যেসব মোহ সর্বগ্রাসী!

144

আলোকিত সকাল ডেস্ক

গভীর আবেগ নাকি মোহ? যখন কেউ অনলাইনে থাকে তখন মানব আচরণের এই দুটি প্রকাশের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য আলাদা করাটা বেশ কঠিন হয়ে পরে। কিন্তু নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন তো, আপনি কি কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনার পুরোনো সঙ্গীর খোঁজ করতে গিয়ে আবিষ্কার করেছেন যে, তিন ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পরও আপনি তার নতুন সঙ্গীর সঙ্গে তোলা বিভিন্ন ছবি তখনো দেখছেন? পকেটে কম্পিউটার আর ইন্সটাগ্রাম ও টুইটার ফিডে প্রবেশাধিকার হাতের নাগালে থাকলে এ ধরনের অযৌক্তিক কাজ করার অন্ধ তাড়না থেকে বের হওয়াটা বেশ কঠিনই বটে। এই মোহমুক্ত হওয়া বেশ কঠিন।

সামাজিক মনোবিজ্ঞানী এবং বিবিসির উপস্থাপক অ্যালেক্স ক্রতোস্কি বোঝার চেষ্টা করেছেন যে, কীভাবে মোহগ্রস্ত আচরণ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তিনি এমন কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন যাদের অন্যের বিষয়ে জানতে চাওয়ার প্রবণতা অনিয়ন্ত্রিত, বাধাহীন এবং সর্বগ্রাসী হয়ে গেছে। সঙ্গে এমন আচরণ থেকে বের হওয়ার উপায়ও বলেছেন তিনি।

কিশোর বয়সে প্রেমে পড়েছিলেন জ্যাক স্টকিল। কিন্তু শিগগিরই তিনি তার বান্ধবীর অতীত জীবন নিয়ে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। যদিও এর আগে আর কারো বিষয়ে এমনটা হয়নি তার। তিনি কখনোই একজন ঈর্ষান্বিত ব্যক্তি ছিলেন না। কিংবা তার বান্ধবী তার তাকে ধোঁকা দিতে পারে এমন আশঙ্কাও ছিল না তার। কিন্তু তার বান্ধবীর সাবেক এক সঙ্গীকে নিয়ে একটি মন্তব্য হঠাৎই তার মস্তিষ্কে একটি সুইচ খুলে দেয়।

জ্যাক বলেন, এই একটি জিনিসই আমার মধ্যে পরিবর্তন নিয়ে এনে দেয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমি তার অতীতের খুব ছোট ছোট বিষয় নিয়েও খুব আগ্রহ বোধ করতাম। আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে তার প্রেম জীবন কেমন ছিল সেসব নিয়ে খুব আগ্রহী ছিলাম আমি। আমি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টও দেখতাম। জ্যাক বলেন, আমি ভাবতাম এই ব্যক্তিটি কেমন? কিংবা ওই ছবিতে কে? এবং এই কমেন্ট দিয়ে কী বোঝায়। জ্যাক তার সঙ্গীর অতীত নিয়ে তার কৌতুহলের এমন একটি চক্রে নিজেকে আবিষ্কার করলেন যা অগ্রাহ্য করা তার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।

সাইবার স্টকিং শব্দটি ২০১০ সালে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে সংযুক্ত করা হয়। এটি হচ্ছে স্টকিং বা কোনো ব্যক্তির ওপর অনাকাক্সিক্ষত নজরদারির ডিজিটাল রূপ। যা শুধু অনলাইন জগতেই ঘটে থাকে এবং এটি পুরোপুরি প্রযুক্তিগতভাবেই হয়।

স্টিনা স্যান্ডার্স একজন সাংবাদিক যিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সম্পর্কে লেখালেখি করেন। ছয় বছর আগে যখন তার সঙ্গী তাকে কোনো কারণ ছাড়াই ছেড়ে চলে যায়, তখন এর কারণ জানতে তিনি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো মোহগ্রস্তের মতো পর্যবেক্ষণ শুরু করেন।

‘সে কেন আমাকে ছেড়ে গিয়েছিল এ নিয়ে কখনোই ভাবনা বন্ধ করতে পারতাম না আমি। আর এর জন্য অনলাইনে প্রকাশিত তার নতুন সঙ্গীর সঙ্গে বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি দেখাই আমার একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়ায়। এটা একটা মোহ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর কয়েক বছর কেটে গেলেও এখনো সে তার ইন্সটাগ্রাম, ফেসবুক এবং টুইটার পেজ দেখে।

ইউনিভার্সিটি অব টরেন্টোর ভেরোনিকা লুকাক্সের পরিচালিত এক গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি ১০ জন সাবেক সঙ্গীর মধ্যে ৯ জনই তাদের পুরোনো সঙ্গীর ফেসবুক প্রোফাইল দেখে থাকে। কানাডার এই গবেষণাটি আরো প্রকাশ করে যে, ৭০ ভাগ মানুষ তাদের সাবেক সঙ্গীর প্রোফাইল তাদের মিউচুয়াল বন্ধুর অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেখে। এমনকি তারা যদি বন্ধু নাও থাকে কিংবা ব্লক করে দেওয়া হলেও সাবেক সঙ্গীর অ্যাকাউন্ট দেখার কোনো না কোনো উপায় খুঁজে বের করে তারা। ইউনিভার্সিটি অব বেডফোর্ডশায়ারের জাতীয় সাইবার স্টকিং গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক এবং মনোবিজ্ঞানী এমা শর্ট বিশ্লেষণ করেছেন যে, কীভাবে অনলাইন স্পেস আমাদের সবকিছুর সঙ্গে জড়িত না হয়েও সবকিছু পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে দেয়। তবে এমন সুযোগ আমাদের ‘সীমানা’ সম্পর্কে সচেতন থাকার চেতনাকে দুর্বল করে দেয়। অপ্রয়োজনে মোহগ্রস্ত করে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments