আনসারের কৌশলের কাছে পুলিশের হার

22

দেশবার্তা ডেস্ক:কোন সন্দেহ নেই বডি কনটাক্টের যত খেলা আছে তাদের মধ্যে কাবাডি হচ্ছে অন্যতম রোমাঞ্চকর খেলা। শুক্রবার কাবাডি স্টেডিয়ামে গিয়ে তেমনই রোমাঞ্চের পরিপূর্ণ স্বাদ পাওয়া গেল বাংলাদেশ গেমসের মহিলা কাবাডির ফাইনাল ম্যাচটি দেখতে গিয়ে। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে বাংলাদেশ আনসার মাত্র ১ পয়েন্টের ব্যবধানে প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ পুলিকে হারিয়ে স্বর্ণপদক জেতে। খেলার স্কোরলাইন ছিল ১৫-১৪। পুলিশ দলকে রৌপ্যপদক নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এছাড়া পুরুষ কাবাডির ফাইনালে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ২৪-২২ পয়েন্টে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে হারিয়ে স্বর্ণ জেতে।

৩০ সেকেন্ড সময় পাওয়া যায় প্রতিপক্ষের সীমানায় ঢুকে তাকে বা তাদের ‘মেরে’ (ছুঁয়ে) নিজের কোর্টে ভালয় ভালয় ফিরে আসার। বেশিরভাগ আক্রমণের বেলাতে প্রতিপক্ষকে মারা সম্ভব হয় না। তবে ‘ডু অর ডাই’ পার্টে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। কেননা এই পর্বে রেইডারকে অবশ্যই প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়কে ছুঁতে হবে, নইলে প্রতিপক্ষ দল পয়েন্ট পাবে। আর ছুঁতে পারলে নিজ দলের পয়েন্টের ভান্ডার সমৃদ্ধ হবে। রেইডারকে যখন ক্যাচাররা একযোগে ঠেসে ধরেন বা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন তখন রেইডার তাদের ফাঁকি দিয়ে নিজের সীমানার দাগ ছুঁতে পারলে কেল্লাফতে, নয়তো তাকে ‘মরতে’ (আউট হওয়া) হয় অবধারিতভাবে।

এমন দৃশ্যগুলোই কাবাডি স্টেডিয়ামে প্রাণভরে উপভোগ করলেন দর্শকরা (এদের অধিকাংশই ছিলেন ফাইনালিস্ট দলগুলোর হয়ে চাকরি করা সদস্যরা)। মহিলা বিভাগের ফাইনালটি ছিল বেশি উপভোগ্য। শুরুতে ম্যাচের প্রথম পয়েন্টটি আনসারই পায়। প্রথমার্ধে তারা ৯-৬ পয়েন্টে এগিয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে পুলিশের মেয়েরা ভাল খেলে ঘুরে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে তারা পয়েন্ট সমানও করে ফেলে (১২-১২)। খেলায় সৃষ্টি হয় টানটান উত্তেজনা। তবে কৌশল অবলম্বন করে খেলে পুলিশ ন্যূনতম ব্যবধানে এগিয়ে লিড ধরে রাখে। স্কোরলাইন হতে থাকে ১৩-১৩, ১৪-১৩। খেলার আর মাত্র এক মিনিট বাকি। এমন সময় আনসারকে ‘ডু আর ডাই’ পার্টে যেতে হয়। কিন্তু তাতে তারা ব্যর্থ হলে পুলিশ আবারও সমতায় ফেরে (১৪-১৪)। এবার পুলিশের ‘ডু আর ডাই’ খেলার পালা। কিন্তু তাদের খেলোয়াড় বৃষ্টি আনসারের ক্যাচারদের হাতে বন্দী হন। ১৫-১৪ পয়েন্টে এগিয়ে যায় আনসার। তাদের খেলোয়াড় টুকটুকি যখন পুলিশের কোর্টে দম নিয়ে ঢুকে আক্রমণে যান খেলার মাত্র দশ সেকেন্ড বাকি ছিল। কোচের নির্দেশ অনুযায়ী টুকটুকি আক্রমণের কোন চেষ্টাই করেননি, স্রেফে ওই সময়টা কোনমতে পার করে দিতেই রেফারি খেলা শেষের বাঁশি বাজান। জিতে যায় আনসার। শুরু হয়ে যায় তাদের বাঁধনহারা উল্লাস। অপরদিকে পুলিশের শারমিন কোর্টে উপুড় হয়ে লুটিয়ে আকুল নয়নে কাঁদছেন। তার সঙ্গীরাও তাই। আনসার দল তাদের সবাইকে সান্ত¡না দিয়ে দলীয় পতাকা নিয়ে ফটোসেশন করে পুরো মাঠ দৌড়ে প্রদক্ষিণ করল। দলীয় পতাকা ছিল কচি রানী মন্ডলের হাতে, যিনি আগেরদিনই উশুর অনুর্ধ-৭০ কেজিতে সোনা জিতেছেন। বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন তিনি।

খেলাশেষে কথা হলো আনসারের অধিনায়ক ও তারকা খেলোয়াড় শাহনাজ পারভীন মালেকার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দলের জয়ে দারুণ খুশি। একটা গুঞ্জন ছিল যে আজ নাকি ম্যাচশেষে আমি অবসর নেব। এটা ঠিক নয়। আমি ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছি। তবে ঘরোয়াভাবে খেলে যাব। আনসারের স্যাররা আমাকে বলেছেন খেলা চালিয়ে যেতে। যেহেতু আনসারে চাকরি করি, তাই আমাকে তো খেলতেই হবে। যতদিন ফিট থাকব, ফর্ম থাকবে ততদিনই আমি আনসারের হয়ে খেলে যেতে চাই। আনসারের হয়ে যে খেলব, এ জন্য কিন্তু আমার ওপর কোন চাপ প্রয়োগ করা হয়নি। আমি নিজের ইচ্ছেতেই খেলছি।’

আনসারের কোচ আশরাফুল আলম দুলু বলেন, ‘দলের স্বর্ণপদক জয়ে আমি হ্যাপি। আনসার আমাকে কোচ হিসেবে যথেষ্ট সম্মান ও মূল্যায়ন করেছে। আমি পুলিশ টিমে ৩২ বছর কাবাডি খেলেছি। এই দলের এবং জাতীয় দলেরও অধিনায়ক ছিলাম। সেই পুলিশ দলকেই আজ আমার দল আনসারের মেয়েরা ফাইনালে হারিয়েছে, এটা দারুণ ব্যাপার। দলকে এক মাস ধরে অনুশীলন করিয়েছি। মেয়েরা অনেক সুশৃঙ্খল ছিল, অনেক পরিশ্রমও করেছে তারা। সেটারই ফল আজ পেল তারা। নিশ্চিত ছিলাম যদি আমার মেয়েরা টেকনিক্যাল কোন ভুল না করে তাহলে তারাই জিতবে এবং সেটাই হয়েছে। তাছাড়া দলের চার খেলোয়াড় জাতীয় দলে খেলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন থাকায় আমার একটা আত্মবিশ্বাসও ছিল।’

বাংলাদেশ আনসার মহিলা কাবাডি দলের খেলোয়াড়রা হলেন- শাহনাজ পারভীন মালেকা, রূপালী আক্তার, কচি রানী ম-ল, ফাতেমা আক্তার পলি, দিশা মনি সরকার, টুকটুকি আক্তার, মুসলিমা আক্তার, লুবা আক্তার, সোনিয়া আক্তার, স্মৃতি আক্তার, লিমা আক্তার।

Facebook Comments Box