রেলগাড়ি ঝমাঝম পা পিছলে

391

আলোকিত সকাল ডেস্ক

‘রেলগাড়ি ঝমাঝম, পা পিছলে আলুর দম’। বাংলার লোকমুখে প্রচলিত এ ছড়ার ‘আলুর দম’-এর মতো অবস্থা হয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের। কারণ, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও লুটপাট জেঁকে বসেছে গোটা রেল বিভাগে। সেইসঙ্গে ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মরণফাঁদ। সে মরণফাঁদে পড়ে ‘আলুর দম’ হওয়ার জোগাড় যাত্রীদেরও। চরম অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত রেলওয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি দিতে পারছে না রেলপথেও।

গত ২৩ জুন সিলেটের মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেন ‘উপবন এক্সপ্রেস’ ব্রিজ ভেঙে খাদে পড়ে গিয়ে মারা গেছে পাঁচ যাত্রী। আহত হয়েছে অন্তত আড়াইশ জন। এ ঘটনার পর দেশের গণমাধ্যমে নতুন করে উঠে এসেছে বিদ্যমান রেলপথের ভয়াবহ ঝুঁকির চিত্র। রেললাইনের নড়বড়ে নাট-বল্টু, ছেঁড়া কাপড় ও সুতলি বা বাঁশের ফালি দিয়ে বেঁধে রাখা রেললাইনের প্যান্ডেল, ক্লিপ, ফিশপ্লেট, স্লিপারের অসংখ্য ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিভিন্ন এলাকা থেকে উৎসাহী লোকজনও নিজেদের দায়িত্বে সেসব ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথের ছবি তুলে প্রকাশ করছেন নানাভাবে।

উপবন এক্সপ্রেস দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে আসা রেলপথের এমন চিত্র আতঙ্কিত করে তুলেছে দেশবাসীকে। অথচ দেড়শ বছরের বেশি প্রাচীন বাংলাদেশের রেলওয়ের এমন দশা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি, প্রতিবেদন প্রকাশ, জনগণের তরফ থেকে ধরনা, প্রতিবাদ-প্রতিক্রিয়ার পরও কোনো ধরনের পরিবর্তন নেই রেলওয়ের ব্যবস্থাপনায়। শুধু এ বিভাগটির উন্নয়নের স্বার্থেই কয়েক বছর আগে রেলপথ মন্ত্রণালয় নামে পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এরপরও জোড়াতালির শেষ নেই বিভাগটিতে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন উন্নয়নকাজে, বিশেষ করে রাস্তা-ঘাট-ব্রিজ, স্কুলভবন নির্মাণকাজে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের চিত্র উঠে এসেছে জনসমক্ষে। এবার রেললাইনের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় বাঁশ ব্যবহারের বিষয়টি রীতিমতো হতবাক করে দিয়েছে সবাইকে।

যদিও রেলওয়ে দাবি করেছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব খবর বস্তুনিষ্ঠ নয়। তারা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ‘রেল সেতুর ওপর স্থাপিত কাঠের স্লিপার যাতে আউট অব স্কয়ার না হয় এবং একত্রে জমা হতে না পারে, সে লক্ষ্যে কোনো কোনো রেল সেতুতে অতিরিক্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বহুকাল হতে স্থানীয়ভাবে বাঁশের ফালি/চেরাই কাঠ ইত্যাদি ব্যবহার করা হচ্ছে। ওই বাঁশের ফালি/ চেরাই কাঠ ট্রেনের ভার বহনে কোনো ভূমিকা রাখে না। উক্ত বাঁশের ফালি/ চেরাই কাঠ সেতুর মূল কাঠামোর অংশ নয় এবং কোনোভাবেই তা ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে না।’

বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর অনেকে প্রশ্ন করেছেন, রেললাইনে বা ব্রিজে বাঁশ ব্যবহারের আইনগত কোনো বৈধতা বা ভিত্তি আছে কি না? বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোন কোন দেশে রেল লাইনে বাঁশের ব্যবহার প্রচলিত আছে?

অনেকে প্রশ্ন করেছেন, রেললাইনে বাঁশের ব্যবহার যদি দীর্ঘদিনের চর্চা হয়ে থাকে প্রকৌশল বা কারিগরি বিদ্যা বাঁশ ব্যবহারের বিষয়টি অনুমোদন দেয় কি না? রেলওয়ের কথা যদি ধরে নেওয়া হয় যে, স্লিপার যাতে জমে না যায় বা সরে না যায় তার জন্য বাঁশের ব্যবহার হয়ে থাকে। তাহলে কোনো লাইনে বা ব্রিজে যদি স্লিপার সরে যায় বা নড়বড়ে হয়ে যায় তাহলে সেটা ব্যবহার উপযোগী থাকে কি না?

বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, দেশে ট্রেন লাইনচ্যুতি ঘটনার ৭৫ শতাংশই ঘটে রেললাইনের কারণে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে রেললাইনের রেলবিট, লেভেল ক্রসিংয়ের রেল, ফিশপ্লেট, ক্লিপ ও নাট-বল্টু চুরি হয়ে যাচ্ছে, যা ঠেকাতে পারছে না রেলওয়ে। রেললাইনের অনেক স্থানে নেই প্রয়োজনীয় পাথরও। রেলওয়ে সূত্র জানাচ্ছে, দেশে ২ হাজার ৯২৯ কিলোমিটার রেলপথে বছরে প্রায় ৫ লাখ পিস ক্লিপ চুরি হচ্ছে, যার বাজারমূল্য ১০ কোটি টাকারও বেশি। উপবন দুর্ঘনার পর রেলমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজনও বলেছেন, ব্রিজ ভেঙে নয়, দুর্বল লাইন ও নাট-বল্টুর কারণেই এই দুর্ঘটনা হতে পারে।’এ ঘটনার তদন্তে দুটি কমিটি করা হয়েছে। তারাই প্রকৃত কারণ জানাবে শিগগিরই।

এদিকে রেললাইন নিয়মিত তদারক করে চুরি যাওয়া এসব যন্ত্রাংশ পুনস্থাপন বা সংস্কারের নিয়ম থাকলেও বছরের পর বছর তা হচ্ছে না। এমনকি মাসে অন্তত একবার রেললাইন পরিদর্শনের নিয়ম থাকলেও তা পালন করছে না রেলওয়ে। এমনকি কোনো কোনো সেকশনে বছরে একবারও রেললাইন পরিদর্শন হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। রেলের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ক্লিপ, ফিশপ্লেট, নাট-বল্টু সাপ্লাই ও প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত রেলওয়ের অবহেলা, নিয়মিত তদারকি ও মেরামতের অভাবেই ট্রেন চলাচল দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর মধ্যে ঢাকা-সিলেট রুটের রেললাইন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু সিলেট-কুলাউড়া-আখাউড়া সেকশনে ১৭৮ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। দীর্ঘ এ পথে ছোট-বড় ২৫০টির বেশি সেতু রয়েছে। সর্বনিম্ন তিন ফুট থেকে ৩০০ ফুট পর্যন্ত দীর্ঘ সেতুগুলো ৬০-৭০ বছর আগে নির্মিত। প্রতিদিন এ রেলপথে ৬ জোড়া আন্তঃনগর এবং ৮টি ডেমু ও লোকালসহ কয়েকটি পণ্যবাহী ট্রেনও চলাচল করে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ঢাকা-সিলেট রেলপথে বাঁশ দিয়ে পেরেক মেরে আটকানো হয়েছে রেললাইনের স্লিপার। হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পশ্চিমে ঝুঁকিপূর্ণ একটি রেলসেতুতে স্লিপারগুলোকে আটকে রাখতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ভিডিওতে দেখা গেছে, ট্রেনলাইনে আটকানো নাট-বল্টুগুলো প্রায় খুলে যাচ্ছে। এর মধ্যেই চলছে ট্রেন। ট্রেন যাওয়ার সময় লাইনের দুই পাতের সংযোগস্থলটি ভয়ংকরভাবে ওঠা-নামা করছে। ট্রেন চলে যাওয়ার পর স্থানীয়রা ঢিলে হওয়া নাটগুলো আবার লাগিয়ে দিচ্ছে।

একই অবস্থা জানা গেছে, লালমনিরহাটের তিস্তা থেকে কুড়িগ্রামগামী রেলপথেরও। এই পথেও বিভিন্ন জায়গায় কাঠের স্লিপারের ওপর বাঁশ এবং লাইনের উভয়দিকে গাছের সরু ডাল ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে স্লিপারগুলো না সরে যায়।

লেখক-গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ গত ২৫ জুন তার ফেসবুক পেজে কুড়িগ্রামের টগরাইহাটের শিয়ালডুবি নদীর ওপর অবিস্থত একটি ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, ‘বাঁশের পাত, কাঠের জোড়াতালি দেওয়া এই লাইনে চলছে ট্রেন। ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এই সেতুটি কুড়িগ্রামের টগরাইহাটের শিয়ালডুবি নদীর ওপর। বিস্তর লেখালিখি হলেও সেতু সংস্কারকের উদ্যোগ নেই। কি জানি, কুড়িগ্রাম বলেই হয়তো!!’

আস/এসআইসু

Facebook Comments