ডেঙ্গু নিয়ে নতুন ভয়

200

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ডেঙ্গু আক্রান্তদের জন্য নতুন ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে হৃদ্যন্ত্র অচল করার মতো মায়োকার্ডিটিসে (সংক্রমণের মাধ্যমে হৃিপণ্ডের পেশির প্রদাহ) আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। ডেঙ্গু জ্বরে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার কারণও এটি হতে পারে বলে মনে করেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ। এর জন্য সাধারণ মানুষের পাশাপাশি চিকিৎসকদের সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক ও বর্তমানে আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পরামর্শক অধ্যাপক ডা. মাহামুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর কারণে মায়োকার্ডিটিসে আক্রান্ত হলে তা খুবই বিপজ্জনক। অনেক চিকিৎসকের পক্ষে তা দ্রুত বুঝে ওঠা কঠিন। তাই এ বিষয়ে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।’

তিনি জানান, ‘চীনে মায়োকার্ডিটিসে আক্রান্ত তিন হাজার মানুষের ওপর গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ১১ শতাংশ ডেঙ্গু থেকে মায়োকার্ডিটিসে আক্রান্ত হয়েছে। এটি আক্রান্তদের মৃত্যু ঘটাতে সক্ষম।’ এমন অবস্থার মধ্যেই দেশে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ ও মৃত্যু।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গেল বছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৪২৮ জন। এর মধ্যে জুনে আক্রান্ত হয়েছিল ২৯৫ জন। মৃত্যু হয়েছিল চারজনের। এ বছর একই সময়ে আক্রান্ত দুই হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে গত মাসে (জুন) আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৭১৩ জন, যা গত বছর জুনে আক্রান্তের প্রায় সাত গুণ বেশি। সরকারি হিসাবে এ বছরের শুরু থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে দেশে আক্রান্ত হয় দুই হাজার ৬৬ জন। এর মধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩২৬ জন। বিশেষজ্ঞরা জানান, এডিস মশা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সেই সঙ্গে ডেঙ্গুর ধরনে পরিবর্তন আসায় মৃত্যু বাড়ছে। এর জন্য ডেঙ্গুর চিকিৎসায় চিকিৎসকদের আরো সতর্ক এবং দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ডেঙ্গুর এই ধরন পরিবর্তন এবং সৃষ্ট নতুন নতুন জটিলতা নিয়ে গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জরুরি বৈঠকও হয়। এতে অংশ নেন বেশ কয়েকজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা আগের গাইডলাইন (নির্দেশিকা) সংস্কারের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি জোর দেন অপেক্ষাকৃত বয়ঃকনিষ্ঠ (জুনিয়র) চিকিৎসকদের অধিকতর প্রশিক্ষণের ব্যাপারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. আয়েশা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। মৃত্যুর খবরও বেশি। আমরা তিনজনের মৃত্যু তালিকাভুক্ত করলেও আরো চারজনের খবর পেয়েছি। তাদের তথ্য যাচাইয়ের জন্য আমরা আইইডিসিআরের কাছে পাঠিয়েছি।

এদিকে গত বছর থেকে দেশে ডেঙ্গুর ধরনে পরিবর্তন আসায় বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগে রয়েছেন।

ভেক্টর বর্ন ডিজিজ নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা এসেন্ডের কান্ট্রি হেড অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, চার ধরনের ডেঙ্গুর (ডিইএনভি-১, ডিইএনভি-২, ডিইএনভি-৩ ও ডিইএনভি-৪) মধ্যে ঠিক কোন ধরনের ডেঙ্গুর প্রকোপ বাংলাদেশে বেশি, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। এখন জ্বর হলে মানুষ যেমন প্রথমে ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার ভয় পায়, তেমনি ডাক্তাররাও তা শনাক্ত করে চিকিৎসা করেন। কিন্তু যার ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে, তা ঠিক কোন টাইপের ডেঙ্গু, তা শনাক্ত করা হচ্ছে না। ফলে ডেঙ্গু পরীক্ষার পাশাপাশি টাইপিংও করতে হবে। না হলে রোগীকে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া যাবে না।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নানামুখী সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ডেঙ্গুর বিষয়টি এখন মানুষ জানে। তবে এর যে গতি-প্রকৃতিতে পরিবর্তন হচ্ছে সে সম্পর্কে সচেতনতা নেই। অনেক চিকিৎসকেরও এ বিষয়ে ভালো ধারণা নেই। ফলে সবাইকে এ ব্যাপারে সচেতন ও সর্তক থাকতে হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বছরের চেয়ে এবার পরিস্থিতি খারাপই বলা যায়। যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের অনেকে এক-দুই দিনের জ্বরে খারাপ অবস্থায় চলে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা এরই মধ্যে বৈঠক করেছি। সব হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের কাছে দিকনির্দেশ পাঠিয়েছি। পুরনো গাইডলাইন নতুন করে প্রকাশ করে সব জায়গায় পাঠানো হয়েছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় গত মার্চ মাসে এডিস মশার জরিপ করতে গিয়ে দেখা গেছে, কিছু এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব পরিমাপে ব্যবহৃত সূচকের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। ওই সময় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নির্মাণাধীন বাসাবাড়ির ছাদে জমানো পানি, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম, বালতি, পানির চৌবাচ্চা, ফুলের টবে এডিস মশার বংশবিস্তার বেশি দেখা যায়। এ রকম এলাকা সম্পর্কে দুই সিটি করপোরেশনকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments