বাংলা লোকগানের ইতিহাসে একটি নাম উচ্চারণ করলে আজও হৃদয় কেঁপে ওঠে—তিনি আব্দুল আলীম। মাটির গন্ধমাখা তাঁর কণ্ঠ ছিল যেন গ্রামীণ বাংলার প্রাণস্পন্দন। যে মানুষটি গান দিয়ে কোটি মানুষের মনে আলোড়ন তুলেছিলেন, তিনি আজ নেই। তবু তাঁর সুর বেঁচে আছে, ভেসে আসে গ্রামবাংলার ক্ষেতখামার, হাটবাজার, এমনকি শহরের ব্যস্ত অলি-গলিও পেরিয়ে।
আমি যখন তাঁর গান শুনি, মনে হয়—এ গান আমারই জীবনের কথা বলে। “এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়া”, “হলুদিয়া পাখি”, “নবী মোর পরশমণি”, “আল্লাহু আল্লাহু তুমি জাললে জালালু”, “প্রেমের মরা জলে ডুবে না”, “পরের জায়গা পরের জমিন, ঘর বানাইয়া আমি রই” এসব গানে শুধু সুর বা তাল নেই, আছে অগণিত মানুষের দুঃখ-কষ্ট, ভালোবাসা, আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তাঁর কণ্ঠ ছিল নদীর মতো যেখানে দুঃখ আছে, আনন্দ আছে, কিন্তু থেমে থাকা নেই।
আব্দুল আলীমের জীবন ছিল ছোট, মাত্র ৪৩ বছরে তাঁর যাত্রা শেষ হয়। কিন্তু সেই স্বল্প সময়ে তিনি যা দিয়ে গেছেন, তা শত বছরের ভাণ্ডারের চেয়েও সমৃদ্ধ। মৃত্যুর পর এত বছর কেটে গেলেও তাঁর গাওয়া গান আজও নতুন মনে হয়, আজও আমাদের শেকড়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না; ছিলেন বাংলার প্রাণের প্রতিনিধি। সাধারণ মানুষের হাসি-কান্না, আশা-নিরাশা, প্রেম-বিরহ সবকিছুই যেন তাঁর কণ্ঠে জায়গা করে নিয়েছিল। লোকসংগীতকে তিনি তুলে এনেছিলেন গ্রামের উঠান থেকে শহরের অন্দরমহলে।
আজ, তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন গায়ককে স্মরণ করা নয়; বরং আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মাকে পুনরুদ্ধার করা। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন শেকড়কে না ভুললে মানুষ কখনো পথ হারায় না।
আব্দুল আলিম বেঁচে আছেন আমাদের প্রতিটি স্মৃতিতে, প্রতিটি সুরে, প্রতিটি প্রজন্মের আবেগে। তিনি বেঁচে আছেন বাংলার মাটির মতো, বাংলার নদীর মতো অমলিন, অবিনশ্বর।