রাজশাহীতে আবাসন খাতে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য!

262

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের ফলে রাজশাহী নগরীতে তৈরি হচ্ছে উঁচু ভবন। সাম্প্রতিক সময়ে বড়ো ডেভেলপার কোম্পানি রাজশাহীতে আবাসন ব্যবসায় বড়ো বিনিয়োগ করছে। এছাড়া যৌথভাবে জমি কিনে বসবাসের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করছেন অনেকেই। এসব উদ্যোক্তা ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ- নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। চাঁদাও দিতে হচ্ছে। প্রভাবশালী হওয়ায় এসব চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। অভিযোগ করলে হেনস্তা ছাড়াও নির্মাণ উপকরণ চুরি, লুট ও ভাঙচুরের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কবলে পড়তে হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহানগরীর তেরখাদিয়া নতুন সড়কের পাশে একটি প্লট কিনে ১০ তলা ভবন করছেন রাজশাহী কলেজসহ আরো কয়েকটি কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও তাদের পরিচিতজনরা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভবনটি নির্মাণের শুরু থেকেই এ ভবনে নির্মাণসামগ্রী দুই ব্যক্তি সরবরাহ করছিল। নিম্নমানের সামগ্রীর কারণে নির্মাতারা তাদের কাছ থেকে উপকরণ নেয়া বন্ধ করে দেন। এরপর তারা কয়েকদফা ভবনে গিয়ে নির্মাণ কাজ বন্ধের জন্য হুমকিও দিয়ে আসে। এরপর ১২ জুন একদল যুবক ঘটনাস্থলে গিয়ে মালিকদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তারা ভবন নির্মাণ তদারককারী রাজশাহী কলেজের সহকারী অধ্যাপক এহসানুল হককে শারীরিকভাবে হেনস্তা ছাড়াও নির্মাণ উপকরণ ভাঙচুর করে। গত ১৩ জুন অধ্যাপক এহসানুল হক বাদী হয়ে সাতজনের বিরুদ্ধে রাজপাড়া থানায় চাঁদাবাজির মামলা করেন। এ মামলায় সমপ্রতি একজনকে গ্রেফতার করে আদালতে চালান করেছে পুলিশ।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগরীর রাজপাড়া থানার এসআই মুস্তাক আহমেদ জানান, যে আসামিকে আটক করা হয়েছে সে এখনো কারাগারে আছে। বাকি আসামিরা হাইকোর্ট থেকে জামিনে আছে।

তেরখাদিয়ার একজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ, তিনি বছর দুয়েক আগে জমি কিনে তিনতলা বাড়ি নির্মাণ শুরু করলে একদল চাঁদাবাজ এলাকারই একজন নেতার অনুসারী পরিচয় দিয়ে ইট, রড ও সিমেন্ট সরবরাহের বায়না ধরে। প্রথমে তাদের কাছ থেকে কিছু নির্মাণসামগ্রী নেয়ার পর দেখা যায় সেসব খুবই নিম্নমানের। পরে তাদের না করে দেয়া হলে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে তারা। একপর্যায়ে স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করে নির্মাণ কাজ করতে হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহানগরীর পদ্মা আবাসিক, শালবাগান, তেরখাদিয়া, নওদাপাড়া, বিনোদপুর, কুমারপাড়া, লক্ষ্মীপুর, কাশিয়াডাঙ্গাসহ মহানগরীর প্রান্তিক এলাকাগুলোতে তৈরি হচ্ছে নতুন আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন। ঢাকার একটি ডেভেলপার কোম্পানির একজন ম্যানেজার বলেন, রাজশাহীতে তাদের ছয়টি ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। যখনই নতুন ভবনের সাইনবোর্ড ঝোলানো হয় সেখানে থাকা ফোন নম্বর নিয়ে প্রথমে ফোন করে এলাকার চাঁদাবাজদের দলনেতারা। ফোন করেই তারা বলে, আমাদের এলাকায় ভবন করছেন করেন কিন্তু ইট, সিমেন্ট, রড কিন্তু আমাদের কাছ থেকেই নিতে হবে। না নিলে ঝামেলা হবে। কোনো ডেভেলপার রাজি না হলে নির্মাণসামগ্রী চুরি হয়ে যাচ্ছে। রাতের আঁধারে ভেঙে ফেলা হচ্ছে সাইনবোর্ড। শ্রমিকদের মারধরের ঘটনাও ঘটছে প্রায়ই। প্রায় প্রত্যেক ডেভেলপার ও ভবন নির্মাতাকেই চাঁদাবাজদের ম্যানেজ করে নির্মাণ কাজ শেষ করতে হচ্ছে বলে জানান তারা।

এ বিষয়ে রাজশাহী ডেভেলপার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শফিকুর রহমান লাভলু বলেন, নগরীতে ভবন নির্মাণ শুরু করলেই শুরু হয় হরেক রকমের চাঁদাবাজি এবং প্রতিবন্ধকতা। এসব মোকাবেলা করেই তারা কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব বিষয়ে রাজশাহীর মেয়র ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। পুলিশ তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে চাঁদাবাজির সমস্যাটা কমেনি। ফলে রাজশাহীতে সম্ভাবনাময় এ খাতটি থেকে অনেকেই সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

বহুতল ভবন নির্মাণে চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি) কমিশনার হুমায়ুন কবির বলেন, কোনো ডেভেলপার বা ভবন নির্মাতা চাঁদাবাজির হুমকি পেলে সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ দিতে পারেন। চাঁদাবাজদের বিষয়ে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেবে পুলিশ।

আস/এসআইসু

Facebook Comments