হাতের ইশারাই ভরসা

181

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজধানীর ব্যস্ততম সিগন্যাল বিজয় সরণি। গুরুত্বপূর্ণ আটটি সড়ক এসে মিশেছে এ সিগন্যালে। প্রতিটি সড়কের মুখেই রয়েছে লাল, সবুজ ও হলুদ বাতি। রয়েছে টাইম কাউন্টডাউন যন্ত্রও। সবকিছু থাকার পরও সেখানে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায়। শুধু বিজয় সরণির সিগন্যালেই নয়, এমন চিত্র রাজধানীর গুলশানের দু’টি বাদে সব সিগন্যালেই। পুলিশ বলছে, প্রকল্প শেষ হলেও এখনো সিগন্যাল বাতির নিয়ন্ত্রণ তাদের বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। যে কারণে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের হাতের ইশারাই এখনও ভরসা।

জানা গেছে, রাজধানীর যান চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে ২০১৫ সালের ১৭ মে পরীক্ষামূলকভাবে কাকলী থেকে শাহবাগ পর্যন্ত ১১টি পয়েন্টে অটোসিগন্যাল চালু করা হয়। তবে যানজটের শঙ্কায় চালুর পরপরই এগুলোর ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়।

২০১৮ সালের শুরুতে নতুন করে হাতে নেয়া হয় আরো একটি প্রকল্প। নতুন এ প্রকল্পে আগের মতো যন্ত্রনির্ভর না হয়ে যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ট্রাফিক পুলিশের হাতে রাখার কথা বলা হয়। সড়কে গাড়ির চাপ বুঝে রিমোটের সাহায্যে ট্রাফিক পুলিশ নিজেই পরিবর্তন করতে পারবে সিগন্যালের ব্যাপ্তি। তবে সেই প্রকল্প শেষ হলেও কার্যকর না থাকায় কোনো সুবিধাই পাচ্ছে না রাজধানীবাসী। রাজধানী ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ চলছে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় চলে গাড়ি। এতে করে কোনো পয়েন্টে একবার গাড়ি আটকালে তা কখন ছাড়া হবে তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক পুলিশের ওপর। তিনি ইশারা না দিলে গাড়ি চলে না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ট্রাফিক পুলিশ তাদের খেয়ালখুশি মতো রাস্তার একদিক আটকে রেখে আরেক দিক যান চলাচলের জন্য খুলে রাখে। এতে করে যানজট যেমন বাড়ে তেমনি মানুষের ভোগান্তিও বাড়ে। ভুক্তভোগীদের মতে, সিগন্যাল বাতি সচল থাকলে এমন অবস্থা হতো না।

ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি বছর প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয় করছে দুই সিটি করপোরেশন। তারপরও কাজে আসছে না এ সিগন্যাল বাতি। বছর বছর বড় অংকের অর্থ ব্যয় করেও এখনো হাতের ইশারায় নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে যানবাহন। এ অবস্থায় সিগন্যাল বাতির পেছনে ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে রাজধানীতে সিগন্যাল বাতি রয়েছে ১০০ পয়েন্টে। এর মধ্যে উত্তরে পড়েছে ৬০টি। বাকি ৪০টি দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। ২০০৪ সালের পর থেকে বিভিন্ন সময় এসব বাতি স্থাপন হয়েছে। সিগন্যাল বাতির পাশাপাশি স্থাপন হয়েছে ‘টাইমার কাউন্টডাউন’ যন্ত্র। এসব খাতে ব্যয় হয়েছে অর্ধশত কোটি টাকার ওপরে।
স্থাপন করার পর থেকে বাতিগুলো সচল রাখতে প্রতি মাসে মোটা অংকের অর্থ খরচ করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি পয়েন্টে সিগন্যাল বাতির বিদ্যুৎ বিল, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে মাসে ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ঢাকার সিগন্যাল বাতিগুলোর পেছনে মাসে ১ কোটি টাকা ব্যয় হলে বছর শেষে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ কোটি টাকা। মাসে কোটি টাকা ব্যয় হলেও এসব সিগন্যাল বাতি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কোনো কাজে আসছে না। এতে করে প্রায় পুরো টাকাই গচ্চা যাচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের এক অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, সিগন্যাল বাতিগুলো তত্ত্বাবধান করে সিটি করপোরেশন। যদিও বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এ দায়িত্ব ট্রাফিক পুলিশই পালন করে থাকে। বাতির মাধ্যমে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এ দায়িত্ব শতভাগ ট্রাফিক পুলিশের কাছেই হস্তান্তর করতে হবে। তবেই এ খাতের বাড়তি ব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব।

ঢাকার রাস্তায় ব্যাপকভিত্তিক ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন শুরু হয় ২০০৪ সালের পর থেকে। ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের আওতায় ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয় ৫৯টি সিগন্যাল বাতি। ২০০৯ সালে বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট (কেস) প্রকল্পের আওতায় স্থাপন করা হয় ১০০টি স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সঙ্কেত ব্যবস্থা। তবে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এসব সিগন্যাল বাতি কোনো কাজেই আসেনি। সিগন্যাল বাতির ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভিজ্ঞতা, অর্থ ও দক্ষতার অভাবে এসবের সুফল পায়নি রাজধানীবাসী। যে কারণে হাতের ইশারাতেই যান নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে এখনো।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীর ট্রাফিক সিগন্যাল বাতির পেছনেই এখন পর্যন্ত ১০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ হয়েছে। এর বাইরে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে ২৫ কোটি টাকায় সাতরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ইউলুপ নির্মাণ করেছে ডিএনসিসি। ১৬৫ কোটি টাকায় শাহবাগ, শেরাটন, বাংলামোটর ও সোনারগাঁও ইন্টারসেকশনে আন্ডারপাস নির্মাণের আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকার চারটি সিগন্যালে স্থাপন করা হচ্ছে ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক সিস্টেম (আইটিএস)। ফ্লাইওভার, সড়ক, ইউটার্ন, ইন্টারসেকশন, ফুটপাথ, ড্রেন, মেট্রোরেল, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট, রেলপথ, বৃত্তাকার রেলপথ, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নে গত ১০ বছরে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে সরকার।

আস/এসআইসু

Facebook Comments