ছাত্রীদের নিয়ে উৎকণ্ঠা অভিভাবকদের

410

আলোকিত সকাল ডেস্ক

মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে দুটি ঘটনা নারায়ণগঞ্জের নারী শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জে একটি স্কুলে অন্তত ২০ জনেরও বেশী ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে দুই শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে মূল অভিযুক্ত আরিফুল আদালতে স্বীকার করেছে নিজের অপকর্মের কথা। বেরিয়ে এসেছে কিভাবে ছাত্রী থেকে শুরু করে তাদের মায়েদেরও ব্ল্যাকমেইলিং করতো। আরিফুলের ঘটনার পর যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসব ঘটনা ঘটছে তাদের বিষয়গুলোও বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় ফতুল্লার মাহমুদপুর এলাকার বাইতুল হুদা ক্যাডেট মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আল আমিনকে আটক করেছে র‌্যাব-১১। সে নিজেও স্বীকার করেছে অন্তত ১২ জনের বেশী ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও কেউ ভয়ে মুখ খুলে না। আবার কেউ লোকলজ্জার ভয়ে কিছু বলতে পারে না। কেউ বা নিজেদের আত্ম সম্মানের কথা চিন্তা করে। কারণ সিদ্ধিরগঞ্জের ঘটনায় ছাত্রীদের সঙ্গে তাদের মায়েদেরও ফাঁদে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু কোন মা সেটা প্রকাশ করেনি শুধুমাত্র নিজেদের সন্তানের কথা চিন্তা করে। যদিও এলাকার অনেকের কাছেই সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এতে করে আতংকিত হয়ে উঠে অনেকেই।
সিদ্ধিরগঞ্জে অক্সফোর্ড স্কুলের আরিফুলকে গ্রেফতারের পর সেই ঘটনার ভিডিও প্রচার করে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল। সেই সঙ্গে ফেসবুকেও সেটা ছড়িয়ে পড়ে। সেটা দেখেই উদঘাটিত হয় ফতুল্লার ঘটনা।

নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুর এলাকার একজন নারী জানান, তার মেয়ে একটি মাদ্রাসায় পড়ে। আরেক মেয়ে স্কুলে পড়ে। তাদের নিয়ে এখন ওই নারীর চিন্তা।
নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘দুটি ঘটনা আমাদের উদ্বেগে ফেলেছে। সে কারণে আমি মেয়েদের সঙ্গে এসব শেয়ার করেছি। তাদের বুঝানোর চেষ্টা করেছি। তারা নিশ্চিত করেছে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে না। তবুও ভয় কাটছে না। এসব ঘটনা আমাদের বেশ উদ্বেগে ফেলেছে।

এর আগে শহরের দেওভোগে অবস্থিত মর্গ্যান গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজী শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে ছাত্রীদের ডেকে এনে অশালীন কথাবার্তা ও ইঙ্গিত করার। এমনকি এ ধরনের আচরণের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েও সুরাহা না পাওয়ায় সদর মডেল থানায় অভিযোগ দায়ের করে কলেজ শাখার ছাত্রীবৃন্দ। পরবর্তীতে তাকে বাদ দেওয়া হয়।

তাদের অভিযোগ পর পর এমন ঘটনা শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসল চেহারা দেখা দিয়েছে। এমন অনেক ঘটনা এর আগেও ঘটেছে যা প্রতিষ্ঠান এবং এলাকার মোড়লদের খপ্পরে পড়ে ধামাচাপা পড়ে গেছে। এসব ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে সমাজের চরম অবক্ষয় বিরাজমান। যে অবক্ষয়ের অংশে দৃশ্যত বখাটে ও মাদকসেবী যেমন আছে, তেমনি আছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষকরা।

৪ জুলাই সকাল ১১টায় সদর উপজেলার ফতুল্লার মাহমুদপুর ইউনিয়নের মাহমুদপুর এলাকায় থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার মুঠোফোন ও কম্পিউটারে তল্লাশি চালিয়ে পর্নোগ্রাফি ভিডিও পাওয়া গেছে।

গ্রেফতার আল আমিন (৪৫) বাইতুল হুদা ক্যাডেট মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক সহ অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে সে ফতুল্লা এলাকায় একটি মসজিদের ইমাম হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে আসছে।

র?্যাব-১১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলেপ উদ্দিন জানান, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি এলাকার অক্সফোর্ড হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক আরিফুল ইসলামকে ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগে কয়েকদিন আগে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে ২০ এর বেশী ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনার সংবাদ বিভিন্ন টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও বিষয়টি ছড়িয়ে আলোচিত হয়ে উঠে। ফেসবুকে ওই সংক্রান্ত একটি খবর দেখছিলেন বাইতুল হুদা ক্যাডেট মাদ্রাসার এক ছাত্রীর মা। তখন পাশে শুয়ে থাকা ওই মাদ্রাসার তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী তার মাকে বলে, ‘এই শিক্ষক (আরিফুল) গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু আমাদের মাদ্রাসার হুজুরকে কেন গ্রেফতার করা হয় না?’ এ কথা শুনে ওই শিশুর মা জানতে চান, ‘কেন, কী হয়েছে?’ তখন ওই তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী তার মাকে বলে, মাদ্রাসার শিক্ষক আল আমিন মেয়েদের ধর্ষণের চেষ্টা করেছেন। আমার ওই মাদ্রাসায় যেতে ভালো লাগেনা। আমি মাদ্রাসায় আর যাব না। পরে ওই ছাত্রীর মা বিষয়টি র‌্যাবকে জানান। র‌্যাব অনুসন্ধানে নেমে জানতে পারে, ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ওই শিক্ষক মাদ্রাসার ১০ থেকে ১২ জন ছাত্রীকে ধর্ষণ করেন। এ ছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা ও যৌন হয়রানির অভিযোগও পাওয়া গেছে। এরপরই তাকে আটক করা হয়।’

র‌্যাব জানায়, মাদ্রাসার ভেতরে পরিবার নিয়ে থাকতেন আল আমিন। বাসায় তাঁর স্ত্রী না থাকলে বা মাদ্রাসা ছুটি হলে নানা কৌশলে আল আমিন ছাত্রীদের মাদ্রাসায় ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা ও যৌন হয়রানি করতেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই শিশুদের ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা ও যৌন হয়রানির কথা স্বীকার করেছেন।
২৭ জুন সিদ্ধিরগঞ্জে অক্সফোর্ড হাই স্কুলের বিশ এর অধিক ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত শিক্ষক আশরাফুল আরিফ ও মদদদাতা প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জুলফিকারের বিরুদ্ধে পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

চতুর আরিফ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাউকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে, কাউকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে আবার কাউকে ব্ল্যাকমেইল করে দিনের পর দিন তার শয্যাসঙ্গী করেছে। এরমধ্যে কারো বিয়ে হয়ে গেছে, কেউ অবিবাহিত। আবার কেউ মেয়ের সর্বনাশের বিষয়টি টের পেয়ে গোপনে মেয়েকে নিয়ে এলাকা ছেড়েছেন। আবার অনেকেই ঘটনা টের পেলেও লোক লজ্জার ভয়ে চুপ থেকেছেন।

আর এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছে লম্পট আরিফ। শুধু তাই নয়, এ ঘটনায় পাঁচ শিক্ষার্থী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। গোপনে আরিফ তাদের ওষুধ খাইয়ে বাচ্চা নষ্ট করেছে। এখানেই শেষ নয়, ঘটনা যাতে প্রকাশ না পায় এ জন্য আপত্তিকর ভিডিও এবং ছবি সংরক্ষণ করে ভুক্তভোগীকে ভয় দেখিয়ে সম্পর্ক বজায় রাখে আরিফ। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্যই দিয়েছে সে।

র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরিফ জানায়, ২০০৯ সালে অক্সফোর্ড হাইস্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করার পর ২০১৩ সাল পর্যন্ত সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা পেশায় জড়িত ছিল সে। ২০১৪ সালে প্রথম এক ছাত্রীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ায়। ধীরে ধীরে সম্পর্কের তীব্রতা বাড়তে থাকে। এবং দুজন দুজনকে বিয়ে করার চিন্তা করে। পরে আরিফ ওই ছাত্রীর মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তিনি নাকচ করে দেন। এর মধ্যে ওই ছাত্রী মাঝে মাঝে আরিফের বাসায় যেত। এবং প্রায় ৪ থেকে ৫ বার তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়ায় আরিফ। মাঝে একবার ছাত্রীর পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যায়। পরে বড়ি খাওয়ানোর পর পিরিয়ড আবার শুরু হয়। কিন্তু তার মা বিয়েতে রাজি না হওয়ায় তাকে নিয়ে অত্র এলাকা ছেড়ে চলে যায়।

আরিফ জানায়, আরেক ছাত্রী আমার প্রতি অনেক পাগল হয়। আগের কষ্ট ভোলার জন্য তার সঙ্গে রিলেশন করি। যেটা দশম শ্রেণি পর্যন্ত ছিল। এর মাঝে ২ থেকে ৩ বার শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হয় আরিফ। একবার অসচেতনাবশত সেক্স করলে পরের দিন ট্যাবলেট খাওয়াই। এর মাঝে ৯ম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় ওই ছাত্রীরও বিয়ে হয়ে যায়।

আরিফ জানায়, আরো দুই ছাত্রী আমার বাসায় এসে পড়তো। সুযোগ ও সময় পেলে ওদের সঙ্গে শারীরিকভাবে মিলিত হতাম। ২০১৫ সালে তারা বিদ্যালয় থেকে চলে যাওয়ার পর ওদের সঙ্গে আর তেমন দেখা ও কথা হতো না। আরিফ আরো জানায়, এক ছাত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক একেবারে অল্পদিনের। ৪ থেকে ৬ মাসের সম্পর্ক। কিন্তু ও আরেক ছেলেকে ভালোবাসতো বিধায় আমাকে ছেড়ে দেয়। তবে ওর সঙ্গে ১/২ বার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে। আর একবার বিদ্যালয়ের ৩য় তলায় গিয়ে কিছু ছবি তুলি এবং আলিঙ্গন ও কিস করি। ২০১৭ সালের শেষ থেকে এখন পর্যন্ত এক ছাত্রীর সঙ্গে রিলেশন আছে। আমরা একে অপরকে বিয়ের প্রস্তাব দেই। এবং দুজনেই তাতে রাজি হই। কিন্তু ওর বয়স কম হওয়ায় বিয়ে করা সম্ভব হয়নি। যদিও আমাকে অনেকবার চাপ দেয় সে। এই ছাত্রী আমার বাসায় প্রাইভেট পড়তো। তাই ওর সঙ্গে অনেকবার শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হই। ওকে ২ বার ওষুধ খাওয়াই।

মূল্যবোধের অবক্ষয়, সামাজিক অস্থিরতা আর পারিবারিক নৈতিক শিক্ষার অভাবে এমন পাশবিকতার মতো ঘটনা বার বার জন্ম দিচ্ছে বলে বলছেন অভিভাবকরা। এর প্রভাবে কিছু মাদ্রাসার মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও শিশুরা আজ নিরাপদ নয়। সামাজিক প্রতিষ্ঠান স্কুল, কলেজেও মানসিক বৈকল্যদের পাশবিক বর্বরতার শিকার হচ্ছে শিশুরা। তারা বলছেন, টেলিভিশনের মতো গণমাধ্যমে বিনোদনের নামে প্রতিনিয়ত ক্রাইম সংক্রান্ত বিষয় গুরুত্ব সহকারে দেখানোয় সমাজে অপরাধ প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে।

এমন ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, অক্সফোর্ড স্কুলে যে ঘটনা ঘটেছে তাতে আমার প্রাণের সম্পদ, কলিজার টুকরার জীবন নষ্ট করে দিয়েছে মাস্টার নামে কলঙ্করা। শিক্ষকরা এখন ধান্দাবাজিতে ব্যস্ত। কী ভাবে সভাপতিকে ম্যানেজ করবে, কী ভাবে ইনকাম করতে পারবে এসব নিয়ে ব্যস্ত। শহীদ দিবস, মাতৃভাষা দিবস এসব নিয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যাথা নাই। সে জানে যদি একজন সভাপতিকে তেল মারতে পারে। একজন জসিম উদ্দিনকে তেল মারতে পারলে, সে যা দুই নাম্বারি করবে তার কোনো ভয় নাই, কোনো সমস্যা নাই। কারণ তার হাতে সভাপতি আছে।

তিনি এসব ঘটনার জন্য মায়েদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, ওই মায়েরাই কিন্তু ধাক্কা দিয়ে নিয়ে প্রাইভেট, কোচিং এর মধ্যে ঢুকিয়েছেন। অথচ এসব শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরীতে আনে না। নারায়ণগঞ্জে প্রত্যেক স্কুলে লাইব্রেরি আছে কিন্তু লাইব্রেরির বইগুলো জীবনে ধরা হয় নাই। লাইব্রেরির তালাই খুলে না। তাহলে কী ভাবে ভালো মানুষ গড়বো। মনে রাখতে হবে পড়ার বিকল্প কিছু নাই। আপনারা যে যাই বলেন, ফেসবুক আমাদের মধ্যে রোগের মত দেখা দিয়েছে। ফেসবুকে যত কম থাকবো, তত বেশি ভালো থাকবো বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আস/এসআইসু

Facebook Comments