রাজধানীজুড়ে ডেঙ্গু আতঙ্ক, সমাধানের পথ কি?

229

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজধানীজুড়ে ডেঙ্গু আতঙ্ক বড়ছে। প্রতিদিন গড়ে ১৩৭ রোগী হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকে ভর্তি হচ্ছেন। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এডিস মশার দাপট প্রতি বছর কমবেশি থাকে। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে এ রোগ প্রতিরোধের জন্য সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ বা সচেতনতা সৃষ্টিতে সিটি করপোরেশন ব্যর্থ। এডিস মশা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানীতে চার লাখ বাড়ি ডেঙ্গু ঝুঁকিতে রয়েছে। সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এ রোগের বিস্তার রোধ করা অসম্ভব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসেবেই চলতি মাসে শুক্রবার বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬৪২। এ নিয়ে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালেই ভর্তি হয়েছে ৩ হাজার ৭২০। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী শুক্রবার বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী সংখ্যা ১ হাজার ৬৪২। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১৩৭ করে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি। ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে শুক্রবার পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৮০৯। গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা তিনজন।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী চলতি ১ জুলাই আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১২১, ২ জুলাই ১২৩, ৩ জুলাই ১২২, ৪ জুলাই ১৪৫, ৫ জুলাই ১০৩, ৬ জুলাই ১৭৮, ৭ জুলাই ১৩২, ৮ জুলাই ১৭০, ৯ জুলাই ১৫৫, ১০ জুলাই ১৮১, ১১ জুলাই ১৩৯ এবং ১২ জুলাই বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত ৭৩ জন। গত জুন মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭৫৩। মে মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১৯৩ জন। এপ্রিলে ছিল ৫৮ জন, মার্চে ১৭, ফেব্রুয়ারিতে ১৮ এবং জানুয়ারিতে ছিল ৩৮। এর মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৫ এপ্রিল বিআরবি হসপিটালে একজন, ২৯ এপ্রিল আজগর আলী হাসপাতালে একজন এবং ২৮ জুন স্কয়ার হাসপাতালে একজন চিকিৎসকসহ তিনজন ডেঙ্গু রোগী মারা যান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের তথ্য-উপাত্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংগ্রহ করে থাকে। বর্তমানে দেশের সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৪৭টি হাসপাতাল থেকে এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তবে এর বাইরেও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বারে যেসব ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়ে থাকেন; তার কোনো তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে থাকে না। ফলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও বেশি হয়ে থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত ব্যক্ত করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ গতবারের চেয়ে বেশি মনে হচ্ছে। আর সেইসঙ্গে জটিলতাও বেশি হতে দেখা যাচ্ছে। তবে এবার ডেঙ্গুর ধরন পাল্টে যাচ্ছে। ডেঙ্গু চার ধরনের ভাইরাস থেকে হয়। ডেঙ্গুর জন্য আলাদা চার রকম ভাইরাস আসে। আমরা মেডিকেল টার্মে বলি ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪। একবার ডেঙ্গু হলে ডেঙ্গুর একটি ভাইরাসে ইউমোনিটি হয়। বাকি তিনটি থেকে যায়। এ তিনটিতে আবার আক্রান্ত হতে পারে। ফলে একবার কারও এক ধরনের ডেঙ্গু হলে পরে আর সে ধরনের না হলেও অন্য আরেক ধরনের ডেঙ্গু হতে পারে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, এপ্রিল থেকে অক্টোবরে ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস মশার উপদ্রব বাড়ে। থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশার প্রজনন বাড়ে। ফলে রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু রোগ। ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে এডিস মশার বংশবিস্তার ঠেকাতে ব্যবস্থা নিতে হবে। বাড়ি বা বাড়ির আঙিনার কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সে ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল প্র্যাকটিশনার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজের সাবেক প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, প্রাইভেট চেম্বারগুলোয় শিশু ডেঙ্গু রোগী অনেক পাওয়া যাচ্ছে। শিশুদের ডেঙ্গুজ্বর থেকে রক্ষায় মশারির ভেতরে রাখতে হবে; হাত-পা ঢেকে থাকে এমন টিলেঢালা জামা কাপড় পড়তে হবে এবং বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, শিশুদের জ্বর এলে অবহেলা করা যাবে না। চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, এখন যেহেতু ডেঙ্গুর মৌসুম, তাই ডেঙ্গুতে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। তবে ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কের কিছুই নেই। ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়ে আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালে ডেঙ্গু চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে। তিনি রোগীদের উদ্দেশে বলেন, জ্বর হলে অনেক সময় সাধারণ জ্বর মনে করি। ডেঙ্গুজ্বরও রোগীর কাছে সাধারণ জ্বর মনে হবে। যে কোনো জ্বর তারা যেন সাধারণ জ্বর মনে না করে, অবহেলা না করে। তারা চিকিৎসকের পরামর্শ নেন এবং পরীক্ষা করেন। যদি ডেঙ্গু পজেটিভ হয় তাহলে ডেঙ্গুর চিকিৎসা করতে হবে।

অধ্যাপক আবুল কালাম বলেন, আমরা সিটি করপোরেশনকে অনুরোধ করছি তারা যেন মশা নিধন ব্যবস্থা আরও জোরদার করেন। নগরবাসীর প্রতি আমাদের অনুরোধ মশা যেন বংশবৃদ্ধি করতে না পারে সেজন্য বাড়ি ও বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখবেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments