শিক্ষকদের লালসার শিকার হচ্ছে ছাত্রীরা

347

আলোকিত সকাল ডেস্ক

নারায়ণগঞ্জে একের পর এক শিক্ষকদের যৌন নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছেন অভিভাবকেরা। তারা এখন তাদের মেয়ে শিশুদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। স্কুল অথবা কোচিং সেন্টারে পাঠানো নিয়ে আতঙ্ক ভর করছে তাদের উপর। কিছু অভিভাবক তাদের কন্যা শিশুদের কোচিং বন্ধ করে দিয়েছেন। শুধু স্কুল-কলেজ নয় মাদ্রাসার বিষয়ে এমন আপত্তি তুলেছেন অভিভাবকেরা।

সিদ্ধিরগঞ্জ মিজমিজি অক্সফোর্ড হাই স্কুলের বিশ এর অধিক ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ স্বীকার করা শিক্ষক আশরাফুল আরিফ আটক হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় বিষয়টি। নারায়ণগঞ্জে এবার একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে আটক করা হয়েছে যার বিরুদ্ধে ১০ থেকে ১২জন শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। র‌্যাব-১১ এর একটি টিম গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় সদর উপজেলার ফতুল্লার মাহমুদপুর ইউনিয়নের মাহমুদপুর এলাকায় বাইতুল হুদা ক্যাডেট মাদ্রাসা থেকে তাকে আটক করা হয়। র‌্যাব অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ওই শিক্ষক মাদ্রাসার ১০ থেকে ১২ জন ছাত্রীকে ধর্ষণ করেন। এ ছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা ও যৌন হয়রানির অভিযোগ সহ তার মুঠোফোন ও কম্পিউটারে তল্লাশি চালিয়ে পর্নোগ্রাফি ভিডিও পাওয়া গেছে। এর আগে শহরের দেওভোগে অবস্থিত মর্গ্যান গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজী শিক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের কর্মী এম কবির ইউ চৌধুরী বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে ছাত্রীদের ডেকে এনে অশালীন কথাবার্তা ও ইঙ্গিত করার।

এমনকি এ ধরনের আচরণের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েও সুরাহা না পাওয়ায় সদর মডেল থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে কলেজ শাখার ছাত্রীবৃন্দ। এর বাইরেও মাদ্রাসা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ছাত্রীর শালীনতা হানি এবং বলাৎকার এর মত ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি মাদ্রাসায়। এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকেরা। পড়ালেখা করাতে নিরাপদ স্কুল খুঁজছেন তারা। কেউ কেউ তাদের শিশুদের পড়ালেখা বন্ধ করার মত আত্মঘাতি সমাধান খুঁজছেন। তাদের অভিযোগ পর পর এমন ঘটনা শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসল চেহারা দেখা দিয়েছে। এমন অনেক ঘটনা এর আগেও ঘটেছে যা প্রতিষ্ঠান এবং এলাকার মোড়লদের খপ্পরে পড়ে ধামাচাপা পড়ে গেছে। এসব ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে সমাজের চরম অবক্ষয় বিরাজমান। যে অবক্ষয়ের অংশে দৃশ্যত বখাটে ও মাদকসেবী যেমন আছে, তেমনি আছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষকরা। মূল্যবোধের অবক্ষয়, সামাজিক অস্থিরতা আর পারিবারিক নৈতিক শিক্ষার অভাবে এমন পাশবিকতার মতো ঘটনা বার বার জন্ম দিচ্ছে বলে বলছেন অভিভাবকরা।

এর প্রভাবে কিছু মাদ্রাসার মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও শিশুরা আজ নিরাপদ নয়। সামাজিক প্রতিষ্ঠান স্কুল, কলেজেও মানসিক বৈকল্যদের পাশবিক বর্বরতার শিকার হচ্ছে শিশুরা। তারা বলছেন, টেলিভিশনের মতো গণমাধ্যমে বিনোদনের নামে প্রতিনিয়ত ক্রাইম সংক্রান্ত বিষয় গুরুত্ব সহকারে দেখানোয় সমাজে অপরাধ প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে। এমন ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, অক্সফোর্ড স্কুলে যে ঘটনাটা ঘটেছে তাতে আমার প্রাণের সম্পদ, কলিজার টুকরার জীবন নষ্ট করে দিয়েছে মাস্টার নামে কলঙ্করা। শিক্ষকরা এখন ধান্দাবাজিতে ব্যস্ত। কী ভাবে সভাপতিকে ম্যানেজ করবে, কী ভাবে ইনকাম করতে পারবে এসব নিয়ে ব্যস্ত। শহীদ দিবস, মাতৃভাষা দিবস এসব নিয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যাথা নাই। সে জানে যদি একজন সভাপতিকে তেল মারতে পারে। একজন জসিম উদ্দিনকে তেল মারতে পারলে, সে যা দুই নাম্বারি করবে তার কোনো ভয় নাই, কোনো সমস্যা নাই। কারণ তার হাতে সভাপতি আছে। তিনি এসব ঘটনার জন্য মায়েদের দায়ী করেন।

তিনি বলেন, ওই মায়েরাই কিন্তু ধাক্কা দিয়ে নিয়ে প্রাইভেট, কোচিং এর মধ্যে ঢুকিয়েছেন। অথচ এসব শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরীতে আনে না। নারায়ণগঞ্জে প্রত্যেক স্কুলে লাইব্রেরি আছে কিন্তু লাইব্রেরির বইগুলো জীবনে ধরা হয় নাই। লাইব্রেরির তালাই খুলে না। তাহলে কী ভাবে ভালো মানুষ গড়বো। মনে রাখতে হবে পড়ার বিকল্প কিছু নাই। আপনারা যে যাই বলেন, ফেসবুক আমাদের মধ্যে রোগের মত দেখা দিয়েছে। ফেসবুকে যত কম থাকবো, তত বেশি ভালো থাকবো বলে মন্তব্য করেন তিনি। সমাজকর্মী সালেহা বেগম মনে করেন, সামাজিক মূল্যবোধ একেবারে শেষ হয়ে গেছে। পারিবারিক নৈতিক শিক্ষার অভাবে আমরা আজ এই পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি। সন্তনকে উপযুক্ত মানুষ করার পরিবর্তে এখন এ প্লাস পাওয়ার ‘ধান্দায়’ অভিভাবকরা অধিক ব্যস্ত। এখান থেকে বেরিয়ে আসাতে সামাজিক প্রতিরোধ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিনোদনের নামে টেলিভিশনে ক্রাইম সিন বেশি দেখানো হচ্ছে।

এতে সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। প্রাপ্ত বয়স্ক নারীদের চেয়ে শিশুরা এখন বেশি হয়রাণির শিকার হওয়ার কারণ হিসেবে সালেহা বেগম বলেন, শিশুরা চিৎকার চেচামেচি করতে পারে না। তাদের সহজেই চকলেটের প্রলোভনে অথবা ভয়ে ঘাবড়ে দেয়া যায়। এজন্য বিকারগ্রস্থরা শিশুদের টার্গেট করছে মন্তব্য করেন এই সমাজকর্মী। উল্লেখ্য গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অক্সফোর্ড হাই স্কুলের বিশ এর অধিক ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত শিক্ষক আশরাফুল আরিফ ও মদদদাতা প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জুলফিকারের বিরুদ্ধে পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষক আশরাফুল আরিফের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন স্কুলের নির্যাতিত সকল ছাত্রীর পরিবার এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অপর মামলাটি দায়ের করে র‌্যাব। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়েরকৃত র‌্যাবের মামলাটিতে অনৈতিক কাজে মদদ দেয়ার অপরাধে প্রধান শিক্ষককেও আসামী করা হয়েছে। আটক শিক্ষক আশরাফুল আরিফের মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ডিভাইস জব্দ করে পঞ্চম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বিশ জনেরও বেশি ছাত্রীকে ধর্ষণ এবং যৌন নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত শিক্ষক এ বিষয় স্বীকার করেছে। এলাকাবাসী জানান, সিদ্ধিরগঞ্জের অক্সফোর্ড হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক আরিফুল ইসলাম গত ৮ বছর ধরে স্কুলটিতে অংক ও ইংরেজী বিষয়ে শিক্ষকতা করে আসছে। চাকরি জীবনে আরিফুল ইসলাম অসংখ্য ছাত্রীকে ব্ল্যাকমেইলিং করে আপত্তিকর ছবি তুলে ধর্ষণ করতে বাধ্য করে। ছাত্রীদের কোচিং পড়ানোর জন্য তার বাসা ছাড়াও স্কুলের পাশে বুকস গার্ডেন এলাকায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। তার স্ত্রী, সন্তান না থাকলেও ফ্ল্যাটে তিনটি খাটছিল বলে জানায় ফ্ল্যাটের দারোয়ান। গত তিনদিন যাবত তার অনৈতিক কর্মকান্ডগুলো এলাকায় প্রচার হতে থাকে। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার বেলা ১১ টায় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী স্কুলে গেলে আরিফুল ইসলাম তার মোবাইলে থাকা আপত্তিকর ছবিগুলো মুছে ফেলে। পরবর্তীতে এলাকাবাসী মোবাইল উদ্ধার করে এলাকার একটি মোবাইল দোকানে একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে ছবিগুলো উদ্ধার করে। এসময় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ক্ষোভে ফেটে পড়ে। পরে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঐ স্কুলে হামলা চালায়। এসময় স্কুলের লম্পট শিক্ষক আরিফুল ইসলাম ও স্কুলের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জুলফিকারকে গণধোলাই দেয়।

গত বছর অক্টোবরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগে অবস্থিত মর্গ্যান গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজী শিক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠনের কর্মীর বিরুদ্ধে সদর মডেল থানায় ছাত্রী লাঞ্ছনার অভিযোগ দায়ের করেছে কলেজ শাখার ছাত্রীবৃন্দ। শিক্ষকের বিরুদ্ধের ছাত্রীদের ডেকে এনে অশালীন কথাবার্তা ও ইঙ্গিত দেবার অভিযোগ তুলেছে ছাত্রীরা। এমনকি এ ধরনের আচরনের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েও সুরাহা পায়নি বলে জানান তারা। অভিযোগ পত্রে লেখা হয়, অভিযুক্ত শিক্ষক ছাত্রীদের ডেকে নিয়ে বাজে ভিডিও দেখার প্রস্তাব দিতেন। এছাড়া অশালীন ভিডিওর সাইট ও লিংক প্রয়োজন হলে তার সাথে যোগাযোগ করতে। এছাড়া বিবাহিত ছাত্রীদের স্বামীদের নিয়ে বাজে মন্তব্য করেন তিনি। এমনকি এমন সব মন্তব্য তিনি ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে করেন যা ভাষায় প্রকাশ যোগ্য নয়। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হলে তিনি ক্লাসে এসে উল্টো বকাবকি করেন এবং অভিযোগকারী ছাত্রীদের নিচু শ্রেনীর মানসিকতার অধিকারী বলে অভিহিত করেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments