নিয়ে বিএনপির আর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

এছাড়া খালেদা জিয়া বন্দি হওয়ার পেছনে রাজমাঠে যাদের ভূমিকা থাকতে পারে তাদের মধ্যে এরশাদও বিএনপির সন্দেহের তালিকায়। অতীতের রাগ ক্ষোভ থেকে এরশাদের মৃত্যুক্ষণেও দূরে রয়েছে বিএনপি।

তবে বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি এরশাদের খোঁজ না নিলেও ভেতরে ভেতরে সব খবর রাখছেন। এরশাদের দুর্ঘটনার সঙ্গে রাজনীতির অনেক হিসেব রয়েছে।

ক্ষমতাসীন দল হারাবে রাজনীতির মাঠ থেকে বড় একটি শক্তি। আর বিএনপি খুঁজবে খালেদা জিয়ার মুক্তির পথ।

বিএনপি সাময়িক নীরব থাকলেও এরশাদের এ পরিস্থিতির ভালো ছক রয়েছে। শক্তভাবে খালেদার মুক্তিতে রাজপথে নামবে না হয় আইনি প্রক্রিয়ায় লড়াই করবে।

বিএনপির সূত্রটির দাবি, এরশাদ পরিস্থিতির সাথে খালেদা জিয়ার ভাগ্যের ব্যাপারে অনেক কিছু নির্ভর করছে। হয়তো রাজপথে নামা ছাড়াই আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়ে যেতে পারেন।

এদিকে গতকাল বিকালে হঠাৎ জরুরি বৈঠকে বসে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি। বিকাল সোয়া ৪টায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ বৈঠক শুরু হয়।

বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তিতে আইনি প্রক্রিয়া ও বিভাগীয় কর্মসূচি, ছাত্রদল ইস্যুতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াও মুমূর্ষু এরশাদের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রাজনৈতিক হিসেবে বিএনপির কী ভূমিকা থাকবে তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়।

গতকাল খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ব্যানারে আয়োজিত এক প্রতীকী অনশনে অংশ নিয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে পরবর্তী কর্মসূচির ব্যাপারে ইঙ্গিত দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে শুধু আইনি লড়াইয়ের ওপর নির্ভর করলে চলবে না, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments