শঙ্কা দীর্ঘমেয়াদের

152

আলোকিত সকাল ডেস্ক

এবার বর্ষা এসেছে দেরিতে কিন্তু বন্যা দেরি করেনি। ভারতে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও বরাক অববাহিকায় টানা ভারী বৃষ্টি আর উজানের জলাধার খুলে দেওয়ায় বাংলাদেশে বন্যা শুরু হয়েছে। সুরমা-কুশিয়ারা ছাড়া দেশের প্রায় সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে। দেশের পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও উত্তরাঞ্চলে পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতি হচ্ছে।

এদিকে পদ্মায় হু হু করে পানি বাড়ায় তীরবর্তী জেলাগুলোয় ছড়িয়ে পড়ছে বন্যা। এর মধ্যে আবার টানা ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। আবহাওয়াবিদরা আশঙ্কা করছেন, এবারের বন্যা দীর্ঘমেয়াদে থাকতে পারে। বন্যাদুর্গত জেলাগুলোর পঞ্চাশ লক্ষাধিক মানুষ সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েছেন। সরকার ত্রাণ দিলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। কর্মহীন শ্রমজীবীরা। মাসখানেকের মধ্যেই আসছে ঈদুল আজহা। কৃষিনির্ভর এসব জেলার গবাদিপশু ব্যাপকহারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে প্রান্তিক খামারিরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

সরকার পরিস্থিতি মনিটরিং করলেও বন্যা দীর্ঘমেয়াদি হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অতীতের ধারাবাহিকতায় দেখা গেছে, সাধারণত বর্ষা মৌসুমে আগাম বৃষ্টি শুরু হলে বন্যা দীর্ঘমেয়াদি হয়। তবে এবার বর্ষাকালে কিছুটা দেরিতে বৃষ্টি শুরু হলেও আগাম বন্যা শুরু হয়েছে। সে হিসেবে এবারের বন্যা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে বলে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বন্যা জেঁকে বসেছে। এরমধ্যে পদ্মার পানি বাড়ায় ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিবন্দি হয়ে পড়ছে।

এরমধ্যে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রংপুর ও সিলেট বিভাগ ও ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে আগামী ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হবে। এতে বন্যা আরও বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা বর্ষা মৌসুমের শুরু। দেশের নদীগুলোতে দুকূল ছাপানো পানি আসে শ্রাবণ আর ভাদ্র মাসে। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্রবল বন্যার আদর্শ সময়। সে হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে বন্যার সুস্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। তবে আশার কথা যমুনা নদীসহ কিছু কিছু এলাকায় পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে।

গতকাল শুক্রবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টা পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ, জামালপুর এবং পদ্মা নদীর সুরেশ্বর পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। টাঙ্গাইল এবং সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে। এছাড়া বগুড়া, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নেত্রকোনা, সিলেট ও সুনামগঞ্জে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। ব্রহ্মপুত্র ছাড়াও জিঞ্জিরাম, হলহলিয়া, ধরলা, দুধকুমারের উপচেপড়া পানিতে ডুবে গেছে অসংখ্য জনপদ।

এদিকে তিস্তা নদীর পানি গত ৫০ বছরের সব রেকর্ড ভেঙে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও সিরাজগঞ্জে পাঁচ উপজেলার দুই লক্ষাধিক মানুষ এখনো পানিবন্দি। কাজীপুর, সদর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্রতিদিনই প্লাবিত হচ্ছে। এ সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন চরাঞ্চলের মানুষ। এসব এলাকার ফসলি জমি ও হাট-বাজার ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে।

পদ্মার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফরিদপুর সদরসহ জেলার চারটি উপজেলার নিম্নাঞ্চলগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। অপরদিকে আড়িয়াল খাঁ নদে তীব্র আকারে ভাঙন শুরু হয়েছে। এভাবে নতুন নতুন এলাকা পানিবন্দি হয়ে পড়ছে।

দুর্গতদের ঘরে শুকনো খাবার নেই। এসব এলাকার ৮০ শতাংশ নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় মিলছে না বিশুদ্ধ পানি। শৌচাগারের অভাবে বাড়ছে বিড়ম্বনা। অনেকে নৌকায় ও ঘরের মাচানে রাতযাপন করছেন। ৪০ লাখের বেশি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও রোগের ঝুঁকিতে পড়েছে বলে গতকাল জানিয়েছে রেডক্রিসেন্ট। কয়েক লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছেন। প্রায় এক লাখ বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। ফলে শিশু, প্রসূতি মা, গর্ভবতী মা ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। হাজার হাজার পরিবার উঁচু বাঁধ ও পাকা সড়কসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে। ভেঙে পড়েছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। যেসব এলাকায় পানি নামছে সেখানে আরেক ধরনের বিপর্যস্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

বিভিন্ন জেলার ভুক্তভোগীরা বলছেন, প্রতিবছরই এসব এলাকার ছোট বড় বাঁধ ভেঙে যায়। বাঁধ নির্মাণ আর রক্ষণাবেক্ষণে যে বিপুল ব্যবসা জড়িত। এজন্য বাঁধগুলোর ভিত দুর্বল রেখেই সংস্কার করা হয়। ফলে ফি বছরই বাঁধ ভেঙে ডুবে যায় এসব এলাকা। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড এসব অভিযোগকে থোড়াই কেয়ার করে।

বোরো মৌসুমে ধানের দাম না পাওয়ায় ছোট কৃষক ও বর্গাচাষিরা বিপাকে রয়েছেন। চাষিরা আমন চাষের মাধ্যমে ধাক্কা সামলানোর আশায় ছিলেন। কিন্তু মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে ছোবল মেরেছে বন্যা। এদিকে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে প্রান্তিক খামারিরা গবাদিপশু প্রাণী লালন পালন করেছেন তারাও ঘোর সংকটে রয়েছেন। গো-খাদ্যের অভাব, স্থান সংকুলান ও নিরাপত্তার অভাবে খামারিরা পানির দরে এসব প্রাণী বেচে দিচ্ছেন। অনেকের গরু ছাগল মরে গেছে বন্যায়। পানি নামার পরও নানা রোগেও অনেক গবাদিপশু মারা যাবে। এজন্য খামারিরা এসব গবাদিপশুর জন্য প্রাণঘাতী রোগের প্রতিষেধক দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, কয়দিন আগে ধানের দামে ভুগেছি, এখন পানিতে মরছি। ঘরে ঘরে পানি, ঘরে ঘরে পানির জন্য হাহাকার।

ইতোমধ্যেই সারা দেশে প্রায় তিন হাজারের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় শ’খানেক প্রতিষ্ঠান নদীতে বিলীন। ফলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার শঙ্কা বাড়ছে। গত দশদিনে কেবল কুড়িগ্রামে শিশুসহ বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে ১৫ জন। এর মধ্যে উলিপুরেই ৯ জন। এভাবে উপদ্রুত এলাকাগুলোতে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। নেপাল আর ভারতে ও বাংলাদেশ মিলিয়ে শতাধিক লোক মারা গেছে।

ইতোমধ্যে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছে জেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা। তবে সীমিত আকারে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হওয়ায় অধিকাংশ বন্যার্ত মানুষের ভাগ্যে ত্রাণ জুটছে না। এখন পর্যন্ত অনেক এলাকায় ত্রাণ পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ দুর্গতদের। এছাড়া বন্যার ব্যাপকতার কারণে সব এলাকায় ত্রাণসমাগ্রী পৌঁছাতেও হিমশিম খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন। ফলে বানভাসি মানুষ খাদ্যসংকটে রয়েছে। দুর্গত এলাকাগুলোর পরিস্থিতি খারাপ হয়ে গেছে। সবজির দাম আকাশ ছুঁয়েছে। মানুষের হাতে কাজ নেই। ব্যবসায়ীর দোকান বন্ধ, শ্রমিকদের কাজ বন্ধ। কয়েক দিনের মধ্যে রোগবালাই ছড়ানো শুরু হবে। পানিবন্দি হাজারো পরিবার অপেক্ষা করছে কবে পানি নামবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশসংলগ্ন ভারতের উপতক্যাগুলোতে ব্যাপক বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল ও বন্যা অব্যাহত রয়েছে। উজানের এসব পানি অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসতে থাকলে বন্যা দীর্ঘমেয়াদি হবে। সেক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি সংকট নিয়ন্ত্রণে রাখা কষ্টকর হবে। আগামী ১০ সপ্তাহ বন্যার ঝুঁকি থাকবে, সেই সঙ্গে থাকবে ভাঙনের ঝুঁকি।

২৪ ঘণ্টায় ডুবে যাবে আরও ৪ জেলা : বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস এবং সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের মধ্যাঞ্চলের আরো চারটি জেলা প্লাবিত হতে পারে। এ নিয়ে মোট ২২টি জেলা বন্যায় আক্রান্ত হবে। বাংলাদেশের উত্তরের জেলাগুলোর মধ্যে বন্যায় সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হয়েছে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলা। বিবিসি

চিলমারীর একজন বাসিন্দা বসির আহমেদ বলছিলেন, এখন চিলমারীর শতভাগ এলাকা বন্যাপ্লাবিত। আমি যে বাড়িতে থাকি সেটি বেশ উঁচুতে। আমার বাড়িওয়ালা বলছেন ৮৮ সালের বন্যায় এই বাড়িতে পানি ওঠেনি। তিনি জানান, কিন্তু আজ (গতকাল শুক্রবার) সকালে আমাদের বাড়িতে পানি উঠেছে। বাড়ির বাইরে কোমরের ওপরে পানি। ডিঙ্গি নৌকায় করে এই মাত্র আমার স্ত্রীকে একটা আশ্রয়কেন্দ্রে রেখে এলাম। চিলমারীর সব জায়গায় এখন পানি আর নৌকায় যাতায়াত করতে হচ্ছে বলছিলেন বসির আহমেদ।

কুড়িগ্রামের মতোই দেশের মধ্যাঞ্চলের চারটি জেলা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বন্যায় প্লাবিত হওয়ার পূর্বাভাস দিচ্ছে বন্যা পূর্বাভাস এবং সতর্কীকরণ কেন্দ্র। তারা বলছে, এসব জেলা হচ্ছে- ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ এবং রাজবাড়ী।

বন্যা পূর্বাভাস এবং সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা মো. শাহেদ কাওসার জানান, উজান থেকে পানি বিভিন্ন নদ-নদী দিয়ে এসে এখন এসব এলাকা প্লাবিত করবে।
তিনি বলছিলেন, উজান থেকে যে পানিটা আসছে বিশেষ করে জামালপুর, কুড়িগ্রামের তিস্তা নদী- সেখান থেকে পানিটা এখন মধ্যাঞ্চলে চলে আসছে।
যে চারটি নতুন জেলা প্লাবিত হবে তার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ফরিদপুরের।

ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রোকসানা রহমান জানান, বন্যার পূর্বাভাসের পরই তারা আশ্রয়কেন্দ্রসহ দুর্যোগকালীন প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন।

রোকসানা আরও বলেন, আমরা বন্যার পূর্বাভাস পাওয়ার পর থেকেই জেলার সংশ্লিষ্ট সব অফিস মিটিং করেছি। ৫৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া নিকটবর্তী স্কুলগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ৯২টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এছাড়া ত্রাণের জন্য ইতোমধ্যে উপজেলাগুলোতে শুকনা খাবার চাল পাঠানো হয়েছে। আরও যে চাহিদা রয়েছে সেটা আমরা ঢাকায় জানিয়েছি।

বাংলাদেশের মোট ২২টি জেলা এখন বন্যাপ্লাবিত। তবে কত মানুষ এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত তার হিসাব এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের পরিচালক মো. ইফতেখারুল ইসলামের কাছে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, প্রতিবছরই বন্যার সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণ সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ বছর কি তারা আগাম সতর্কতামূলক কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন?

জবাবে ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, তারা বিষয়টা খতিয়ে দেখছেন। এই মুহূর্তে টাঙ্গাইলের বেশ কয়েকটি এলাকা বন্যাকবলিত এবং কালকের তুলনায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। কালিহাতীতেও বন্যা হচ্ছে।

সেখানে তালিকা তৈরি করতে হবে কাদের ত্রাণসামগ্রী দিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ত্রাণ পৌঁছাতে তো মিনিমাম একটা সময়ের প্রয়োজন। এখন যদি কেউ বলে ত্রাণসামগ্রী তারা পাচ্ছে না, বিষয়টা তেমন না। তারা অবশ্যই পাবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments