দেশবার্তা ডেক্স: মন্ট্রিয়ল ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অ্যাগেইনস্ট অ্যাট্রোসিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স অন হিউম্যানিটি ১৯৭১ সালের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে মন্ট্রিয়লের মুন স্টার রেস্টুরেন্টে এক আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর বিজয়ের মাত্র দু’দিন আগে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা পরিকল্পিতভাবে এই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে।
শহীদ বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন জাতি গঠনের অগ্রদূত—চিকিৎসক, অধ্যাপক, আইনজীবী, সাংবাদিক, লেখকসহ বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের প্রাক্কালে প্রায় এক হাজারের মতো বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে, যাতে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য ও পঙ্গু করে দেওয়া যায়। তবে তাদের এই ঘৃণ্য উদ্দেশ্য সফল হয়নি, যদিও প্রতিশোধের রাজনীতি থেমে থাকেনি।
অনুষ্ঠানটি দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম পর্বে ছিল শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা। দ্বিতীয় পর্বে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—যেখানে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের দ্বারা নির্যাতিত নারী-পুরুষদের স্মরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের চেয়ারপারসন ইশরাত আলম। প্রধান অতিথি ছিলেন কুইবেক আওয়ামী লীগের সভাপতি মুনশি বশীর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিশির ভট্টাচার্য, সাজ্জাদ হোসেন সুইট, তাজুল মোহাম্মদ, সি বি সিং প্রমুখ।
অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন ফাতেমা বেগম, সুশান্ত বড়ুয়া, শাহ আলম মোল্লা, বজলুর রশীদ, ইয়াকুব, মাসুদ খান, আব্দুল বাসেত ও আব্দুল গফুর।
সভাপতির বক্তব্যে ইশরাত আলম বলেন, “গণআন্দোলন সৃষ্টি করেছেন সাধারণ মানুষ, আর সেই আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছেন বুদ্ধিজীবীরা। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা বুঝে গিয়েছিল বাঙালিকে আর পরাজিত করা যাবে না, তাই তারা নতুন রাষ্ট্রকে বুদ্ধিজীবীশূন্য করতে চেয়েছিল। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও আত্মস্বার্থপর রাজনীতির কারণে আমরা পরাজয়ের মুখোমুখি হচ্ছি। দেশে আজ বাকস্বাধীনতা নেই, এমনকি সাংবাদিকরাও নিরাপদ নন। সত্য বলার কারণে খ্যাতনামা সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে ইউনুস সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী গ্রেপ্তার করেছে—এ খবর আমাদের জানা গেছে। ১৯৭১ সালে শহীদ বুদ্ধিজীবীরাও সত্য বলেছিলেন এবং প্রতিবাদ করেছিলেন। দমন-পীড়নের মাধ্যমে কোনো জাতিকে দমিয়ে রাখা যায় না। বাংলাদেশে তথাকথিত সাধারণ নির্বাচনের নামে একটি প্রহসন মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে।
প্রধান অতিথি মুনশি বশীর বলেন, “১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ১,১১১ জন বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে, যদিও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তালিকায় শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা ৫৬০।”
শিশির ভট্টাচার্য বলেন, “ভারতীয় উপমহাদেশে—বিশেষ করে বাংলাদেশে—হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে এক ধরনের অচিকিৎসিত বিদ্বেষ বিদ্যমান, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পথে বাধা। এই বিদ্বেষ থেকেই ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং সাম্প্রতিক সংকট তৈরি হয়েছে। ইতিহাস প্রমাণ করে, বিদ্বেষের চিকিৎসা না হলে রক্তপাত চলতেই থাকে। বাংলাদেশ সমাজ এখন দুই ভাগে বিভক্ত, একদল ১৯৭১-এর স্বাধীনতার পক্ষে, আরেকদল তার বিপক্ষে। দেশে যা কিছু খারাপ ঘটে, তার জন্য প্রমাণ ছাড়াই ভারতকে দায়ী করা হয়।”
তাজুল মোহাম্মদ মুক্তিযুদ্ধের আগের ও চলাকালীন ভয়াবহ দিনগুলোর বর্ণনা দেন। মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব বর্তমান দমনমূলক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আহ্বান জানান।
সি বি সিং স্মরণ করেন, তাঁর পরিবারের দুই সদস্য ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন।
মাসুদ খান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার, কারণ স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে।
সাংস্কৃতিক পর্বে কবিতা আবৃত্তি করেন রাবেয়া হোসেন ও মুফতি ফারুক। সংগীত পরিবেশন করেন নাজনিন নিশা, শাফিনা করিম, প্রণব মিঠু।
আলোচনা পর্বটি পরিচালনা করেন গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অ্যাগেইনস্ট অ্যাট্রোসিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স অন হিউম্যানিটি এর যুগ্ম সম্পাদক সৈয়দ জাহাঙ্গীর।
সাংস্কৃতিক পর্বের উপস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন শাফিনা করিম।