রোহিঙ্গা ফেরত কোন পথে

364

আলোকিত সকাল ডেস্ক

নিপীড়ন-নির্যাতন-গণহত্যার শিকার হয়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে বিশ্বকে দিয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক শক্তি চীন ও ভারতের সমর্থন আদায়ে গুরুত্ব দিয়ে আসছে সরকার। বিশেষ করে মিয়ানমারের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাববিস্তারকারী দেশ চীনকে এ ইস্যুতে পাশে পেতে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে চীন সফরে রয়েছেন। এ সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আজ শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক রয়েছে; যেখানে প্রধান আলোচ্য বিষয় থাকছে ‘রোহিঙ্গা সংকট’।

চীন সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রধান টার্গেট চীনকে বশে আনা, যেন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তারা মিয়ানমারের ওপর ‘চাপ’ তৈরি করে। বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিধর চীনের হাতেই রয়েছে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনের চাবি। যদিও মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং গভীর। অন্যদিকে বাণিজ্যস্বার্থের কারণে ভারতের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক চমৎকার। বিশ্বের শক্তিশালী এ দুটি দেশের প্রত্যক্ষ সমর্থনের কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো ধরনের সৌজন্যতাও প্রদর্শন করছে না। দেশটির ওপর দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক চাপেও কোনো ফল আসছে না। তাই রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে এই মুহূর্তে চীনের সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই বাংলাদেশের হাতে।

জাপান সৌদি আরব ফিনল্যান্ড সফর শেষে গত মাসের ৯ তারিখে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই জানিয়েছিলেন, নির্যাতনের মুখে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে আলোচনা করতে তিনি চীন সফর করবেন। কারণ সারা বিশ্ব চাইছে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরুক কিন্তু মিয়ানমার তাদের ফেরাতে চাইছে না। এ সংকট নিরসনে চীনের দিক থেকে সহায়তা জরুরি হয়ে পড়েছে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধদের হাতে হত্যা ধর্ষণ নির্যাতনের মুখে পড়ে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসতে থাকে রোহিঙ্গাস্রোত। তারও আগে আশি ও নব্বই দশকে একই পরিস্থিতির মুখে পড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল লাখ লাখ রোহিঙ্গা। কিছু কিছু রোহিঙ্গা মিয়ানমার ফেরত নিলেও প্রত্যাবাসন জটিলতা ও দেশটির অনাগ্রহের কারণ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা রয়ে যায় বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে। এমনকি গত কয়েক দশকে অনেক রোহিঙ্গা মিশে গেছে বাংলাদেশের মূল জনস্রোতে। সে সংখ্যা অনুমান করা হয় ৫ লাখেরও বেশি। এ সংখ্যা নিবন্ধিত নয়। নতুন করে আসা প্রায় ৮ লাখসহ টেকনাফ উখিয়ার ক্যাম্পে বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে ১১ লাখের বেশি। বিপন্ন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিলেও এ সঙ্কটকে দীর্ঘমেয়াদি করার বিপদ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল বাংলাদেশ। ইতোমধ্যেই দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিরূপে আবির্ভূত হচ্ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। এ নিয়ে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম অঞ্চলের স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যেও বিরাজ করছে চরম অসন্তোষ। এ পরিস্থিতিকে আর বাড়তে দিতে চায় না সরকার। দ্রুততম সময়ে এ সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রত্যাশা করছে সরকার।

ইতোমধ্যে জাতিসংঘ ও ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলো রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বললেও চীন ও ভারত সমস্যা সমাধানে আগ্রহপূর্ণ ভূমিকা রাখেনি। উপরন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়ার ভেটো প্রদান সংকটকে আরো প্রলম্বিত করেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের মতো দীর্ঘদিনের প্রতিবেশীর আচরণ এবং চীনের মতো বন্ধু ও বাণিজ্যিক অংশীদারের ভূমিকা বাংলাদেশকে অনেকটা বিপাকে ফেলে দিয়েছে।

অন্যদিকে চীন-ভারতকে পাশে পেয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে থোড়াই কেয়ার করছে মিয়ানমার। চুক্তি অনুযায়ী নিজেদের নাগরিক রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে নানা টালবাহানার আশ্রয় নিচ্ছে দেশটি। রোহিঙ্গাদের ফেরানোর পরিবেশ তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক চাপ থাকলেও মিয়ানমার সে রকম কোনো উদ্যোগই নিচ্ছে না। উপরন্তু আরাকান বা রাখাইনের পরিস্থিতি দিন দিন ‘অনিরাপদ’ করে তোলা হচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গারাও নিরাপত্তার অভাবে নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছে। এ অবস্থায় মিয়ামনার চীনের ‘প্রশ্রয়’কেই হাতিয়ার করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিদের তরফ থেকে চাপ দেওয়ার পরও কোনোভাবে মতি ফেরানো যাচ্ছে না মিয়ানমারের। এ অবস্থায় কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে রোহিঙ্গাদের জন্য মিয়ানমারের মানচিত্র বদলের প্রস্তাব করেছেন কংগ্রেসের প্রতিনিধি ব্র্যাড শেরম্যান। তিনি কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের এশিয়া প্রশান্ত-মহাসাগরীয় উপকমিটির চেয়ারম্যান। কংগ্রেসে পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বাজেটবিষয়ক শুনানিতে তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যকে দেশটি থেকে আলাদা করে দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করা হোক। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেছেন, মিয়ানমার যদি রাখাইনের রোহিঙ্গা নাগরিকদের দায়িত্ব নিতে না পারে, তাহলে যে দেশ তাদের দায়িত্ব নিয়েছে, সেই বাংলাদেশের সঙ্গে রাখাইনকে জুড়ে দেওয়াই তো যৌক্তিক পদক্ষেপ হবে। এ সম্ভাবনার কথা বিবেচনার জন্য পররাষ্ট্র দফতরের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেরম্যান বলেন, সুদান থেকে দক্ষিণ সুদানকে আলাদা করে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে যুক্তরাষ্ট্র যদি সমর্থন করতে পারে, তাহলে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কেন একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না? যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিনিধিরা শেরম্যানের এ বক্তব্যকে সমর্থন বা নাকচ কোনোটিই করেননি।

গত ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতাসীন হয়েছে। নতুন সরকার গঠনের পরপরই রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের লক্ষে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে তারা। তারই অংশ হিসেবে ভারতের লোকসভা নির্বাচনের পর পুনর্বিজয়ী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ভারতের অকৃপণ সহযোগিতা কামনা করেছেন। মোদিও রাষ্ট্রপতিকে রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

যদিও নানা আঞ্চলিক স্বার্থের কারণে মিয়ানমারের প্রতি অধিকতর প্রশ্রয়পূর্ণ মনোভাব ও দুর্বলতা রয়েছে চীনের। চীন মিয়ানমারের বড় প্রতিবেশীও বটে। তাই মিয়ানমারের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাববিস্তার করতে পারে দেশটি।

চীনের মতো দেশ অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নয় বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তবে বাণিজ্যিক স্বার্থ অক্ষুণœ রাখার ব্যপারে চীন সবসময় সজাগ। এ ক্ষেত্রে

মিয়ানমার চীনের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ।
মালয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়না স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী বলেন, গত দু’দশকে চীনের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ বাণিজ্য সমুদ্রপথে হচ্ছে। সেই বাণিজ্য মালাক্কা প্রণালি দিয়ে হয়। চীন জানে যে তার সঙ্গে শত্রুভাবাপন্ন দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক মিত্ররা চাইলেই চীনের বাণিজ্য বন্ধ করে দিতে পারে। মালাক্কা সংকটের কথা মাথায় রেখেই চীন স্থলপথে বিভিন্ন পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল এবং গ্যাস যাতে চীনে পৌঁছাতে পারে- তার ব্যবস্থা করেছে। এরকম দুটি পাইপলাইন আরাকান অর্থাৎ মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে এসে পৌঁছেছে। ভারতেরও এ ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে কালাদান এবং সিটওয়ে বন্দরে। কিন্তু চীনের অর্থনীতির জন্য এ দুটি পাইপলাইন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্য চীন চায় না যে, মিয়ানমার সরকার যেন আরাকানের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ হারায় বা আরাকানকে কেন্দ্র করে চীন-মিয়ানমার সম্পর্ক খারাপ হোক।

এছাড়া চীন মিয়ানমারের আকিয়াব উপকূলে বাণিজ্য ঘাঁটি স্থাপন করছে এবং বন্দর স্থাপনের কাজও এগিয়ে নিচ্ছে। রোহিঙ্গারা যেসব এলাকায় থাকতো সেসব এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে এসব এলাকা। এসব স্বার্থকে অক্ষুণ্ন রাখার জন্য নিরাপত্তা পরিষদে বারবার ভেটো প্রদান করে মিয়ানমারকে সন্তুষ্ট রাখছে চীন। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণ না করার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে চীন। অথচ বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট এখন ‘জীবন-মরণ সমস্যা’ হয়ে দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে যে বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে তার চেয়ে কম স্বার্থ জড়িত নয় চীনের। মিয়ানমারে চীনের বিনিয়োগ প্রায় দু’হাজার কোটি ডলারের মতো। অপরদিকে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় চার হাজার কোটি ডলার। এ ছাড়া ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ঢাকা সফর করার পর ২ হাজার কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়েছে। বাংলাদেশকে আগে কখনোই একসঙ্গে এত অর্থসহায়তা দেয়নি অন্য কোনো দেশ। ফলে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় আমলে নিতে হবে চীনকে। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে পারলে নিজদের বিনিয়োগও নিরাপদ থাকবে-এ বিষয়টি ভাবতে হবে চীনকে। বাংলাদেশকে সমর্থ হতে হবে চীনকে এ বিষয়ে বোঝাতে।
চীন সফরের সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি খ্য ছিয়াং।

তিনি রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফিরতে পারার মতো পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমারকে রাজি করানোর জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে জানা গেছে। দুই নেতার বৈঠকের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরানোর বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য ওই এলাকার শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিঘিœত হচ্ছে। শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরানোর জন্য এটা খুবই দরকার। তিনি বনে, যতদিন দিন যাবে ততই এই চ্যালেঞ্জটা বড় হবে। সুতরাং এটার দ্রুত একটা সমাধান করা দরকার। আর সমাধান হলো- এরা যেন তাদের নিজস্ব মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারে। চীনের প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে একমত, ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়েই এ সমস্যার সমাধান হবে।

বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টা থেকে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রায় আধা ঘণ্টা এ বৈঠক চলে। বৈঠকের পর দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দুদেশের মধ্যে নয়টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে সই হয়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments