বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে আব্দুল আলীম একটি কিংবদন্তি নাম। তাঁর সেই ঐতিহ্যকে উত্তরাধিকার হিসেবে বুকে ধারণ করেছেন তাঁর কন্যা নুরজাহান আলীম। তবে তিনি কেবল মহান শিল্পীর কন্যা হিসেবেই পরিচিত নন; বরং নিজস্ব কণ্ঠশৈলী, পরিবেশনা ও সাধনার মাধ্যমে তিনি আজ নিজেই একটি আলাদা পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
শৈশবে বেড়ে ওঠা ও শিল্পী জীবনের সূচনা
নুরজাহান আলীম শৈশব থেকেই সংগীতের আবহে বড় হয়েছেন। তাঁর বাবা আব্দুল আলিম ছিলেন দেশের লোকসংগীতের প্রাণপুরুষ। ফলে ঘরে-বাইরে সর্বত্র গানই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম পাঠশালা। বাবার গানের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক তাঁকে শৈশব থেকেই লোকগানের প্রতি অনুরাগী করে তোলে। সংগীতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিলেও লোকগানের আসল রস তিনি পেয়েছেন পারিবারিক ঐতিহ্যের মাধ্যমেই। ধীরে ধীরে তাঁর কণ্ঠ শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। লোকগানের আদি সুর ও স্বাদ বজায় রেখে তিনি আধুনিক সংগীত বিন্যাসের সঙ্গে গানের পরিবেশনা করেছেন, যাতে তরুণ প্রজন্মও লোকগানের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তাঁর কণ্ঠে ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি, আধুনিক সবই ভিন্ন মাত্রায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
অবদান ও স্বাতন্ত্র্য
নুরজাহান আলীম শুধু বাবার গাওয়া গান পরিবেশন করেননি; তিনি নিজেও লোকসংগীতের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর কণ্ঠের সহজ-সরল অথচ গভীর আবেগ লোকগানকে নতুন প্রাণ দিয়েছে। তিনি বহু মঞ্চে, টেলিভিশন ও বেতারে গান পরিবেশন করেছেন, যা বাংলা লোকগানকে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
দেশ-বিদেশে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নুরজাহান আলীম বাংলা লোকগানকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে লোকগান শুধু গ্রামীণ সংস্কৃতির ধ্বনিই নয়, বরং তা বাঙালির আত্মার সুর, যা বিশ্বমঞ্চেও সমানভাবে হৃদয় ছুঁতে পারে।
উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
নুরজাহান আলীম মনে করেন, লোকগান হলো বাঙালি জীবনের প্রতিচ্ছবি। তাই তিনি শুধু গাইছেনই না, নতুন প্রজন্মকে লোকগান শেখাতেও কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর প্রচেষ্টা হলো লোকসংগীতকে সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাঁচিয়ে রাখা। নুরজাহান আলীম নিঃসন্দেহে বাংলা লোকসংগীতের এক অনন্য নাম। তিনি আব্দুল আলিমের উত্তরাধিকার বহন করলেও কেবল তাঁর ছায়াতেই আবদ্ধ নন; বরং তিনি নিজস্ব কণ্ঠ ও শৈলীর মাধ্যমে লোকসংগীতকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। আজকের দিনে লোকগান যদি নতুন প্রজন্মের কাছে এখনও জনপ্রিয় থাকে, তার পেছনে নুরজাহান আলীমের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর বাবা, মরমী শিল্পী আব্দুল আলীমের স্মৃতিকে রক্ষা করার উদ্যেশ্যে তিনি ইতিমধ্যেই একই ডকুমেন্টারির কাজ শেষ করেছেন যা অচিরেই দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে নুরজাহান আলীমের নাম তাই চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে, একজন সাধক শিল্পী হিসেবে, যিনি মাটির গন্ধমাখা গানের ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে অগ্রসর হয়েছেন সময়ের স্রোতের সঙ্গেও তাল মিলিয়ে।