মেট্রোরেল-জলাবদ্ধতা যানজটে দুর্বিষহ নগরজীবন

272

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজধানীতে মেট্রোরেলের নির্মাণকাজে সড়ক সংকুচিত, বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা ও গণপরিবহন সংকটে চরম ভোগান্তিতে নগরবাসী।

এর সঙ্গে ভিআইপিদের চলাচলে সাধারণ পথচারীরা বৃষ্টিতে ভিজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকছেন। এ নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার জনমনে বাড়তি ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

সরেজমিন দেখা গেছে, ভিআইপিদের চলাচলে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা কাওরানবাজার, বাংলামোটর, শাহবাগ ও ফার্মগেটসহ বেশকিছু সড়কে শতশত পথচারী বৃষ্টিতে ভিজে দাঁড়িয়ে থাকেন। যারা বাসের ভেতর বসে ছিলেন তারাও পড়েন বিপাকে।

গতকাল এক দিনের বর্ষণে যানজট ও জলাবদ্ধতায় বেহাল রাজধানী। নগরীর অলিগলির পথ কাদাপানিতে একাকার হয়ে যায়।

রিকশা-গাড়ি উল্টে দুর্ভোগে পড়তে হয় নগরবাসীকে। দীর্ঘ দিন থেকেই রাজধানীতে বিভিন্ন সেবা সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকায় রাস্তা খোঁড়া হচ্ছে।

পাশাপাশি মেট্রোরেলের নির্মাণে মিরপুর ১২ নম্বর বাসস্ট্যান্ড থেকে মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বর হয়ে ফার্মগেট, গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ীমুখী যানবাহনে চলাচলরত যাত্রীরা পড়েন চরম ভোগান্তিতে।

মেট্রোরেলের জন্য এ সড়কের অধিকাংশ স্থানজুড়ে খননকাজ চলছে। বৃষ্টি হওয়ায় খানাখন্দ যেন বেড়ে যায়।

সড়কে কোথায় গর্ত রয়েছে তাও দেখার কোনো উপায় নেই। এতে যানজটের ভোগান্তির পাশাপাশি ঘটছে দুর্ঘটনা।

আর পূরবী ১০ নম্বর-শেওড়াপাড়া-আগারগাঁও- এ পথটুকু পাড়ি দিতে আগে সময় লাগতো আধা ঘণ্টা থেকে পৌনে এক ঘণ্টা, এখন সময় লাগছে দুই থেকে তিন ঘণ্টা।

তবে গতকাল বৃষ্টি পড়ায় এই ভোগান্তি আরও চরম আকারে ধারণ করে। একই অবস্থা মিরপুর ১২ নম্বরের।

মিরপুর ১২ নম্বর থেকে মতিঝিলে অফিসে যাওয়ার উদ্দেশে রওনা দেন আব্দুল জব্বার।

তিনি আমার সংবাদকে বলেন, সকাল ৬টায় বাসা থেকে রওনা দেন। কিন্তু মিরপুর ১০ নম্বরে গিয়েই বাস যেন আর চলে না।

একই জায়গায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট করে সিগন্যাল পড়ে। এতে অফিসে পৌঁছতে আধা ঘণ্টা, কোনো কোনোদিন এক ঘণ্টাও দেরি হয়। এটা এখন নিত্যদিনের চিত্র। কারণ একটাই এ সড়কজুড়ে চলছে মেট্রোরেলের কাজ।

জানা যায়, তীব্র হওয়া যানজট সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ। জনদুর্ভোগ কমানোর বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা।

ছোট ছোট অংশে কাজ বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগও (আইএমইডি)। কিন্তু কোনো কিছুই যানজট কমাতে পারছে না।

মিরপুর থেকে মতিঝিল মূল সড়কের মাঝ বরাবর চলছে মেট্রোরেলের বিশাল কর্মযজ্ঞ। বেশ কয়েকটি স্থানে চলছে পাইলিংয়ের কাজ।

কাজের নিরাপত্তায় দুই পাশে প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে গাড়ি চলাচলের রাস্তা হয়ে গেছে সরু। সরু সড়কে নিত্যদিন দেখা যায় তীব্র যানজট।

বিশেষ করে মেট্রোরেলের অবকাঠামো গড়তে বড় বড় ক্রেন, পাইলিং যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি রাখা হয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহূত সিমেন্ট, ইট, বালু ও সুড়কি স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে রিকশার চাপও।

ফলে ইচ্ছা করলে সহজেই এ সড়কের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় নেই।

ফার্মগেটে অফিস শেষ করে উত্তরায় রওনা দিতে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে বিকেল ৫টার দিকে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকেন ফরিদ প্রধান।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ বলেন, মাঝে মধ্যে গণপরিবহন সংকটের পাশাপাশি পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলেছে মেট্রোরেলের নির্মাণযজ্ঞ।

মেট্রোলাইনের দ্বিতীয় অংশের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এ অংশের প্রায় পুরোটাই পড়েছে ফার্মগেট-মতিঝিল ভিআইপি সড়কে।

সোনারগাঁও হোটেলের সামনের সড়কে শুরু হওয়া মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের কারণে বাংলামোটর থেকে কাওরানবাজারের পুরো অংশটি যানবাহনে পূর্ণ থাকছে।

ফলে খামারবাড়ি মোড় পেরিয়ে আসা ও মহাখালী থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে দিয়ে আসা যানবাহনগুলো এসে দীর্ঘ জটে পড়ছে কাওরানবাজার সিগন্যালে।

ফার্মগেট থেকে কাওরানবাজার সিগন্যাল পার গতে আগে ৫-১০ মিনিট লাগত। এখন লাগছে আধা ঘণ্টারও বেশি।

মিরপুর লিংক পরিবহনের চালক সাইফুল ইসলাম বলেন, মেট্রোরেলের কাজের কারণে এ সড়কে বড় বড় খানাখন্দ দেখা দিয়েছে। গাড়ি চালাতেও বেগ পেতে হচ্ছে।

১০ মিনিটের সড়ক সময় লাগছে এক ঘণ্টার বেশি। একই গাড়ির যাত্রী মোতাহার বলেন, জ্যামে বসে থাকতে হচ্ছে। অবস্থা এতটাই খারাপ যে, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

চুপচাপ সহ্য করে যেতে হচ্ছে। এ সড়কে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট আশরাফুল আমার সংবাদকে বলেন, সড়ক সরু হয়ে যাওয়ায় সাময়িক ভোগান্তি হচ্ছে যাত্রীদের। যানজট হচ্ছে তবে তীব্র নয়। আমরা তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি।

মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট আব্দুস সাত্তার বলেন, যানজট হচ্ছে। এ সড়ক দিয়ে যাদের চলাচল তাদের একটু সময় বেশি লাগছে। দীর্ঘ যানজট যাতে না হয় আমরা সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মেট্রোরেলের কাজ শেষ হলে এ সমস্যা আর থাকবে না।

মেট্রোরেল নির্মাণ এলাকার সড়কে যানজট নিরসনের বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, এসব সড়কে যানজট সহনীয় মাত্রায় রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় গণপরিবহন ব্যবস্থায় জোর দেয়া।

এ করিডোরে প্রাইভেট কার, সিএনজির মতো ছোট ছোট যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শুধু একতলা, দোতলা বাস চলবে।

এ বাসগুলো হতে হবে উন্নত মানের, যেন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সেটা ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবে বাংলাদেশের বিদ্যমান গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন বেশ কঠিন বলে মনে করেন তিনি।

আস/এসআইসু

Facebook Comments