বাবুলের ডিগবাজি ও ফিরে দেখা অতীত

11

দেশবার্তা নিউজ: স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার মামলায় গ্রেফতার হয়ে পুলিশের সাবেক এসপি বাবুল আক্তার ৫ দিনের রিমা-ে হত্যাকা-ে তার সম্পৃক্ততার আদ্যোপ্রান্ত স্বীকার করে গেছেন। শুধু তাই নয়, কর্মজীবনের শুরু থেকে পুলিশের চাকরিতে আসার পর মিতুকে নিয়ে তার জীবনে যা যা ঘটেছে তা সবিস্তারে বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু আদালতে জবানবন্দী দেয়ার কথা বলে তিনি ডিগবাজি খেলেন। ফলে মিতু হত্যাকা-ের তদন্ত শেষ পর্যায়ে এসেও শেষ হলো না। তদন্ত সংস্থা পিবিআই সূত্রে মঙ্গলবার জানানো হয়েছে আজ বা কাল বাবুলকে আবারও রিমান্ডে নেয়ার জন্য আদালতে আবেদন জানানো হবে।

তদন্ত সংস্থা সূত্রে পাঁচদিনের রিমা-ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল স্ত্রীকে হত্যা করার কথা শুধু স্বীকার নয়, সবিস্তারে এর আদ্যোপ্রান্ত বর্ণনাও দিয়েছেন। যা সম্পূর্ণভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি কিছু কিছু বক্তব্য ভিডিও রেকর্ডও করা হয়েছে। কিন্তু আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়ার কথা বলে সেখানে উল্টে যাওয়ার বিষয়টি তদন্ত সংস্থাকে অত বেশি বিস্মিত করেনি। কারণ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়ার কথা বলে তিনি পাশকাটিয়ে যেতে পারেন এমন ধারণাও তদন্ত সংস্থার ছিল। শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়েছে। পিবিআই সূত্রে জানানো হয়েছে, কর্মজীবনে তিনি বিশেষ করে ক্রাইম উদ্ঘাটন নিয়ে কাজ করেছেন এবং নিজে একজন অপরাধ বিজ্ঞানের ছাত্রও বটে। পুলিশে যোগদানের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিমিনোলজি বিভাগে কোর্স সম্পন্ন করেছেন।

রিমা-ে বাবুল যা স্বীকার করেছেন ॥ রিমা-ে বাবুল স্বীকার করেছেন স্ত্রী মিতুকে তিনিই পরিকল্পনা করে হত্যা করিয়েছেন। কোনভাবেই তাকে যেন সন্দেহ করা না হয় সে পন্থাই বেছে নিয়েছেন। তদন্ত সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদে তিনি এও বলেছেন, এ ঘটনা থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য অর্থ এবং প্রভাব প্রতিপত্তির কমতি নেই। আইনী লড়াই চালিয়ে যেতে তিনি সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ইতোমধ্যেই পরিকল্পনাও করে ফেলেছেন।

উল্লেখ্য, গত ১২ মে স্ত্রী হত্যার দায়ে মামলায় প্রধান আসামি হিসেবে অভিযুক্ত হয়ে ওইদিনই তাকে ৫ দিনের রিমা-ে আনা হয়। শুরু হয় পিবিআই’র পৃথক চারটি টিমের টানা জিজ্ঞাসাবাদ। তদন্ত কর্মকর্তাদের ক্রমাগত প্রশ্নের উত্তরে বাবুল আক্তার জানিয়েছেন, তার বাবা ও স্ত্রী মিতুর বাবা পুলিশ বিভাগে চাকরি করতেন এবং দুজনের মধ্যে সখ্যতা ছিল। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করার পর বাবা ও শ্বশুরের ইচ্ছায় মিতুর সঙ্গে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়। বাবুল পিতাকে খুবই ভয় করতেন। পিতার ইচ্ছায় তিনি মিতুকে সামনাসামনি দেখেছেন। এরপরে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর বাসর রাতে তিনি দেখেন মিতুর বাম হাতের কব্জি থেকে কনুই পর্যন্ত পুরো চামড়া কালো রঙে কুচকানো এবং হাড়ের সঙ্গে লাগানো। এটি মিতুর জন্মগত। কিন্তু বিষয়টি বাবুলকে তার পরিবার বা মিতুর পরিবারের পক্ষে কেউ জানায়নি। বিষয়টি ওইদিনই তার মনে ভিন্নভাবে রেখাপাত করে। এরপরও সংসার জীবন শুরু করেন। পুলিশে আসার আগে বাবুল স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরের ঢাকার খিলগাঁওয়ের বাসায় থেকে চাকরি খোঁজা শুরু করেন। প্রথম চাকরি পান বেসরকারী একটি ব্যাংকে। পোস্টিং পান ওই ব্যাংকের নওগাঁ শাখায়। ব্যাংকে যোগ দিয়ে তিনি নওগাঁয় একটি ব্যাচেলর মেসে থাকা শুরু করেন। ব্যাংকের কেউ জানতেন না বাবুল বিবাহিত। চাকরিকালীন ব্যাংক ম্যানেজারের স্ত্রীর প্রতি তার আসক্তি সৃষ্টি হয়। যে কোনভাবে বিষয়টি বাবুলের স্ত্রী জানতে পারেন। মিতু চলে যান নওগাঁয়। সেখানে বিষয়টি তার কাছে তিনি খোলাসা করে বললেও বাবুল স্বীকার করেননি। কিন্তু মিতুর মন থেকে সেটি মুছে যায়নি। পরে তিনি বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পুলিশ ক্যাডারে যোগদান করেন। চলে যান সারদায় ট্রেনিংয়ে। এ পর্যায়ে তিনি স্ত্রীকে খুলনায় শ্বশুরের বাসায় রেখে যান। স্ত্রী মিতু মাঝেমধ্যে খুলনা থেকে রাজশাহীতে বাবুলের সান্নিধ্যে যেতেন। ট্রেনিং শেষে বাবুল পোস্টিং পান ঢাকার মিরপুরে র‌্যাবে। ঢাকায় ছোট একটি বাসা নিয়ে বাবুল নতুন জীবন শুরু করেন। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে প্রায়শ কথা কাটাকাটি চলত। স্ত্রীর হাতের জন্মগত খুঁত-এর প্রসঙ্গটি বাবুল তুললে মিতু তা পরকীয়ার আসক্তির বিষয়টি উঠাত। এভাবেই মূলত তাদের সংসার জীবনে অশান্তির জন্ম নেয়। এরপরও সংসার জীবন চলতে থাকে। পরবর্তীতে তার পোস্টিং হয় চট্টগ্রামে। সিএমপির এসি (কোতোয়ালি) হিসেবে যোগ দেন বাবুল আক্তার। এটা ২০০৫ সালের দিকের ঘটনা। চট্টগ্রামে তার সংসারে জন্ম নেয় পুত্র মাহির। যার বয়স এখন ১২ বছর। সংসারে সন্তান এলেও দাম্পত্য জীবন সুখকর ছিল না। ২০০৯ সালে বাবুল আক্তার এসপি সার্কেল হিসেবে হাটহাজারীতে যোগ দেন। সেখানেও প্রায় সময় ঝগড়া বিবাদ বা পারিবারিক অশান্তির অবসান ঘটেনি। প্রথম পুত্রের প্রায় পাঁচ বছর পর কন্যা তাবাসসুম জন্ম নেয়। বর্তমানে এ কন্যার বয়স ৭ বছর।

সিএমপিতে থাকাকালে সোর্স হিসেবে মুসার সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং তাকে বিভিন্ন অপরাধ উদ্ঘাটনের ঘটনায় সোর্স হিসেবে কাজে লাগান। তথ্য উদ্ঘাটনে সোর্স মুসার কাজে সন্তুষ্ট ছিলেন বাবুল আক্তার। ফলে ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়ে। একপর্যায়ে বাবুলের বাসায়ও আনাগোনা করতে থাকে সোর্স মুসা। সংসার জীবন চলেই যাচ্ছিল। ২০১৩ সালে বাবুল আক্তার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কক্সবাজার জেলায় যোগ দেন। সেখানে কর্মজীবন চলাকালে জেলা প্রশাসকের একটি কো-অর্ডিনেশন সভায় এনজিও কর্মী গায়ত্রী অমর সিংয়ের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। পরিচয়ের সূত্রে একে অপরের মোবাইল ফোন নাম্বার আদান প্রদান করেন। এরপর থেকে মোবাইল ফোনে আলাপচারিতা দিন দিন বাড়তে থাকে। কক্সবাজারে চাকরিকালীন বাবুলের সঙ্গে মিতু ও তার দুই সন্তান থাকতেন। একদিন গায়ত্রী টেকনাফ থেকে কক্সবাজার আসার পথে বাবুলকে ফোন করেন। আলাপের সুবাদে একটি হোটেলে তারা খাওয়া দাওয়া ও গল্প গুজব করে একে অপরকে আরও কাছাকাছি নিয়ে যান। পরবর্তীতে গায়ত্রী তার পুত্রকে নিয়ে বাবুলের বাসায়ও যাওয়া আসা করতে থাকেন। মাঝেমধ্যে গায়ত্রী দূরে কোথাও কাজে গেলে তার শিশু পুত্রকে মিতুর হেফাজতে রেখে যেতেন। কিন্তু মিতু খুব একটা বেশি আঁচ করতে পারেননি যে, বাবুলের সঙ্গে গায়ত্রীর প্রেমলীলা জন্ম নেয়ার বিষয়টি। একদিন উভয় পরিবার একসঙ্গে কক্সবাজারে একটি হোটেলে অবকাশ যাপনের দিনক্ষণ ঠিক করে ওই হোটেলে যায়। গভীর রাত পর্যন্ত বাবুল আক্তার নিজের রুমে ফিরে না আসায় মিতু গায়ত্রীর রুমে যান। দরজা খোলার পর তিনি তাদের আপত্তিজনক অবস্থায় দেখতে পান। এরপরের ঘটনা মিতুর জন্য চরম বিষাদের। হোটেল কক্ষেই চরম ঝগড়াঝাটি হয়। পরদিন তারা যার যার বাসায় চলে যান। মিতু বিষয়টি তার মা-বাবা এবং শ্বশুর শাশুড়িকে জানিয়ে দেন। এরপর সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। এই নিয়েই চলতে থাকে তাদের সংসার। ২০১৪ সালে বাবুল আক্তারকে পুনরায় সিএমপিতে পোস্টিং করা হয়। কিন্তু গায়ত্রীর সঙ্গে তার সম্পর্কের অবসান মোটেই ঘটেনি। কক্সবাজার থেকে গায়ত্রী চট্টগ্রামে এসে দেশীয় একটি এনজিও কাজীর দেউড়ির সেন্টারের রেস্ট হাউসে বাবুলের সঙ্গে রাত কাটান। রাতে কোথায় ছিলেন এমন প্রশ্নের উত্তরে বাবুল মিতুকে জানিয়েছিলেন জঙ্গীবিরোধী অভিযানে তার রাত অতিবাহিত হয়েছে।

এর পরবর্তীতে বাবুল সুদানে শান্তিরক্ষী মিশনে চলে যান একবছরের জন্য। যাওয়ার আগে মিতুকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স কোর্সে ভর্তি করিয়েছিলেন। ভর্তির পর মিতু সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নিয়মিত ক্লাস করতে থাকেন। তার চলাফেরা এবং পোশাক আশাকেও পরিবর্তন আসে। বিষয়টি বাবুল ভালভাবে নেননি। তার মনে সন্দেহ জন্মে মিতু কারও সঙ্গে ডেটিং করছেন। নিয়মিত এভাবে চলার পর একদিন বাবুল সরাসরি মিতুকে প্রশ্ন করলেন তোমার চালচলন আমার কাছে ভাল লাগছে না। তুমি কি কারও প্রেমে পড়েছ কিনা। নিষ্কুলুষ চরিত্রের অধিকারী মিতু এতে রেগে গিয়ে উত্তর দেন ‘তুমি পারলে আমি পারব না কেন।’ এতে বাবুল আরও রেগে যান। পারিবারিক অশান্তি আরও তুঙ্গে চলে যায়। তাদের নিজেদের সঙ্গে রীতিমতো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দু’জন আলাদাভাবে থাকতে শুরু করেন।

জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল আক্তার আরও জানিয়েছেন, তিনি নিজে উচ্চাভিলাষী চরিত্রের। একজন উচ্চশিক্ষিত, স্মার্ট এবং সুন্দরী মহিলা তার স্ত্রী হবেন-এমন ধারণা তিনি বিয়ের আগ থেকেই পোষণ করতেন। মিতু সুন্দরী হলেও উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না। এছাড়া হাতে ছিল দৃশ্যমান লম্বা ক্ষত। যে কারণে মিতু সব সময় ফুলহাতা কাপড় পরিধান করতেন। এটি তার মনে ভিন্নভাবে যে রেখাপাত করেছিল তার অবসান হয়নি শেষঅবধি।

সংসারে চরম অশান্তির বিষয়টি তিনি কারও সঙ্গে শেয়ার করতে পারতেন না। আবার সহ্য করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, তার জীবনে প্রকৃতভাবে কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব নেই। এ অবস্থায় পারিবারিক বিষয়টি তিনি শেয়ার করেন সোর্স মুসার সঙ্গে। এরপর তার সুদান চলে যাওয়ার পালা আসে। যাওয়ার সময় মুসাকে দায়িত্ব দিয়ে যায় ঘর থেকে বের হয়ে ফিরে আসা পর্যন্ত মিতুর চলাফেরা পর্যবেক্ষণে রাখতে। মুসা তা-ই করে গেছে। একবছর মিশন সম্পন্ন করে দেশে ফিরে আসার পর মুসার কাছ থেকে বাবুল বিষয়টি আদ্যোপ্রান্ত জানেন। এর আগে তিনি সুদান থেকে দু’দফায় দেশে আসেন ছুটিতে। ওই সময়েও তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ লেগেই ছিল। দেশে ফেরার পর বাবুল আক্তার হুমকি দেন মিতুকে এই বলে যে, তাকে তিনি ডিভোর্স দেবেন। উত্তরে মিতু জানিয়ে দেন, যদি ডিভোর্স দেয়া হয় তাহলে তিনি তার সব অপকর্মের জারিজুরি সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে ফাঁস করে দেবেন। এছাড়া বাবুল আক্তারের চরিত্রসহ অন্যান্য অপকর্ম নিয়ে পুলিশ সদর দফতরে লিখিতভাবে অভিযোগ দেবেন। এসব কথা শুনে বাবুল ভীতসন্ত্রস্ত্র হয়ে থমকে যান। এরপর থেকে তার মাথায় খুনের পরিকল্পনা চলে আসে।

জিজ্ঞাসাবাদে তিনি আরও বলেছেন, মুসাকে এ বিষয়টি জানানোর পর ছক কাটা শুরু করেন। প্রথমে মুসার হাতে খরচের জন্য ৭৫ হাজার টাকা প্রদান করেন। এ সময় দেশজুড়ে চলছিল জঙ্গীবিরোধী অভিযান। চট্টগ্রামে জঙ্গীবিরোধী অভিযানে বাবুলের নেতৃত্ব দেয়ার ঘটনা ছিল অন্যতম। তিনি পরিকল্পনা করেন যে, যেহেতু অভিযানের কারণে তিনি জঙ্গীদের টার্গেট হয়েছেন এবং জঙ্গীদের পক্ষ থেকে সিএমপির সদর দফতরে উড়ো চিঠিও আসে। তখন পুরো পুলিশ বাহিনীকে এ বিষয়ে সতর্কও করে দেয়া হয়। তিনি জানিয়েছেন, মিতুকে হত্যার জন্য তিনি ওই সময়টিই বেছে নেন। হত্যার পর জানান দেয়া হবে জঙ্গীরাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। জঙ্গীবিরোধী অভিযান থেকে বাবুলকে দমানোর জন্য জঙ্গীগ্রুপ এ কাজ করেছে বলে বিশ্বাসে আনা গেলে তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবেন। এ জন্য তিনি ঘটনার পর জিজ্ঞাসাবাদে জঙ্গীদের নিয়ে গল্প এঁটেছিলেন। পরবর্তীতে তদন্তে তার সত্যতা মেলেনি। উল্টো উঠে আসে তার বিশ্বস্ত সোর্স মুসা কিলিং স্কোয়াডের নেতৃত্ব দিয়ে মিতুকে হত্যা করেছে।

এ অবস্থা চলতে থাকার প্রেক্ষাপটে বাবুল আক্তার পদোন্নতি পান এসপি পদে। ঘটনার দুদিন আগে তিনি ঢাকায় যান পুলিশ সদর দফতরে। যেদিন অর্থাৎ ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে মিতু হত্যাকা- ঘটে ওইদিন সকাল ৯টায় পুলিশ সদর দফতরে এসপি পদে তার যোগদানের কথা ছিল। মূলত তিনি স্বীকার করেছেন, ওইদিনটি বেছে নেয়ার কারণ হচ্ছে ঘটনার সময় তিনি ঢাকায় থাকবেন, যাতে কোন মহল তাকে সন্দেহ না করে। আর পরিকল্পনাটি তিনি নিজেই নিখুঁতভাবে করিয়েছেন সোর্স মুসার মাধ্যমে। কিলিং মিশন সম্পন্ন করার জন্য তিনি আরও তিন লাখ টাকা প্রদান করেছেন। এ টাকা বিকাশের মাধ্যমে মুসা ও তার স্ত্রী গ্রহণ করেছেন। এ রেকর্ড বিকাশের সদর দফতর থেকে বের করা হয়েছে। টাকা প্রদানের জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন তার বন্ধু সাইফুলকে। যিনি একসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। ওই সময় থেকে তার সঙ্গে সখ্যতা। শেষ তিন লাখ টাকা সাইফুল দিয়েছে আল মামুনকে। আল মামুনও তাদের বন্ধু। আল মামুনই বিকাশে উক্ত পরিমাণ টাকা মুসা ও মুসার স্ত্রীকে প্রদান করেছেন।

এভাবে স্ত্রীকে কেন হত্যা করালেন-এমন প্রশ্নের উত্তরে বাবুল বলেছেন, এছাড়া তার আর অন্যকোন পথ ছিল না। তবে তিনি ভাবতে পারেননি যে, তার পরিকল্পনার গোমর ফাঁস হয়ে যাবে। ধরা পড়ে যাবেন। এখন যা বলা হচ্ছে তা সবই সত্য বলে স্বীকার করেছেন। গত ১২ মে পিবিআই বাবুল আক্তারকে রিমা-ে আনে। গত ১৫ মে তিনি সব সত্য স্বীকার করে নেন এবং অঝোর নয়নে কান্না করতে থাকেন। তদন্ত কর্মকর্তাদের একজন সাবেক সিনিয়র অফিসারের সঙ্গে তাকে বলা হয় আদালতে তিনি স্বীকারোক্তি দিতে রাজি আছেন কিনা। বাবুল এতে সায় দেন। ফলে সব ব্যবস্থা করে ১৭ মে তাকে আদালতে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের খাস কামরায় পৌঁছানো হয়। প্রায় পাঁচঘণ্টা ম্যাজিস্ট্রেটের খাস কামরায় থেকে স্বীকারোক্তি দিতে অসম্মতি জানিয়ে রীতিমত ডিগবাজি করে বসেন। আদালত তাকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেয়।

এ ঘটনার পর পিবিআই’র চট্টগ্রাম মেট্রো বিভাগের কর্মকর্তারা মঙ্গলবার জরুরী বৈঠক করেছেন। বৈঠকে বাবুল আক্তারকে আবারও রিমা-ে এনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিদ্ধান্ত হয়। আজ বা কালের মধ্যে আদালতে এ সংক্রান্ত আবেদন জানানো হবে বলে পিবিআই সূত্রে জানানো হয়েছে।

এবার বাবুলকে রিমা-ে আনার পাশাপাশি ঘটনার সময়কার তার ব্যবহৃত গাড়ির চালক, বডিগার্ড, দুই গৃহকর্মীসহ এ ঘটনা নিয়ে জানা আছে এমন সকলকে মুখোমুখি করা হবে। এমনকি মুসার স্ত্রীকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পিবিআই হেফাজতে আনা হবে। এছাড়া ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মিতুর পুত্র মাহিরকে খোঁজা হচ্ছে। মাহির এবং তার বোন তাবাসসুম বর্তমানে বাবুল আক্তারের তৃতীয় স্ত্রীর সঙ্গে রয়েছেন। তাদের খোঁজা হচ্ছে। পিবিআই বিভিন্ন মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে, বাবুল যে বেসরকারী একটি গ্রুপে চাকরি করছেন সেই গ্রুপের সংশ্লিষ্টরা তাদের সরিয়ে রেখেছে। জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল তার পুত্র মাহিরের কথা একবারও বলেননি। শুধু মেয়ে তাবাসসুমের কথা বলে কান্নাকাটি করেছেন। পিবিআই সূত্র মতে, মাহির যেহেতু মা হত্যাকা-ের সময়কার প্রত্যক্ষদর্শী এবং তার বয়স ছিল সাত বছর, এ কারণে বাবুলের বিশ্বাস মাহির অনেক কিছু ফাঁস করে দিতে পারে। এ কারণেই বাবুল মাহিরের প্রসঙ্গ এলে জিজ্ঞাসাবাদে বরাবরই এড়িয়ে গেছেন।

পিবিআই সূত্রে জানানো হয়েছে, এবার রিমা-ে আনার পর সাক্ষী এবং জেলে থাকা আসামিদের বাবুলের মুখোমুখি করা হবে। যারমধ্যে অন্যতম বিকাশে টাকা প্রদানের সঙ্গে জড়িত সাইফুল, আল আমিন, কিলিং স্কোয়াডের সদস্য জেলে থাকা দু’জন, অস্ত্র সরবরাহকারী একজন, বাবুলের তৎকালীন গাড়িচালক ও বডিগার্ড এবং বাসার দুই গৃহকর্মী। এদের কাছ থেকে অন্য কারও নাম বেরিয়ে আসলে তাদেরও মুখোমুখি করা হবে।

Facebook Comments Box