মোহনপুরে আত্মহননকারী স্কুলছাত্রী বর্ষাকে ধর্ষণের প্রমাণ মিলেছে

329

সুমন আলী, মোহনপুর প্রতিনিধি, রাজশাহী।

রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার বাকশিমইল উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বর্ষা(১৪) গত ১৬ মে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।
মোহনপুরের বিলপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নানের মেয়ে বর্ষা।

জানা যায়, গত ১৬ মে দুপুরে ঘুমাতে গিয়ে বিকাল গেলেও ঘুম থেকে না ওঠাই পরিবার লোকজন ঘরের দরজা খুলে বর্ষার লাশ দেখতে পায়। খবর পেয়ে মোহনপুর থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মর্গে প্রেরণ করেন।

পরে স্কুল ছাত্রীর বাড়ীতে যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানওয়ার হোসেন ও পুলিশ সুপার শহিদুল্লাহ বিপিএম অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুব্রত দে।

সুমাইয়া আকতার বর্ষা রাস্তায় যাওয়া-আসার সময় পাশের বাড়ির আনিস উদ্দিনের ছেলে মুকুল (১৮) প্রায় তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। তার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় গত ২৩ এপ্রিল প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সময় প্রতিবেশী শরিফুল ইসলামের মেয়ে বান্ধবী (ক্লাসমেট) সোনিয়ার সহযোগিতায় স্কুল ছাত্রী বর্ষাকে মুখে রুমাল চেপে অপহরণ করে।

পরে ওইদিন খানপুর বাগবাজার এলাকার লোকজন অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন বর্ষার পরিবারকে খরব দেয়। পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে মোহনপুর উপজেলার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করে। অবস্থার অবনতি হলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে হন্তান্তর করে।

এঘটনায় স্কুল ছাত্রীর বাবা বাদি হয়ে মোহনপুর থানায় দুইজনের নাম উল্লেখ করে আরও ২/৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করে অপহরণ মামলা দায়ের করেন।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার সময় স্কুল ছাত্রী পুকুরে গোসল করতে গেলে আসামি পক্ষের লোজকন আবারও অকথ্যভাষায় করলে স্কুল ছাত্রী বর্ষা বাড়ি ফিরে বিষয়টি পরিবারকে জানায়। বিকেল ৫টার সময় খাতায় আত্মহত্যা নোট লিখে পাশের শয়নকক্ষে বাঁশের সাথে গলায় ওড়না পেচিয়ে আত্মহত্যা করে।

রাজশাহীর সহকারী পুলিশ সুপার সুমন দেব এ বিষয়ে তথ্য নিশ্চিত করে বলেন। রাজশাহীর মোহনপুরে স্কুলছাত্রী সুমাইয়া আক্তার বর্ষা আত্মহননের আগে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল- এমন প্রমাণ মিলেছে ফরেনসিক প্রতিবেদনে। এরই মধ্যে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।

জেলা পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, গত ২৭ জুন রাজশাহীর শিশু ও নারী নির্যাতন আদালত-২ এ বর্ষার ফরেনসিক প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বর্ষাকে ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন এই মামলাটিতে ধর্ষণের অপরাধের ধারাটিও যুক্ত হবে।

আত্মহত্যার আগে সুমাইয়া আক্তার বর্ষা এক চিঠিতে লিখে যান,
‘প্রিয় বাবা-মা তোমাদের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমি তোমাদের থেকে অনেক কিছু পেয়েছি, অনেক আদর, অনেক ভালোবাসা। কিন্তু একটা মেয়ের কাছে তার মানসম্মান সবচেয়ে বড়। আমি আমার লজ্জার কথা সবাইকে বলতে বলতে নিজের কাছে অনেক ছোট হয়ে গেছি। প্রতিদিন পরপুরুষের কাছে এসব বলতে বলতে আমি আর পারছি না। অপরাধীকে শাস্তি দিলেই তো আমার মানসম্মান ফেরত পাব না। তাই আমাকে ক্ষমা করো।’

বর্ষার লেখা সুইসাইড নোট
জেলা পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মোহনপুর উপজেলার বাকশিমইল স্কুলের ছাত্রী বর্ষাকে অপহরণের পর নিপীড়ন করে স্থানীয় বখাটে মুকুল। গত ২৩ এপ্রিল এই নির্যাতনের পর মামলা দায়ের করতে গেলে তার পরিবারকে হেনস্থা করেন মোহনপুর থানার ওসি আবুল হোসেন।

মোহনপুর থানার তৎকালীন ওসি আবুল হোসেন
চারদিন ধরে মামলা না নিয়ে নানাভাবে টালবাহানা করতে থাকেন তিনি। অবশেষে পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহর হস্তক্ষেপে ঘটনার চারদিন পর ২৭ এপ্রিল মামলা নেন ওসি।

বর্ষার পরিবারের পাশে দাড়ান তৎকালীন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক এস এম আব্দুল কাদের, এরপর থানায় আরেকটি মামলা দায়ের করেন তার বাবা। এই মামলাতে ও মুকুল ও তার মাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়। মামলায় মুকুলসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায় পুলিশ। মুকুল এখনো জেলহাজতে রয়েছে।

বর্ষা আত্মহনন মামলা তদন্তের স্বার্থে ওসি আবুল হোসেনকে গত ২০মে পুলিশ লাইনে ক্লোজড করা হয়।

বর্ষার পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণে হাইকোর্টেররুল।

আস/এসআইসু

Facebook Comments