কামাল-ফখরুল ঐক্যে ফাটল

269

আলোকিত সকাল ডেস্ক

দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে খালেদা জিয়া। এদিকে সংসদকে অবৈধ বলে এখন ড. কামাল হোসেন ও মির্জা ফখরুলের অনুগত ব্যক্তিরাই সংসদে!

যে সংসদকে অবৈধ ঘোষণা দিয়েছিলো ঐক্যফ্রন্ট, সেই সংসদের ভিডিও ফুটেজ ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির দলীয় পেজ ও গ্রুপগুলোতে এখন লাইভ সমপ্রচার চলে।

নির্বাচনের পর থেকে বিএনপির ঘরে যেমন বড় দূরত্ব তৈরি হয়েছিলো, দীর্ঘ সময় স্থায়ী কমিটির নেতারাও একে অপরের মুখোমুখি হয়নি তেমনি আন্দোলনের কর্মসূচি না থাকায়

ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষরাও আর কামাল-ফখরুলের ডাকে সাড়া দিচ্ছেন না। একটেবিলে বসে আর সরব আলোচনা হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার সঙ্গে ড. কামাল হোসেন ও মির্জা ফখরুলের যে ওয়াদা ছিলো তা ভঙ্গ হয়েছে।

খালেদা জিয়াকে দেয়া ওয়াদা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে এ দুই ব্যক্তি। বিএনপির আদর্শবাদীদের দাবি, কামাল-ফখরুল কেউ বিএনপির আদর্শের নয়।

ফখরুল বাম রাজনীতি থেকে হুট করে জাতীয়তাবাদী চরিত্র গ্রহণ, অন্যদিকে ড. কামাল তো অনেক আগ থেকেই আওয়ামী সংসারের লোক হিসেবে পরিচিত।

আদর্শের অমিল থাকায় কেউ খালেদা জিয়াকে দেয়া ওয়াদা সঠিকভাবে পালন করেনি বলে দাবি উঠেছে।

তাই ফখরুলের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতাদের। অন্যদিকে ড. কামালের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে তারই অনুগত অনুসারীদের।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একদিকে বিএনপি শক্ত রাজনীতির শক্তি হারিয়েছে অন্যদিকে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেয়া ওয়াদা পালন না করায় ঐক্যফ্রন্টের ক্ষমতায়ও শ্যাওলা জন্মেছে।

ঐক্যফ্রন্টের অনেকেরই প্রশ্ন— ৩০ তারিখে তো দেশে ভোট হয়নি, ভোট ডাকাতি হয়েছে ২৯ তারিখে।

কিন্তু ৩০ তারিখ সকাল বেলা মির্জা ফখরুল কেন বললেন যে, ভোট ভালো হচ্ছে? ওই নির্বাচনকে ওইদিনই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বচ্ছতার সনদ দিলেন তিনি। দলের মহাসচিব কেন দুপুর পর্যন্ত বুঝতে পারেননি যে ভোট খারাপ হচ্ছে।

এছাড়া ভোটের দৃশ্যপট খারাপ হলে আন্দোলনের রূপরেখা ছিলো, টানা একসপ্তাহ হরতাল দেয়ার। ঢাকার বড় কোনো জায়গায় বৃহৎ অবস্থান কর্মসূচি পালনেরও কথা ছিলো।

৩০ তারিখের পর ছয় মাস পার হয়ে গেল এখনো কেন একটাও কর্মসূচি দেয়া সম্ভব হয়নি।

এছাড়া নির্বাচনের আগে কেবল ঢাকাতেই অন্তত ৭-৮টি সমাবেশ করার কথা ছিল। কেন বিএনপি এর উদ্যোগ নিতে পারেনি। দলের ভেতরে বাইরে প্রশ্ন রয়েছে।

এখনকার স্থায়ী কমিটির সদস্যরা যদি আন্দোলন না চান, তাহলে খালেদা জিয়ার প্রতি ওয়াদা কি রক্ষা হলো।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপ হলো, সংলাপে প্রতিশ্রুতি দেয়া হলো যে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হবে না কিন্তু নির্বাচনের দিনও নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হয়েছে।

প্রতিবাদ কেন করা হলো না? সংগঠন গুছিয়ে আন্দোলন করার কথা খালেদা জিয়ার সঙ্গে এমন ওয়াদা ছিলো না।

সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান শপথ নেয়ার পর বিএনপির মহাসচিব তাদের বেইমান, বিশ্বাসঘাতক বলেছিলেন। এরপর জানালেন তার দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংসদে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এর ফলে আন্দোলনের গতি নষ্ট হয়েছে।

খালেদা জিয়াকে দেয়া ওয়াদা পূরণে ঐক্যফ্রন্ট পুরোপুরিভাবেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

এর ফলে বিএনপিতেও দূরত্ব বেড়েছে তেমনি ঐক্যফ্রন্ট নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকীর আল্টিমেটামেও স্পষ্ট হয়ে গেছে ঐক্যফ্রন্টের আর ভালো সময় যাচ্ছে না।

গত ৮ জুন জেএসডি সভাপতি আসম আবদুর রব একটি বিশেষ বৈঠক ডাকলেও নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার অসম্মতিতে সেটি বাতিল হয়ে যায়।

বিষয়টি নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের দাবি, আগে বিএনপিকে ঠিক হতে হবে, তারপর ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক।

এদিকে কাদের সিদ্দিকী তার অবস্থানে অনড়। ড. কামাল হোসেনের অনুরোধে তিনি জোট ছাড়ার ঘোষণা দিতে সময় নিচ্ছেন। বিএনপিও আছে সংকটে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট না বিশ দলীয় জোট কাকে বেশি প্রাধান্য দেবে- এ নিয়েও দলটির ভেতরে চরম দ্বন্দ্ব কাজ করছে। ঘর ও জোট সামলাতে ব্যস্ত বিএনপি।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ড. কামাল হোসেনের কিছু দাবি। তিনি জামায়াতে ইসলামী ইস্যুতে বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করার দাবি জানিয়ে আসছেন নির্বাচনের সময় থেকেই। এসব নিয়ে এক ধরনের লেজেগোবরে অবস্থা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে।

শরিক দলের নেতাদের অভিযোগ, জোটের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতির সঙ্গে বাস্তব অবস্থার তেমন মিল নেই।

নেতারা এক ধরনের বক্তব্য দেন, কর্মীরা সে অনুযায়ী চলেন না। ফলে জোট ফলপ্রসূ হচ্ছে না। এর পেছনের কারণ হচ্ছে, একে অপরের প্রতি সন্দেহ-অবিশ্বাস। কেউ কাউকে সেভাবে বিশ্বাস করছেন না বলেই এগোতে পারছে না জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

ঐক্যফ্রন্টের শরিক একটি দলের নেতা বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও নির্বাচনের অংশ হিসেবে ভোটের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ে উঠলেও শুরু থেকেই এ জোটে সমন্বয়হীনতা ছিল। ছিল আস্থার সংকট।নেতারা এক মঞ্চে বসলেও কেউ কাউকে বিশ্বাস করতেন না। এমনকি কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েও স্থির থাকতে পারতেন না।

বিশেষ করে আসন ভাগাভাগি, জামায়াতে ইসলামীকে বিএনপির আসন ছাড় দেয়া- এসব ইস্যুতে ভোট চলার সময়ই সংকট তৈরি হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে।

নির্বাচনের পর এ সংকট আরও বাড়তে থাকে শপথ নেয়া না নেয়াকে কেন্দ্র করে। আর এসব কারণে কর্মসূচি দিয়েও শেষ মুহূর্তে পিছু হটে তারা।

তবে গণমাধ্যমকে এ সংকট সাময়িক বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, আমরা একটি অর্থবহ নির্বাচন চেয়েছি। মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে নির্বাচনের আগে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি।

এক সঙ্গে নির্বাচনও করেছি। কিন্তু ভোটের নামে যা হলো তা কারো কল্পনায়ও ছিল না। ভোটাধিকার নিয়ে এতবড় প্রহসন- এর আগে কখনো এ দেশে ঘটেনি।

স্বভাবতই এ ঘটনা আমাদের জাতীয় জীবনে একটি বড় ধাক্কা। এ ধাক্কা সামলিয়ে উঠে নতুন করে পথ চলতে একটু তো সময় লাগবেই।

তিনি আরও বলেন, এ অবস্থা থেকে উত্তরণে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের ঐক্যকেও সুসংহত করতে হবে।

অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে বর্তমান সরকারকে বাধ্য করতে হবে।

ড. কামাল হোসেন বলেন, নির্বাচনের পর আমরা কয়েক দফা বৈঠক করেছি। আরও বসব। আমরা সবাই মিলে আমাদের পরবর্তী করণীয় ঠিক করব।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার কিভাবে ক্ষমতায় আছে দেশের মানুষ তা জানে। তারা একটি অর্থবহ পরিবর্তন চায়।

এ চাওয়া আগেও ছিল, কিন্তু পূরণ হয়নি। আগামীতে যাতে আমরা মানুষের চাওয়া পূরণ করতে পারি, সে লক্ষ্যে কর্মসূচি ঠিক করা হবে।

তার অনুসারীরা এ সংসদে গিয়ে কেন তাহলে সরকারকে বৈধতা দিলেন, এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

ঐক্যফ্রন্টের শরিক নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ঐক্যফ্রন্ট কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, বিষয়টি ঐক্যফ্রন্টের বড় দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি নির্ভর করছে বিএনপির ওপর।

পাঁচ মাস নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকলাম, সে নিষ্ক্রিয়তা ভাঙতে পারে বিএনপি। তারা কোনো কারণেই হোক উদ্যোগ নিচ্ছে না। আশা করি, বিএনপি দ্রুত এগিয়ে আসবে।

ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির অন্যতম সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, নির্বাচনের সময় কামাল হোসেন নামেননি, এমন অভিযোগ কেউ করে থাকলে তা ঠিক নয়।

বরং বিএনপি মাঠে নামেনি। তারা ঘরে বসে ছিল। পুরনো কাসুন্দি আর ঘাঁটতে চাই না, এখন তাদের মনোযোগ দেয়া দরকার খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বিএনপির সমস্যার পেছনে যতখানি তারেক রহমানের দায়, তার চেয়ে বেশি স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। তারা তো তাকে কিছু বলছেন না। তারা বলুক।

তারেক রহমান তাদের না চাইলে তারা পদত্যাগ করুক। দলের বর্ধিত সভা ডাকা উচিত। নেতাকর্মীরা গালি দিলেও শুনতে হবে। সমস্যা কী? গালি শুনলেই নেতৃত্ব পোক্ত হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments