সঙ্কট কাটছে না ছাত্রদলের

268

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা শেষই হচ্ছে না। কমিটি গঠনে সাবেক ছাত্রনেতাদের সমন্বয়ে গঠিত সার্চ কমিটি ও স্থায়ী কমিটির নেতাদের দায়িত্ব দেয়ার পরও কাটছে না জটিলতা। কাউন্সিলের মাধ্যমে ভোটারদের প্রত্যক্ষ ভোটে অপেক্ষাকৃত তরুণ ছাত্রনেতা নির্বাচিত করতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছেন না কেউই। বরং যাদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন সেই দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্চ কমিটি কাউন্সিলের তফসিল ঘোষণা করার পরও তা স্থগিত করেছেন। ছাত্রদলের বিগত কমিটির একটি পক্ষের বিরোধিতার মুখে একটি মনোনয়ন ফরমও বিক্রি করেনি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি। সঙ্কট সমাধানে স্থায়ী কমিটির দু’জন নেতাকে দায়িত্ব দেয়া হলেও এখনো সুরাহা হয়নি। উল্টো ওই দু’জনসহ বিএনপির তিন নেতা সরে দাঁড়িয়েছেন। এতে স্থগিত হয়ে আছে কাউন্সিলের কার্যক্রম ও বিক্ষুব্ধদের দাবি করা আহ্বায়ক কমিটিও। যদিও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। কিন্তু সঙ্কট সমাধানের দ্বারপ্রান্তে গিয়েও অজ্ঞাত কারণে ঝুলে আছে সব। এখন সবাই তাকিয়ে আছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে। এদিকে, আহ্বায়ক কমিটির দাবিতে অনড় আন্দোলনকারীরা দাবি আদায়ে ফের আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

বিএনপি সূত্রে জানা যায়, ছাত্রদলকে অপেক্ষাকৃত তরুণ ও ছাত্রদের হাতে দায়িত্ব তুলে দিতে চায় তারেক রহমান। এর প্রাথমিক উদ্যোগ হিসেবে এবার ছাত্রদলের কমিটি গঠনে একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা বেধে দেয়া হয়। যা পরবর্তীতে আরও কমিয়ে নিয়মিতদের হাতে দেয়ার ইচ্ছাপোষণ করেছেন তিনি। এজন্য ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে দিয়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয় বিএনপি। গত ৩ জুন আগের কমিটি বিলুপ্ত করে ৪৫ দিনের মধ্যে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয় দলটি। তবে কাউন্সিলের ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে ছাত্র সংগঠনটিতে। নতুন কমিটি গঠনে ২০০০ সাল কিংবা তার পরবর্তী সময়ে এসএসসি/সমমান উত্তীর্ণ বয়সসীমা নির্ধারণ করে দেয়ায় বাদ পড়ছেন এতোদিন সক্রিয় থাকা বড় একটি অংশ। এরপর থেকেই দলের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছেন তারা। বয়সসীমা বাতিল করে ধারাবাহিক কমিটির দাবিতে নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বেশ কয়েকটি বিক্ষোভ ও বিএনপির সিনিয়র নেতাদের লাঞ্ছিতও করেছেন তারা। একারণে আন্দোলনকারী ১২জন ছাত্রনেতাকে বহিষ্কারও করা হয়। অন্যদিকে কাউন্সিল আয়োজনের জন্য ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের সমন্বয়ে তিনটি কমিটি করে দেয়া হয়। এই কমিটি ১৫ জুলাই ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করে তফসিলও ঘোষণা করে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের হুমকী-ধামকির মুখে একটি মনোনয়ন ফরমও বিক্রি করতে পারেনি। সঙ্কটের অজুহাতে বন্ধ করে দেয়া হয় কাউন্সিলের কার্যক্রম।

সংগঠনের এরকম অবস্থায় সংকট সমাধানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে দায়িত্ব দেন তারেক রহমান। দায়িত্ব পাওয়ার পর তারা আন্দোলনকারীসহ ছাত্রদলের কমিটি গঠনের জন্য গঠিত সার্চ কমিটির নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে সমাধানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছান। আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা দলের সিদ্ধান্তের অবস্থান ধরে রাখতে ছাত্রদলের কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াকে সমর্থন জানান। কাউন্সিলের মাধ্যমে এসএসসি ২০০০ ব্যাচকে সামনে রেখে সংগঠনের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত মেনে নেন। তবে কাউন্সিল অনুষ্ঠানের আগ পর্যন্ত বিলুপ্ত কমিটির নেতাদের সমন্বয়ে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠনের দাবি জানান। আন্দোলনরত যে কোনো নেতাকে আহ্বায়ক করে কেন্দ্র থেকে কমিটি ঘোষণা করলে তাতে তাদের সবার সম্মতি থাকবে বলেও দলের হাইকমান্ডকে নিশ্চয়তা দেন। স্থায়ী কমিটির ওই দুই সদস্য ইতিবাচক মনোভাবও ব্যক্ত করেন। কিন্তু তারেক রহমান আহ্বায়ক কমিটির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনকারীদের যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলে জায়গা দিতে বলেন বলে একটি সূত্রে জানা যায়। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের অনড় অবস্থানের কারণে এই উদ্যোগ নিয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা আর এগুতে পারেননি এবং দায়িত্ব ছেড়ে দেন। কিন্তু তারেক রহমান তাদেরকে এই সমস্যা সমাধান করতে আহ্বান জানান।

এদিকে, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের সমন্বয়ে গঠিত সার্চ কমিটির নেতাদের মধ্যেও এই নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। বিদ্রোহীদের দিয়ে স্বল্পকালীন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পক্ষে রয়েছেন কয়েকজন। তবে তারেক রহমানের আস্থাভাজন হতে কয়েকজন নেতা বিরোধিতা করছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। এমনকি এই বিদ্রোহকে সার্চ কমিটির কয়েকজন নেতা নিজেদের স্বার্থে ইন্ধনও যুগিয়েছে বলে দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরাই। যারা ইতোমধ্যে নাম প্রকাশ করার জন্য হুমকীও দিয়েছেন। এই অবস্থায় আবারও গতকাল রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে বৈঠক করেছেন বিক্ষুব্ধরা। তারা ১২ নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে স্বল্পকালীন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের দাবিতেই অনড় রয়েছেন। অন্যত্থায় আবারও আন্দোলনে নামার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা যায়। বৈঠকে উপস্থিত ছাত্রদলের এক সাবেক নেতা জানান, সার্চ কমিটির ওপর তাদের আস্থা নেই। তারা চায় স্থায়ী কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই নেতা তাদেরকে সামনে রেখে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক কমিটির প্রস্তাব দিবেন এবং তাকে বাস্তবতা বুঝাবেন। আর তাদের মধ্যে যে কাউকেই স্বল্পকালীন কমিটির দায়িত্ব দেয়া হলে তারা মেনে নেবেন। এই কমিটিই আগামী জানুয়ারি মাসে কাউন্সিলের আয়োজন করবে।

ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক মুন্না বলেন, আমরা চাই সুন্দরভাবে এই সঙ্কটের সমাধান হোক। একটি স্বল্পকালীন আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে আমাদের দীর্ঘদিনের শ্রমকে মূল্যায়ন করা হোক।
জানতে চাইলে সার্চ কমিটির অন্যতম নেতা ও বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, আমরা সমাধানে কাজ করছি। চেষ্টা করছি যতদ্রুত সম্ভব একটা যৌক্তিক সমাধান করে কাউন্সিল করা যায়। আশা করছি সেটি খুব দ্রুতই হবে।

সার্চ কমিটির অন্যতম নেতা বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন বলেন, ক্ষুব্ধ নেতাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা, আগামী দিনে দলের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনেসহ বিভিন্ন পর্যায়ে যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে। কারণ বিক্ষুব্ধরা আমাদের ছোট ভাই। তাদের দলে অনেক ত্যাগ রয়েছে, মামলা-হামলায় তারা জর্জরিত, জেল খেটেছেন। তাদের বিষয়টিও আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি। তাদেরকে নিয়ে আমরা সব কিছু করব। তিনি জানান, ক্ষুব্ধ নেতাদের সঙ্গে কথা বলেই ছাত্রদলের কাউন্সিলের নতুন তারিখ ঠিক করা হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments