রেকর্ড ব্যয়ে এবার দুই মেট্রোরেল

245

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজধানীর যানজট কমাতে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণকাজ চলছে। তা শেষ হবার আগেই এবার আরও দুটি মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

এরই অংশবিশেষে মেট্রোরেল লাইন-১ নামে বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচল উরাল পথে এবং বাড্ডা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মাটির নিচে মেট্রোরেল নির্মাণ করবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।

এই পথে ৩১ দশমিক ২৪ কি.মি. মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে মেট্রোরেল লাইন-৫ নামে হেমায়েতপুর-গাবতলি উড়াল পথ এবং গাবতলি-ভাটারা পাতাল রেল নির্মাণ করা হবে।

এই নর্দান রুটে মোট ২০ কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। এতে জাপান সরকারের উন্নয়ন সংস্থা-জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) ঋণ ধরা হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা।

বাকি অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় করা হবে। প্রকল্প দুটি তৈরি করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে তা যাচাই-বাছাই করতে গত রোববার প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি- পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়।

প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ থেকে বিভিন্ন অঙ্গের ব্যয়ের প্রাক্কলনে অসঙ্গতি থাকায় সভায় আপত্তি করে সংশোধন করতে বলা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ সদস্য শামীমা নার্গিস, সভায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক আমার সংবাদকে বলেন, আপাত দৃষ্টিতে মেট্রোরেলের দুই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় অনেক বেশি মনে হচ্ছে।

তবে প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডারে যাওয়ার ব্যাপারটাই মুখ্য বিষয়। অনেকে অংশ নিলেও সর্বনিম্ন দরদাতারা কাজ পাবে কি না সেটাই দেখার বিষয়। জাপানের অর্থায়নে এ দুই প্রকল্প হবে। কাজেই তাদের লোকই কাজ পাবে।

জাইকার শর্তের জালেই বিভিন্ন অঙ্গের ব্যয় তাদের কাছে চলে যাবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তুলনা করে এই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, উড়াল পথে এ ধরনের প্রকল্পে ব্যয় বেশি। তবে পাতাল পথে মেট্রোরেল ব্যয়বহুল।

স্বাভাবিকের চেয়ে তা দুই থেকে আড়াই গুণ বেশি হবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, লাইট, পানিসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি সার্ভিস রয়েছে। বেশি গাড়ি কেনার ব্যাপারে তিনি বলেন, এমনিতেই রাজধানীতে যানজট ভয়াবহ, তাই এ ব্যাপারে সরকারকে কঠোর হতে হবে। কারণ বোিশরভাগ গাড়ি প্রকল্প পরিচালকদের পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেন।

গণপরিবহন ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শামসুল হক আরও বলেন, মেট্রোরেলকে মেরুদণ্ড হিসেবে ভাবতে হবে। এর সুফল পেতে হলে প্রকল্প হিসেবে না নিয়ে গণপরিবহনের এই প্রকল্পে টাউন প্লানিং দর্শনের সমন্বয় করতে হবে। প্রকল্প সর্বস্ব উন্নয়ন এড়াতে হবে। পেশাদার ও দক্ষ লোক যুক্ত করতে হবে। জনগণের কথা বলে প্রকল্প নেয়া হয়। তাই দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

পরিকল্পনা কমিশন এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সাথে সঙ্গতি রেখে সরকার ২০১৬ সালের ২৯ আগস্ট সংশোধিত স্ট্রাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্লানের অনুমোদন দিয়েছে। তাতে ৫টি মাস র্যাপিড ট্রানজিটের (এমআরটি) কথা বলা হয়েছে।

এরমধ্যে রাজধানীর উত্তরা (দিয়াবাড়ি) থেকে মতিঝিল পর্যন্ত (এমআরটি লাইন-০৬) মেট্রোরেল বাস্তবায়নে ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় সরকার। তাতে ব্যয় ধরা হয় ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা।

এরমধ্যে জাইকার ঋণ ১৬ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা এবং সরকারি অর্থ ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। প্রকল্পের নির্মাণকাজও শুরু হয়েছে ২০১২ সালে। ২০২২ সালে এটি আলোর মুখ দেখবে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৭৯ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে লাগবে ৪৩ মিনিট।

ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহনে যাত্রীদের সুবিধার্থে ১৬টি স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। দিনরাত এর বিশাল কর্মযজ্ঞ চললেও তা লক্ষমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। সূত্র আরও জানায়, যানজটে অতিষ্ঠ ঢাকা নগরবাসী।

তাই আরএসটিপির অংশবিশেষ এবারে মেট্রোরেল লাইন-১ ও ৫ নামে আলাদা করে দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মেট্রোরেলের এই লাইন দুটির বড় অংশ যাবে মাটির নিচ দিয়ে। উন্নত বিশ্বের মতো দেশেও সাবওয়ে বা পাতাল রেলের যাত্রা শুরু হবে।

মেট্রোরেল লাইন-১ (বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর) : মেট্রোরেলের দুটি আলাদা প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পরিকল্পন কমিশনে পাঠিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।

ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (মেট্রোরেল লাইন-১) প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দর থেকে খিলক্ষেত- যমুনা ফিউচার পার্ক- নতুন বাজার- উত্তরবাড্ডা- হাতিরঝিল- মালিবাগ হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করা হবে (আন্ডাগ্রাউন্ড) মাটির নিচ দিয়ে। তাতে স্টেশন থাকবে ১২টি। বাকি ১১ কিলোমিটার হবে এলিভেটেড বা মাটির ওপর দিয়ে।

তাতে সাতটি স্টেশন থাকবে। সবমিলে এ রুটে মেট্রোরেলের দৈর্ঘ্য হবে ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার। মেট্রোরেল লাইন ১-এর জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

এর মধ্যে জাইকা দেবে ৩৩ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা, বাকি ১৭ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা সরকার ব্যয় করবে। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালে এর কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর প্রধান প্রধান কাজ ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সিভিল এন্ড স্টেশন ওয়ার্কস ইন মেইন লাইন। সিভিল এবং বিল্ডিং ওয়ার্কস ইন ডিপো এক হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা, পরামর্শক সেবায় এক হাজার ৩৬০ কোটি, রোলিং স্টকস এন্ড ইকুইপমেন্টস ইন ডিপোর জন্য প্রায় চার হাজার কোটি, ঋণের সুদ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। এভাবে বিভিন্ন অঙ্গের ব্যয় ধরা হয়।

সূত্র আরও জানায়, লাইন-০১ প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনে ২ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও কি পরিমাণ ভূমি অধিগ্রহণ হবে তা উল্লেখ করা হয়নি। এছাড়া সর্বশেষ গেজেট অনুযায়ী এ ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে কি না তার কোনো ডকুমেন্ট যুক্ত করা হয়নি।

জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে প্রাক্কলিত ব্যয়েরও কোনো ডকুমেন্ট যুক্ত করা হয়নি। জাইকার সঙ্গে ঋণ চুক্তি প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা হলেও প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ কম ধরা হয়েছে।

এছাড়া পরামর্শক খাত এবং ভৌত কাজের ব্যয় সম্পূর্ণভাবে প্রকল্প সাহায্য থেকে বা বিদেশি ঋণ থেকে ব্যয় করার কথা। কিন্তু ডিপিপিতে এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে দেশি অর্থ থেকে ধরা হয়েছে।

ড্রাইভারের সংখ্যার ভিত্তিতে ২৬টি জিপ, ২৪টি ডাবলডেকার পিকআপ ও মাইক্রোবাসসহ ৭৮টি গাড়ির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এসব যাচাই-বাছাই করতে গত রোববার পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত পিইসি সভায় এসব ব্যাপারে আপত্তি করে তা সংশোধন করতে বলা হয়।

মেট্রোরেল লাইন-৫ নর্দান রুট (হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা): অন্যদিকে মেট্রোরেল লাইন-৫ নর্দান রুটের আওতায় সাভারের হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত সাড়ে ছয় কিলোমিটার এলিভেটেড বা উড়াল পথ হবে।

আর আমিনবাজার থেকে ভাটারা পর্যন্ত সাড়ে ১৩ কিলোমিটার হবে পাতাল রেল। সবমিলে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটারে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৪১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা।

এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হবে ১০ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা আর জাইকার ঋণ হিসাবে ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০২৮ সাল নাগাদ এর কাজ শেষ করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

দিনে ১২ লাখের বেশি যাত্রী যাতায়াত করতে পারবে। প্রকল্পের প্রধান প্রধান কাজ ধরা হয় সিভিল এন্ড স্টেশন ওয়ার্কস ইন মেইন লাইনে ১৫ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা, সিভিল এন্ড বিল্ডিং ওয়ার্কস ইন ডিপোর জন্য দুই হাজার ৩২৬ কোটি, রেলওয়ে ইনস্টলেশনে চার হাজার ৫৫৩ কোটি, রোলিং স্টকস এন্ড ইকুইপমেন্টস ইন ডিপোর জন্য তিন হাজার ৮৫২ কোটি, পরামর্শক সেবায় এক হাজার ৮০২ কোটি, ঋণের সুদে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। এভাবে অন্যান্য অঙ্গেও ব্যয় ধরা হয়।

পিইসি সভায় বলা হয়— প্রস্তাবিত লাইন-০৫ মেট্রোরেলের ডিটেইল্ড ডিজাইন এখনো শেষ হয়নি। তারপরও এর পরামর্শকের জন্য প্রায় এক হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। যা সমীচীন নয়। একইভাবে এমওডি চুক্তির ব্যত্যয় ঘটিয়ে পরামর্শক সেবা ও ভৌত কাজের ব্যয় দেশি অর্থ থেকে ধরা হয়েছে।

এছাড়া ঋণচুক্তির চেয়ে জাইকার ঋণ বেশি ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। আএসটিপিতে এমআরটি লাইন ৫-এ ভূলতা-বাড্ডা-মিরপুর রোড- মিরপুর-১০,গাবতলি-ধানমন্ডি-বসুন্ধরা সিটি-হাতিরঝিল লিংকরোড অ্যালাইনমেন্টের দৈর্ঘ্য ৩৫ কিলোমিটার ধরা হলেও এ রুটে প্রাক্কলন করা হয়েছে ২০ কিমি।

তাহলে অ্যালাইমেন্ট পরিবর্তন ও বাকি ১৫ কি.মি. কীভাবে হবে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। ৪২ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণে ৩ হাজার ২৪১ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে কোনো ডকুমেশন যুক্ত করা হয়নি। তা স্পষ্ট হওয়া দরকার।

একই সঙ্গে যে ২৬টি জিপ, ১১টি পিকআপ ও ৭টি মাইক্রোবাস কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে তা অর্থ বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্পের সুপারিশ অনুযায়ী করা হয়নি। সভায় এসব ব্যাপারে আপত্তি করে তা সংশোধন করতে বলা হয়।

এসব সংশোধন করে পুনর্গঠিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি- একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে সূত্র জানায়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments