মোটরবাইক সড়কে নতুন যন্ত্রণা

261

আলোকিত সকাল ডেস্ক

যানজটের ঢাকায় এক সময় অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্যের বাহন ছিল মোটরসাইকেল। যানজট এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে সবচেয়ে কার্যকর। কিন্তু এ মোটরবাইক এখন অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংখ্যায় বেড়েছে কয়েক গুণ। মোটরসাইকেলের গতিও এখন বেপরোয়া। যানজট হলেই হাঁটার ফুটপাত মোটরসাইকেলের দখলে চলে যাচ্ছে। কোনো নিয়ম-কানুন তারা মানতে নারাজ। কে কত দ্রুত আগে যেতে পারে এটাই যেন তাদের একমাত্র লক্ষ্য। ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছে। বাড়ছে প্রাণহানি।

যানজটে রাজধানীতে এক যুগে গাড়ির গতি কমতে কমতে ২১ থেকে ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটারে নেমেছে। যানজটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মোটরসাইকেল। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ঢাকায় নিবন্ধিত হয়েছে ৫০ হাজার ৫২১টি মোটরবাইক। প্রতিদিন গড়ে ৩৩৫টি মোটরসাইকেল নামছে ঢাকার রাস্তায়।

২০১০ সালে ঢাকায় নিবন্ধিত মোটরসাইকেল ছিল দুই লাখ ১০ হাজার। আট বছরে তা তিন গুণের বেশি বেড়ে সংখ্যা এখন ছয় লাখ ৬৭ হাজার ১৬২টি। অ্যাপের মাধ্যমে মোটরসাইকেল ভাড়ার সুবিধা চালু হওয়ার পর রাজধানীতে মোটরসাইকেল বাড়ছে হু হু করে। ২০১৩ সালে ঢাকায় ২৬ হাজার ৩৩১টি মোটরসাইকেল নিবন্ধন পায়। ২০১৭ সালে ৭৫ হাজার মোটরসাইকেল নামে ঢাকার রাস্তায়। গত বছর নিবন্ধিত হয় এক লাখ চার হাজার ৬০৪টি মোটরসাইকেল। চলতি বছরে নিবন্ধনের যে ধারা, তা অতীতের রেকর্ড ভেঙে যাবে। মোটরসাইকেল যত বাড়ছে বিশৃঙ্খলাও তত বাড়ছে। মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি তাই ইঙ্গিত করে। মামলা বাড়লেও শৃঙ্খলা ফিরছে না। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যানুযায়ী, ট্রাফিক আইন অমান্য করায় গত বৃহস্পতিবার এক হাজার ৩৩৬টি মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ৬৯টি মোটরসাইকেল আটক করা হয়। এক সপ্তাহের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দিনে হাজারের বেশি মামলা হয় মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে। গত বছরের মে মাসে ঢাকায় দৈনিক গড়ে ৭৯২টি মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামছুল হক সমকালকে বলেন, মোটরসাইকেল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাহন। চার চাকার গাড়ির তুলনায় মোটরসাইকেলের দুর্ঘটনার ঝুঁকি ৩০ গুণ। কিন্তু যানজটের কারণে এ বাহনটি বেছে নিচ্ছেন তরুণরা। ঢাকায় গাড়ি কখনও নিয়ম মেনে চলেনি, মোটরসাইকেলও তার ব্যতিক্রম নয়। ছোট যানবাহন হওয়ায় সহজে ট্রাফিক সিগন্যাল ভেঙে পার পেয়ে যেতে পারে। এ ‘সুবিধাটিই’ নিচ্ছেন মোটরসাইকেলের চালকরা।

গত বছরের জুলাইয়ে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বেপরোয়া বাসের চাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারাদেশে নজিরবিহীন আন্দোলন গড়ে ওঠে। আন্দোলনের পর মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীর হেলমেট ব্যবহার বাড়লেও শৃঙ্খলা বাড়েনি। যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসাবে গত মাসে ঈদযাত্রায় মোট দুর্ঘটনার ৩২ শতাংশের কারণ ছিল মোটরসাইকেল।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ সমকালকে বলেছেন, মোটরসাইকেল এখনই নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বাংলাদেশকে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামের মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। দেশগুলো মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। ঢাকায় যে হারে মোটরসাইকেল বাড়ছে, তাতে বাংলাদেশকেও এক সময় এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে ভালো বাস নামিয়েও ফল হবে না। কারণ, যারা মোটরসাইকেলে অভ্যস্ত, তারা বাসে উঠতে চাইবেন না। ঢাকার জন্য মোটরসাইকেল সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে।

পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, ট্রাফিক নিয়ম অমান্যে সবচেয়ে এগিয়ে মোটরবাইক চালকরা। সরেজমিন একই চিত্র দেখা যায়। সিগন্যাল মানে না মোটরসাইকেল, লেন মানে না; চলে ফুটপাতে। একাধিক চালক বললেন, যানজটের কারণে বাধ্য হয়েই ফুটপাতে ওঠেন তারা।

সরেজমিন দেখা যায়, হাতিরপুল থেকে বাংলামোটরগামী সড়কের বাম পাশে সারি সারি পিকআপ রাখা। এই এলাকার টাইলস ও স্যানিটারি সামগ্রীর দোকানের মালপত্র পরিবহনে এসব পিকআপ ব্যবহূত হয়। রাস্তার বাম পাশ বন্ধ হওয়ায় মোটরসাইকেল উঠে পড়েছে ফুটপাতে। সেখানেই কথা হলো এক মোটরসাইকেল চালকের সঙ্গে। তার যুক্তি, বাম লেন পুরো বন্ধ পার্কিংয়ের কারণে। যাবেন কী করে!

গত শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে দেখা যায়, ট্রেন চলাচলে রাস্তা বন্ধ করতে তেজগাঁও রেলক্রসিংয়ে ক্রস বার ফেলা হয়েছে। মগবাজার প্রান্তে হুইসেল দিচ্ছে ট্রেন। কিন্তু ক্রস বারের পাশে একটু অংশ খোলা। সেখান দিয়ে হুশ-হাশ করে চলছে মোটরসাইকেল। হাতিরঝিল মোড়ে এসে দেখা গেল, রামপুরা থেকে এফডিসি মোড়ে গাড়ি সিগন্যালে আটকে আছে। কিন্তু মোটরসাইকেল একমুখী সড়কের পাশের লেন দিয়ে এফডিসি মোড়ের দিকে বিনা বাধায় আসছে।

উল্টোপথে মোটরসাইকেলের এই বেপরোয়া চলাচলে একের পর এক প্রাণহানি ঘটছে ঢাকায়। সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, গাড়িতে চালক ও যাত্রী যেমন নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে; মোটরসাইকেলে তা নেই। মোটরসাইকেল সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ বাহন। শুধু বাহক ও পথচারীও মোটরসাইকেলের কারণে ঝুঁকিতে থাকেন। ঝুঁকি কমাতে চালক ও আরোহীকে হেলমেট পরতে হবে। কিন্তু আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে যে মানের হেলমেট ঢাকার চালক, যাত্রীরা পরেন, তার অধিকাংশ মানহীন। এতে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

গণপরিবহন সংশ্নিষ্টরা বলছেন, নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলেও যানজটের কারণে বাস ছেড়ে যাত্রীরা মোটরসাইকেলের আরোহী হচ্ছেন। অন্তত ৩০ হাজার চালক ভাড়ায় ঢাকার পথে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন।

দিনের ঢাকায় যেমন-তেমন, রাতের ঢাকায় দল বেঁধে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালান বিভিন্ন ‘বাইকার্স’ গ্রুপের সদস্যরা। ব্যস্ত রাস্তায় গতির কেরামতি দেখান এসব গ্রুপের সদস্য তরুণ, কিশোররা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের গ্রুপে সেসব ছবি আপলোড করেন। মোটরসাইকেলের দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, তরুণ-কিশোররাই উচ্চগতির মোটরসাইকেলের ক্রেতা।

রাজধানীতে মোটরসাইকেলের সংখ্যা আর বাড়তে দেওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ। সমকালকে তিনি বলেছেন, বিআরটিএ থেকে মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। মোটরসাইকেল সড়কে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। ট্রাফিক আইনে মাসে যত মামলা হয়, তার ৪০ শতাংশই হয় মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে। মোটরসাইকেল কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। প্রাইভেটকার কমাতেও রেজিস্ট্রেশন নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি বলে মত দিয়েছেন মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ।

আস/এসআইসু

Facebook Comments