হচ্ছে না বৃহত্তর ঐক্য

253

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বিএনপির জাতীয় বৃহত্তর ঐক্য গড়ার ডাকে বাম দলগুলো সাড়া দিচ্ছে না। মতাদর্শগত পার্থক্যের জন্য তারা বিএনপির সাথে বৃহত্তর ঐক্য গড়তে আগ্রহী নয়। তারা আলাদাভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে থাকবে। সে ক্ষেত্রে ন্যূনতম ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ বা যুগপথ আন্দোলন হতে পারে। বাম গণতান্ত্রিক জোটের শরিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। বাম নেতারা বলছেন, আমরা চাই বিরোধী দলগুলো মিলে জনগণকে সাথে নিয়ে রাজপথে একটি বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে। রজপথের আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বৃহত্তর ঐক্যের সমীকরণ তৈরি হবে। রাজপথের বাইরে শুধু কাগজে-কলমের বৃহত্তর ঐক্যে তারা বিশ্বাসী নয়।

বর্তমান সরকার সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পর বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ডানপন্থি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে ১৯ দলীয় জোট গঠিত হয়। ২০১১ সালের ৩০ জুন এ জোট গঠনের পর এটি পরবর্তীতে সম্প্রসারিত হয়ে ২০ দলীয় জোটে পরিণত হয়। গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করা হলে জোটের হাল ধরেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর পর সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মির্জা ফখরুলের তৎপরতায় ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এতে ২০ দলীয় জোট অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। বিশেষ করে জামায়াতকে নিষ্ক্রিয় রেখেই বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সক্রিয় করে নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হয়। নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জনমনে বেশ আশার সৃষ্টি করে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্বে দুর্বলতার কারণে ঐক্যফ্রন্ট জনপ্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক ক‚টকৌশলে চরমভাবে পরাজিত হয়েছে ঐক্যফ্রন্ট।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর ২০ দলীয় জোট এবং ঐক্যফ্রন্টে টানাপড়েন দেখা দেয়। সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে ২০ দলীয় জোট থেকে আন্দালিব রহমান পার্থ বেরিয়ে যান। অন্য দিকে কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ নামে আলাদা জোট গঠন করেছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। এর মধ্যে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী গত ৭ জুলাই ঐক্যফ্রন্ট ছেড়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এ অবস্থায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনের বিষয়টি বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর থেকে বিএনপি সর্বদলীয় রাজনৈতিক ঐক্য গড়ার চেষ্টা করছে। তবে জামায়াত সংশ্লিষ্টতার কারণে প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারার দলগুলো বিএনপির সাথে ঐক্য গড়তে আপত্তি করেছে। এবার জামায়াতকে নিষ্ক্রিয় রেখে বিএনপি বাম প্রগতিশীল দলগুলোকে পাশে চাচ্ছে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন ইস্যুতে সর্বদলীয় ঐক্যের মাধ্যমে আন্দোলন গড়ে তুলতে চায় বিএনপি। এ ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যজোটের সাথে বাম গণতান্ত্রিক ঐক্যজোটকে পাশে চাচ্ছে তারা। বাম গণতান্ত্রিক জোটে আছেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, শাহ আলম, কমরেড খালেকুজ্জামান, রুহিন হোসেন প্রিন্স, মোশাররফ হোসেন নান্নু, সাইফুল হক, রাজেকুজ্জামান রতন, জোনায়েদ সাকি প্রমুখ নেতারা। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দুই শীর্ষ নেতা জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীকে দায়িত্ব দেয়া হয় বামদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলার।

জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বর্তমানে অসুস্থ থাকায় গণফোরাম নেতা অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী এরই মধ্যে বাম গণতান্ত্রিক জোটের শরিক দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, আমরা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কলেবর আরো বাড়ানোর চেষ্টা করছি। ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম প্রধান শরিক বিএনপির সম্মতি নিয়ে বাম গণতান্ত্রিক জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনাও হচ্ছে। বর্তমান সরকারের অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য যারাই আন্দোলন করছেন, তাদের সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমরা বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে চাই।

বাম গণতান্ত্রিক জোটের শীর্ষ নেতারা বলছেন, দেশে এখন চরম স্বৈরাচারী শাসন চলছে। কোথাও কোনো গণতন্ত্র নেই। গত বছর ৩০ ডিসেম্বর যে ভোট ডাকাতির নির্বাচন হয়েছে তাতে গণতন্ত্রের কবর রচিত হয়েছে। বর্তমান এই স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যারা রাজপথে আন্দোলন করবেন, তাদের সাথে আন্দোলনের পথ ধরেই ঐক্য হতে পারে।

এ বিষয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ইনকিলাবকে বলেন, আমরা মনে করি গত বছর ৩০ ডিসেম্বর ভোট ডাকাতির নির্বাচনের পর দেশে কতৃত্ববাদী সরকারের শাসন চলছে। এই চরম স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে জনগণ ও বিরোধী দলগুলো মিলে রাজপথে একটা বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব। বাম গণতান্ত্রিক জোট বেশ কিছু দাবি নিয়ে রাজপথে আন্দোলন করছে। এ দাবির অনেকগুলোর সাথে অনেকে একমত। আমরা চাই, কমন কিছু দাবিতে সবাই রাজপথে আন্দোলনে এলে একটি ঐক্যের সুর তৈরি হবে। সে ক্ষেত্রে একসঙ্গে এক জোটে না থেকেও যুগপথ আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব। একই দাবিতে রাজপথে নামলে সেখানেই একটি ঐক্যের সমীকরণ গড়ে উঠবে।

এ বিষয়ে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি ইনকিলাবকে বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে বৃহত্তর ঐক্যের এখন পর্যন্ত আমরা কোনো প্রস্তাব পাইনি। তবে পত্র-পত্রিকায় দেখেছি বামদের নিয়ে তারা সরকারবিরোধী আন্দোলনের বৃহত্তর ঐক্য করতে চায়। আমরা বলেছি যে, বেশ কয়েকটি দাবিতে ইতোমধ্যে আমরা রাজপথে আন্দোলন করছি। এর মধ্যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে দ্রæত নতুন নির্বাচনসহ কয়েকটি দাবির সাথে বিএনপি এবং অন্যান্য অনেক দলের দাবির মিল রয়েছে। এসব কমন দাবিতে রাজপথে আন্দোলনের একটা ঐক্য তো হতেই পারে। আর্থাৎ আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমেই ঐক্যের নতুন সমীকরণ তৈরি হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments