রাজধানীর রিকশার ওপর খড়গ প্রাইভেটকার ঠেকাবে কে

357

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজধানীতে সড়কের মোড়ে মোড়ে সিগন্যাল বাতি, ট্রাফিক পুলিশ ও ফ্লাইওভার নির্মাণ করেও যানজট কমানো সম্ভব না হওয়ায় এবার বেশকিছু এলাকায় রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করে যানজট নিরসনের পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন।

এ ব্যাপারে নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ৩ বছর আগে ঢাকায় গাড়ির গতি ঘণ্টায় ৭ কিলোমিটার ছিল। বর্তমানে ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটারে এসে পৌঁছেছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০২৭ সালে গাড়ির গতি ঘণ্টায় ১ কিলোমিটার হবে।

ঢাকায় যানজট কমাতে চাইলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করে নয়, নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। একই সঙ্গে প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এছাড়া যানজট কমানো কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তারা।

জানা যায়, ঢাকায় প্রাইভেটকার ২ লাখ ৪৯ হাজার আর লাইসেন্স করা রিকশা ৮৭ হাজার। ঢাকায় রাস্তার ৮০ ভাগ প্রাইভেটকারের দখলে। যাত্রী বহন করে মাত্র ৮ ভাগ। রিকশা যাত্রী বহন করে ৩২ ভাগ। ঢাকায় রিকশা প্রাইভেটকারের চেয়ে কার্যকর। কারণ গতির দিক দিয়ে ঢাকায় গড় গতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার।

ফলে প্রাইভেটকারের চেয়ে রিকশা কার্যকর। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান আমার সংবাদকে বলেন, বাস্তবতায় সড়ক গতিশীল ও যানজটমুক্ত করতে গণপরিবহন সহজলভ্য করে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

গণপরিবহনের সংখ্যা দিন দিন কমছে। যাও আছে সেগুলোর সেবার মান প্রশ্নবিদ্ধ। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুলও। এ কারণে সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। সংকট সমাধানে গণপরিবহন বাড়ানোর বিকল্প নেই।

কুড়িগ্রাম থেকে রাজধানীর আজিপুরে রিকশা চলাতে এসেছেন আব্দুল জলিল। রিকশা চালিয়ে তিন ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচসহ সংসার চালান। বয়স আনুমানিক ৪৫ বছর। ঢাকা শহরে প্রায় ১২ বছর ধরে রিকশা চালাচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা গতকাল জেনেছি, ৭ জুলাই থেকে বিভিন্ন সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেয়া হবে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়া মানে অসহায়-দরিদ্র রিকশাচালকদের পেটে লাথি মারা ছাড়া আর কিছুই নয়।’

শাহবাগে রিকশা নিয়ে বসে আছেন ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরে অধিকাংশ রিকশাচালকরা গ্যারেজ থেকে ১০০-১২০ টাকা জমা খরচ দিয়ে রিকশা নেয়। সারাদিন চালিয়ে দিন শেষে ৪০০-৫০০ টাকা তারা আয় করে।

এই আয় দিয়েই সংসার চলে তাদের। কিন্তু সড়কে যদি রিকশা চলাচল বন্ধ হয়ে যায় তাহলে এসব রিকশাচালকরা কী করবে? কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আমাদের বিষয়ে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।’

গত বুধবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) নগর ভবনে ডিটিসিএর (ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কন্ট্রোল অথরিটি) এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে আগামী রোববার থেকে রিকশা চলাচল বন্ধ হচ্ছে।

প্রাথমিকভাবে গাবতলী থেকে আসাদগেট হয়ে আজিমপুর পর্যন্ত এবং সায়েন্স ল্যাব থেকে শাহবাগ পর্যন্ত রিকশা চলাচল বন্ধ করা হবে। এছাড়া কুড়িল বিশ্বরোড থেকে রামপুরা হয়ে খিলগাঁও-সায়েদাবাদ পর্যন্ত রিকশা চলাচল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বৈঠক শেষে ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ঢাকা শহরের সড়কে যানবাহনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ডিটিসিএর বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এই সড়কগুলোতে রিকশা চলাচল বন্ধ হওয়ার পর নাগরিকদের যেন চলাচলে সমস্যা না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পরিবহন মালিক সমিতি এবং বিআরটিসির পর্যাপ্ত বাসসেবার ব্যবস্থা করা হবে। আগামী ৭ জুলাই পরীক্ষামূলক ওই সড়কগুলোতে বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে পরবর্তীতে ১৪ জুলাই আবারো বৈঠকে বসবে সমন্বয় কমিটি।

সমপ্রতি ঢাকা মহানগরীর রিকশাচালকদের জীবন-সংগ্রাম, দেশের পণ্য ও নাগরিক পরিবহনে তাদের প্রয়োজনীয়তা, অবদান এবং সংগঠিতকরণ বিষয়ে পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)।

সেখানে বলা হয়, ঢাকা শহরের অন্তত ৬০ শতাংশ মানুষ রিকশায় চড়ে। রাজধানীতে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (ডিসিসি) একমাত্র রিকশা লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ, যা ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ৮৭ হাজার রিকশা লাইসেন্স ইস্যু করেছে। তবে বর্তমানে ঢাকা শহরের রিকশার প্রকৃত সংখ্যা ১০ লাখেরও অধিক।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রিকশাচালকদের মাসিক গড় আয় ১৩ হাজার ৩৮২ টাকা, যার ৬৮ শতাংশ আসে রিকশা চালনা থেকে। প্রায় ৯০ ভাগের একমাত্র পেশা রিকশা চালনা, যা এই পেশার ওপর তাদের একমাত্র নির্ভরতার ইঙ্গিত দেয়। রিকশাচালকরা অত্যন্ত দরিদ্র।

প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কোনো জমি নেই। ঢাকায় রিকশা চালনা শুরু করার আগে বেশিরভাগই (৫৭.১ ভাগ) ছিল দিনমজুর, ১৩.৮ ভাগ যুক্ত ছিল ক্ষুদ্র ব্যবসায়, ১২.১ ভাগ কৃষিকাজে। রিকশাচালক হিসেবে কাজে আসার পেছনে প্রধান কারণ ছিল অন্য কোনো কর্মসংস্থানের অভাব এবং এই পেশায় আসতে উৎসাহের কারণ ছিল এতে কোনো পুঁজি ও দক্ষতার প্রয়োজন নেই।

রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছেন আলী আকবর। তিনি আমার সংবাদকে বলেন, আমি ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারে যাবো। কিন্তু রিকশা পাচ্ছি না। আর এই রুটে লোকাল বাসে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ থাকে।

এসব বাসে ওঠা মানেই ভোগান্তি। তাই এমন স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য রিকশা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যের। একই কথা বলছেন বেসরকারি চাকরিজীবী আশরাফ। তিনি বাংলামোটর থেকে সাতরাস্তায় যাওয়ার পথে এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি যে রুটে যাচ্ছি সেখানে কোনো পরিবহন যায় না। এক্ষেত্রে যদি রিকশা বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে পথচারীদের ভোগান্তির শেষ থাকবে না।

সড়কে রিকশা বন্ধের সিদ্ধান্তের বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, যানজট নিরসনে প্রধান সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই।

কিন্তু স্বল্প দূরত্বে রিকশায় চলাচল করে যাত্রীদের বড় একটি অংশ, তাই পর্যাপ্ত গণপরিবহনের ব্যবস্থা করতে পারলেই এই উদ্যোগ সার্থক হবে। তা না হলে ব্যাপক বিড়ম্বনায় পড়বেন স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতকারী যাত্রীরা।

আস/এসআইসু

Facebook Comments