রেকর্ড রোগী

153

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার সঙ্গে যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুরও। বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী গত এক সপ্তাহে সারাদেশে ডেঙ্গুতে অন্তত ২০ জন মারা গেছেন।

এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টাতেই মারা গেছেন অন্তত দুই চিকিৎসকসহ ৪ জন। গতকাল দুপুরে রাজধানীর মুগদা হাসপাতালে মারা যান মো. জিয়াউদ্দিন (১৮) নামে এক তরুণ। তিনি ৫৫/৭ উত্তর বাসাবোতে বসবাস করতেন। কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম নেওয়ার পথে বিকালে মারা যান উংখেনু

রাখাইন নামে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী। এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে মারা যান মুক্তিযোদ্ধা উইলিয়াম ম্রং নামে আরও এক চিকিৎসক। একই দিন গভীর রাতে স্কয়ার হাসপাতালে মারা যান রুমানা (২৫) নামে এক চিকিৎসক। তার বাড়ি বেনাপোলে। একই হাসপাতালে ওইদিন মারা যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং শেষ বর্ষের ছাত্র ফিরোজ আমিন স্বাধীন।

হাসপাতালগুলোতেও ক্রমাগত বাড়ছে রোগীর চাপ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে রেকর্ড ২৩৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর আগে একদিনে আর কখনই এতসংখ্যক ডেঙ্গু রোগী ঢামেকে আসেনি। আর এ বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ঢামেকে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন ১ হাজার ৬৯০ জন। এর মধ্যে ১ হাজার ২৬ জন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও ভর্তি আছেন ৬৫৮ জন। এ ছাড়া ঢামেকে গত সাত মাসে মারা গেছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত ৬ জন।

ঢামেকের অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, আগের তুলনায় ডেঙ্গু রোগীর চাপ অনেক বেড়েছে। অবশ্য আমরা এই বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা প্রদানে প্রস্তুত আছি। আশা করছি আমরা তাদের সুষ্ঠুভাবে চিকিৎসা দিয়ে যেতে পারব। তবে রোগীদের স্থানসঙ্কুলান না হওয়ায় নতুন জায়গা খোঁজা হচ্ছে।

এদিকে স্থানসঙ্কুলান নিয়ে একই অবস্থা রাজধানীর অন্য হাসপাতালগুলোতেও। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তরা আসতে থাকায় এরই মধ্যে ঢামেক হাসপাতালে নির্ধারিত শয্যার বাইরে মেঝে, বারান্দা, করিডর, এমনকি সিঁড়িতে রেখেই রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার পরও সেখানে ঠাঁই না হওয়ায় অনেক রোগীকে নিয়ে স্বজনরা ছুটছেন অন্য হাসপাতালগুলোয়। কিন্তু সেখানেও অনেকটা একই চিত্র।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত চার/পাঁচদিনে ঢাকার বাইরে ফেনীর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল ও ফেনী ডায়াবেটিস হাসপাতালে ২২ জন, বরগুনায় ১৪, নোয়াখালীতে ৯, পাবনায় ১৫, লক্ষ্মীপুরে ৮, কুমিল্লায় ১৯ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।

দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করে থাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন ও কন্ট্রোল রুম। রাজধানীর ১২টি সরকারি, ৩৫টি বেসরকারি হাসপাতাল এবং ঢাকার বাইরে, খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে।

কন্ট্রোল রুমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ঢাকার ১০টি সরকারি এবং ১১টির বেসরকারি হাসপাতালে এই সময়ে ৬৮৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। ঢাকা মেডিক্যাল ছাড়াও পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে ৭ জন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৯, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৩৬, হলি ফ্যামিলিতে ২২, বারডেমে ১২, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ২৪, মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ৪৯, বিজিবি হাসপাতালে ১৩, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৩২ জন ভর্তি হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শনিবার চালুকৃত ডেঙ্গু সেলে ৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যালে ১৯, ইবনে সিনায় ১৪, স্কয়ারে ১২, সেন্ট্রাল হাসপাতালে ৩১, গ্রিনলাইফে ১১, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ২৪, ইউনাইটেডে ৬, খিদমাহ হাসপাতালে ১৫, ডা. সিরাজুল ইসলাম হাসপাতালে ২০, অ্যাপোলো হাসপাতালে ১১, ইউনিভার্সেলে ৮, সালাউদ্দিন হাসপাতালে ১৯, পপুলারে ১৫ জন ভর্তি হয়েছেন।

গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বাইরে ঢাকা বিভাগে ১৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৫, খুলনা বিভাগে ২৫, রাজশাহী বিভাগে ২৯, বরিশাল বিভাগে ১২, সিলেট বিভাগে ৮ জনসহ মোট ১২৮ জন ভর্তি হয়েছেন।

কন্ট্রোল রুমের তথ্য বলছে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল শনিবার সকাল পর্যন্ত ১০ হাজার ৫২৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩৭, ফেব্রুয়ারিতে ১৯, মার্চে ১৭, এপ্রিলে ৫৮, মে মাসে ১৮৪ জন, জুন মাসে ১৮২৯ জন এবং জুলাই মাসে ৮ হাজার ৩৮৪ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে ৭ হাজার ৮৪৯ জন বাড়ি ফিরেছেন এবং ২ হাজার ৬৭১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ জন মারা গেছে।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় বেড়েছে রক্তের চাহিদাও। আত্মীয়স্বজন রক্তদানের পর অনেকে ব্লাড ব্যাংকগুলোর দ্বারস্থ হচ্ছেন। ব্লাড ব্যাংকগুলো বলছে, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ায় আগের চেয়ে রক্তের চাহিদা বেড়েছে প্রায় পাঁচগুণ। এতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন।

চিকিৎসকরা বলছেন, একজন স্বাভাবিক মানুষের রক্তে প্লাটিলেটের হার প্রতি ১০০ মিলিলিটারে দেড় থেকে চার লাখ। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে রোগীর রক্তে প্লাটিলেট এক লাখের নিচে নেমে আসে। এজন্য রক্তের প্রয়োজন হয়।

ডেঙ্গুজ্বরের চিকিৎসাসেবা প্রদানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪০ শয্যার ডেঙ্গু সেল চালু করা হয়েছে। শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ডা. সাহানা আখতার রহমান সেলের উদ্বোধন করেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ রফিকুল আলম, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. জিলন মিঞা সরকার উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার মজুমদার জানান, ডেঙ্গু সেলের ৪০ শয্যার মধ্যে ২৫টি কেবিন ব্লকে এবং অন্য শয্যাগুলো ডি-ব্লকের মেডিসিন বিভাগে রাখা হয়েছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments