১৪ দলে বাড়ছে দূরত্ব

345

আলোকিত সকাল ডেস্ক

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের মধ্যদিয়ে টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করেছে ১৪ দলীয় নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। তবে বর্তমানে জোট শরিক দলগুলোর চাওয়া-পাওয়া নিয়ে বেশকিছু সমস্যার মধ্যে রয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি।

এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সাথে জোট শরিকদের দূরত্ব বেড়েই চলছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট গঠিত হয় ২০০৪ সালে।

এরপর তারা বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ আন্দোলন এবং পরপর টানা তিনটি জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে করেছে। এর মধ্যে প্রথম দুই সরকারের মন্ত্রিসভায় শরিক দলগুলোর একাধিক নেতা স্থান পেয়েছিলেন।

কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলেও সরকার গঠনে মন্ত্রিসভা গঠনের একক সিদ্ধান্তে আসে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড।

মন্ত্রিসভা গঠনে জোট শরিকদের কোনো প্রতিনিধিকে রাখা হয়নি। শুধু তাই নয়, আগামী বছর পূর্ণ হবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী, পরের বছর হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী।

ইতোমধ্যে এই দুই বছরকে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণাও দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মুজিববর্ষ উদযাপনে বিশিষ্টজনদের নিয়ে ১০২ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি এবং বাস্তবায়নের জন্য ৬১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে সরকারে থাকা দলটি। অথচ ঘোষিত মুজিববর্ষ উদযাপনে কমিটিতে স্থান পাননি জোট শরিকরা।

সূত্র মতে, গত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নতুন আশা নিয়ে মাঠে নেমেছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা। নির্বাচনের আগে বাড়ানো হয় জোটের পরিধি। নতুন করে জোটে এসে সুবিধা পেলেও ভোটের মাঠেই স্বপ্ন পুড়ে ১৪ দলভুক্ত শরিকদের।

জোটের প্রতীক নৌকার প্রার্থী হয়ে অন্তত ৩০ জন নেতা সংসদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখলেও তা ভঙ্গ হয়। নতুন তো নয়ই, বরং গত মেয়াদের চেয়ে কমানো হয় প্রার্থী সংখ্যা। ১৪ দলের কয়েকজন নেতাকে প্রথমে প্রার্থী করা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তা বাতিল করা হয়।

এসব সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্বে জোটের নেতাদের সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এরপর অনেকেই আশা করেছিলেন- ঠাঁই পাবেন মন্ত্রিসভায়। কিন্তু সেখানেও হতাশ হয়েছে।

গঠিত মন্ত্রিসভায় ১৪ দলের কাউকে রাখা হয়নি। অথচ এর আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সব সরকারই ছিল অংশগ্রহণমূলক। জোটের শরিক দল, এমনকি বিরোধী দলের প্রতিনিধিও ছিল সরকারে।

২০০৮ সালের গঠিত জোটভুক্তদলের মধ্যে মন্ত্রিসভায় ছিলেন- জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিএম কাদের, মুজিবুল হক চুন্নু, জেপির আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, জাসদের হাসানুল হক ইনু, সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়া।

২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারেও হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, মশিউর রহমান রাঙ্গাকে মন্ত্রিসভায় রাখা হয়।

সূত্র আরও জানায়, সরকার গঠনের পর সরকারি দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল জোটের নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে। এরপর থেকে আশায় দিন কাটছে দলগুলোর। ৭ মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো ধরনের সুখবর পাননি জোটের নেতারা। বরং বিভিন্ন সময়ে সরকারের শীর্ষ নেতাদের হাস্যরস কথার খোরাক হয়েছে।

মন্ত্রিসভা ছাড়াও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে মূল্যায়ন করার কথা শোনা গেলেও তা এখনো দেখা যায়নি। এছাড়া দলীয় কার্যক্রমে উপেক্ষিত ১৪ দল। জোট গঠিত হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের বড় কোনো কর্মসূচি থাকলে এর আগে ১৪ দলের সঙ্গে বৈঠক করা হতো।

গত নির্বাচনের ১৯ দিন পর ১৯ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের উদযাপিত সমাবেশে ১৪ দলকে অংশ নিতে সেভাবে আমন্ত্রণও জানানো হয়নি। এসব কারণে ক্ষোভের অন্তর্দহনে পুড়ছে ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা।

একাদশ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর থেকেই ১৪ দলের ভিতরে-বাইরে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীনদের রাজনীতির কৌশলে পুরোপুরি ভরসা পাচ্ছেন না শরিকদের অনেকে। তারা মনে করছেন, একচেটিয়া বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ নিজেই শরিকদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করছে।

সময়ের প্রয়োজনে রাজনৈতিক বৈরিতা পেরোতে জোট গঠন করা হলেও জোটের সাথে দূরত্ব বাড়ছে ক্ষমতাসীন দলটির।

১৪ দলীয় জোট সূত্রেগুলো মনে করছে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর রাজনীতির মাঠে সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে সরকারবিরোধী দলগুলো।

বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্ব নিয়ে অনেকটাই বেকায়দায় রয়েছে। বিরোধী শিবিরের এমন পরিস্থিতিতে ১৪ দলীয় জোট শরিক দলগুলোকে নিয়ে কৌশল করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

এমন পরিস্থিতিতে জোট শরিক দলগুলোর অনেক নেতাই সরকারবিরোধী কথা বলতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেট পাস হওয়ার পর হঠাৎ গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে জনসাধারণসহ দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

যা নিয়ে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদ জানিয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সেই প্রতিবাদে সামিল হন সরকার দলীয় জোট ১৪ দল। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি প্রত্যাহার ও পুনর্বিবেচনা করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান জোটের শীর্ষ নেতারা।

গ্যাসের দামবৃদ্ধির সমালোচনা করে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, গ্যাসের সংকট জনগণের সংকট। রেগুলেটরি কমিশন গ্যাসের দামবৃদ্ধি করে আইনের বরখেলাপ করেছে। ১৪ দল মনে করে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি যৌক্তিক নয়।

গ্যাসের অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি প্রত্যাহার করতে হবে। গ্যাসের দামবৃদ্ধি নিয়ে সংসদে আলাপ-আলোচনা করতে হবে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, গ্যাসের দামবৃদ্ধি জনগণের ওপর বাড়তি চাপ। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। সামাজিক অস্থিরতা থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

জাসদ একাংশের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, নির্বাচনের আগে জোটকে যেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল, পরে সেটা দেখেনি। মূল্যায়ন যা করার তো করেছে, এখন আর সম্ভাবনা দেখি না।

জোট নিয়ে সরকারের যে পলিসি, সেটা পরিবর্তন কবে হবে সেটা জোটনেত্রীই জানেন। ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেন, নির্বাচনে আমাদের জোটের মূল লক্ষ্য বাস্তবায়ন হয়েছে, সেটা হলো- মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অসাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় আসা।

আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি করে, নীতি তাদের কাছে মূল নয়, আর এ কারণে জোট যথার্থ মূল্যায়ন পাচ্ছে না। নির্বাচনের আগের পরিস্থিতি আর এখন এক নয়, যার কারণে শরিকদের পাত্তা দিচ্ছে না।

বাংলাদেশ গণআজাদী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট এস কে সিকদার বলেন, আমরা হতাশ নই। সময় এখনো শেষ হয়নি, অপেক্ষা করতে হবে। জোটনেত্রী শেখ হাসিনা সবদিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেন। আমি আশাবাদী তিনি ১৪ দলের যোগ্য নেতাদের মূল্যায়ন করবেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments